বিকেল ৩টা ২৩ মিনিটে বিচারক যখন রায় পড়ছেন আদালতে তখন তিলধারণের জায়গা নেই। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে জনাকীর্ণ আদালতের ভেতরে পিনপতন নীরবতা আর অন্যদিকে বাইরে দুপক্ষের আইনজীবীদের স্লোগান ও হট্টগোল। এমন পরিস্থিতিতে ৩৮ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলার বিচারের রায় ঘোষণা করেন বিচারক।
রায়ে তারেক রহমানকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুটি ধারায় তিন ও ছয় বছর করে মোট নয় বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ দুর্নীতিতে সহযোগিতা করার অভিযোগে তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে তিন বছরের কারাদন্ড দিয়েছে আদালত।
১৬ বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এ মামলায় গতকাল বুধবার ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান রায় দেন।
রায়ে বলা হয়, জোবাইদা রহমানের নামে আসামি তারেক রহমান ৩৫ লাখ টাকার এফডিআর করলেও তার সম্পদ বিবরণীতে বলেছেন, এ টাকা জোবাইদা রহমানের মা তার মেয়েকে উপহার দিয়েছেন। এটি প্রমাণের দায়িত্ব তাদের ওপর থাকলেও তারা প্রমাণ করতে পারেননি। ৩৫ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমানের মিথ্যা দাবিকে সত্য প্রমাণের জন্য চেষ্টা করেছেন।
তারেক রহমানের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি তার সম্পদ বিবরণীতে ২ কোটি ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৮৭ হাজার টাকার তথ্য গোপন করেছেন এবং যে সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার সম্পদের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ দুটি মিলিয়ে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।
রায়ে সাজার পাশাপাশি তারেক রহমানকে ৩ কোটি টাকা অর্থদ- অনাদায়ে তিন মাসের কারাদন্ড এবং জোবাইদা রহমানকে ৩৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে এক মাসের কারাদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া তারেক-জোবাইদার অপ্রদর্শিত সম্পদ হিসেবে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয় আদালত।
বিগত ওয়ান ইলেভেনের পটভূমিতে তারেক রহমান গ্রেপ্তার হয়ে ২০০৮ সালে কারামুক্তি পান। এরপর স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। ১৫ বছর ধরে দুজন সেখানেই রয়েছেন। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত ও আইনের বিধান অনুযায়ী পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানি করতে পারেননি। বিএনপির কোনো পর্যায়ের রাজনীতিতে না থাকা জোবাইদার বিরুদ্ধে এই প্রথম কোনো ফৌজদারি মামলার রায়ে সাজা হলো। অন্যদিকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এ রায়সহ এখন পর্যন্ত পাঁচটি ফৌজদারি মামলার রায় হয়েছে। এর আগে দুর্নীতির পৃথক দুটি মামলায় ১০ ও ৭ বছর, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন এবং মানহানির একটি মামলায় তার দুই বছরের সাজা হয়েছে। সব মিলিয়ে বছরের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৫৮ বছরের কারাদন্ড হয়েছে তার।
গতকাল বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তারেক ও জোবাইদা রহমানকে দুজনকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে বলে জানান দুদকের আইনজীবীরা।
সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অভিযোগের ফৌজদারি মামলায় অন্যূন দুই বছর কারাদন্ড দন্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর সময় অতিক্রান্ত না হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান না।
হট্টগোল, হাতাহাতি : রায় কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সকাল থেকে বৃষ্টির মধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘিরে আদালত এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকেলে রায় ঘোষণা পর্যন্ত আইনজীবীরা থেমে থেমে পরস্পরের উদ্দেশে স্লোগান দেন। দিনভর আদালত এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি চলে। বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা এ রায়কে ফরমায়েশি অভিযোগ করে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। অন্যদিকে সরকাপন্থি আইনজীবীরাও পাল্টা স্লোগান দেন। বিকেল ৪টার দিকে রায়ে সাজার অংশ ঘোষণার পরপরই সরকারপন্থি আইনজীবীরা এজলাসের বাইরে এসে উল্লাস প্রকাশ করেন। তারা ‘এই মাত্র খবর এলো তারেক রহমানের সাজা হলো’ স্লোগান দেন। অন্যদিকে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বিক্ষোভ করে ‘ভুয়া’ ‘ভুয়া’ ‘এই বিচার মানি না’ ‘মানব না’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে আদালত ভবন চত্বরে দুপক্ষের আইনজীবীরা হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি জড়িয়ে পড়েন। এ সময় বিএনপিপন্থি কতিপয় আইনজীবীদের জুতা প্রদর্শন করতে দেখা যায়।
