‘বাংলাদেশের ক্যাম্পের জীবন আমাদের আর ভাল লাগে না। আমরা নিরাপদে মিয়ানমার ফেরত যেতে চাই। আমাদেরকে আমাদের স্বদেশ, আমাদের জন্মভূমি মিয়ানমার ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রোহিঙ্গারা এভাবেই নিজেদের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র জানায়, ইইউর মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ইমন গিলমোরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল দুদিনের সফরে গতকাল সকালে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আসেন। সেখান থেকে বেলা সোয়া ১১টায় প্রতিনিধিদলটি উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছান।
প্রতিনিধিদলটি প্রথমে কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের ইউএনএইচসিআর পরিচালিত রোহিঙ্গাদের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম, ইউনিসেফ পরিচালিত রোহিঙ্গা শিশুদের লার্নিং সেন্টার পরিদর্শন করেন। সেখানে তারা রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে দুপুর ১২টার দিকে দলটি জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পরিচালিত ই-ভাউচার সেন্টার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত রোহিঙ্গাদের কালচারাল সেন্টার পরিদর্শন করেন। এরপর তারা রোহিঙ্গা প্রতিনিধি নেতাসহ সাধারণ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও যুবকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ সময় প্রতিনিধিদলকে রাবেয়া খাতুন নামের এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, আমরা রোহিঙ্গা জাতি। মিয়ানমার আমাদের দেশ। ওখানকার সেনাবাহিনীর নির্যাতন সইতে না পেরে আমরা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি। দীর্ঘ ছয় বছর পার হলেও আমরা নিজেদের দেশে ফেরত যেতে পারিনি। ক্যাম্পের জীবন আমাদের আর ভালো লাগে না।
আরেক রোহিঙ্গা শুক্কুর অভিযোগ করে বলেন, দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে আস্তে আস্তে আমাদের খাদ্য সামগ্রী কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। আমরা প্রথমে পেতাম ১ হাজার ২৪০ টাকা, তা কমিয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছিল। এখন তা আরও কমিয়ে ৮৪০ টাকায় নামানো হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের চলা কঠিন হয়ে পড়বে।
কাদের হোসাইন নামের আরেক রোহিঙ্গা বলেন, বাড়ছে খুন-অপহরণ গোলাগুলি। আমরা অনেক বিপদের মধ্যে সময় পার করছি। তাই নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে আমরা নিজ দেশে ফেরত যেতে চাই।
জবাবে প্রতিনিধিদল জানান, এখনো মিয়ানমারে পরিবেশ তৈরি হয়নি, তাই প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি নজরে এসেছে এবং সহায়তা বাড়ানো চেষ্টা করা হচ্ছে বলে রোহিঙ্গাদের আশ্বাস দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলটি।
এর আগে প্রতিনিধিদলের প্রধান ইমন গিলমোরের সঙ্গে দেখা করে চিঠি দেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা চাই নিরাপদ প্রত্যাবাসন। সেজন্য মিয়ানমারের ওপারে পরিবেশ তৈরি করার কথা বলছি আমরা। আমাদের দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে তাদের হাতে চিঠি আকারে তুলে দিয়েছি।
রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার পর ইইউর প্রতিনিধিদলটি বেলা ৩টার দিকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ে যান। সেখানে সরকারের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ কীভাবে রেখেছেন সেই বিষয়গুলো প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরেন। রাতে কক্সবাজারে অবস্থানরত জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের বৈঠকের কথা রয়েছে তাদের।
প্রতিনিধিদলে ইমন গিলমোরের সঙ্গে সফরসঙ্গী রয়েছেন ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) রাজনৈতিক উপদেষ্টা ভিক্টর ভেলেক, ঢাকার ইইউর দূত চার্লস হোয়াইটলি ও ফার্স্ট সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) সেবাস্টিয়ান রিগার-ব্রাউন, ইইউ বাংলাদেশের হেড আনা অরল্যান্ডিনি।