যেভাবে দন্ডিত হলেন তারেক-জোবাইদা : ঘোষিত আয়ের বাইরে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলাটি করে দুদক। তারেক রহমান, তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান ও তারেকের শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অন্য মামলায় গ্রেপ্তার তারেক রহমানকে ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর এ মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। পরে মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ও তা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে তিনটি রিট আবেদন করেন তারেক দম্পতি। ওই বছর হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে এর বৈধতা প্রশ্নে রুল দেয়। এরপর দীর্ঘদিন মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকে।
২০২২ সালের শুরুর দিকে মামলাটি সচলের উদ্যোগ নেয় দুদক। হাইকোর্ট ২৬ জুন এক রায়ে রুল খারিজের আদেশ দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলে বিচারের পথ খোলে। অন্যদিকে পৃথক রিট আবেদনে জোবাইদার মামলা বাতিল প্রশ্নে দেওয়া রুল ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল খারিজ করে রায় দেয় হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জোবাইদাকে আট সপ্তাহের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এ রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপির আইনজীবীরা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) করলে গত বছর ১৩ এপ্রিল সেটি খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ। এর আগে ২০১০ সালের ১৩ অক্টোবর তারেক রহমানের শাশুড়ি সৈয়দা ইকবার মান্দ বানুকে এ মামলা থেকে অব্যাহতির আদেশ দেয় হাইকোর্ট। গত ১৩ এপ্রিল তারেক ও জোবাইদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। একই সঙ্গে তাদের পক্ষে আইনজীবীর শুনানির আবেদন নাকচের আদেশ হয়। এ মামলায় ৫৬ সাক্ষীর মধ্যে গত ২৪ জুলাই পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৪২ জন সাক্ষ্য দেন। এরপর দুদক ২৭ জুলাই যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ করার পর রায়ের তারিখ ধার্য হয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দুদকের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের একটা বিলম্বিত বিচারের পর রায় হয়েছে। এখন সাজার পরিমাণের বিষয়টি নথিপত্র পর্যালোচনা করে আমরা দেখব অতিরিক্ত (সাজা) চাওয়া যায় কি না। তবে এই মুহূর্তে আমরা মনে করি যেহেতু মামলাটি নিষ্পত্তি এবং রায় হয়েছে, এতে আমরা সন্তুষ্ট।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জোবাইদা রহমান এখন দুর্নীতির মামলায় একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। নৈতিক স্খলন বা দুদকের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না।’
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে রায় দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক জিঘাংসার ফসল। মনগড়া, নির্দেশিত হয়ে ফরমায়েশি রায় দিয়েছেন বিচারক। তারেক রহমান ও জোবাইদা রহমানের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।’
দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান বলেন, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে কি না, তা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে তারেক-জোবাইদার সাজার রায়ের পর গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন।
আইনের শাসন প্রতিফলন ঘটেছে : আইনমন্ত্রী
তারেক-জোবাইদার বিরুদ্ধে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশে যে আইনের শাসন আছে তারই একটা প্রতিফলন। রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী পুত্র যদি এরকম দুর্নীতি করে, আমার তো মনে হয় সেখানে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়াটা উচিত।’
ফরমায়েশি বিচার উল্লেখ করে বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মামলাটা দায়েরের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। তখন সেই সরকারের সঙ্গে তাদেরই নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপ্রধানের যথেষ্ট সখ্য ছিল, এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। তারাই দুর্নীতির মামলা করেছিল।’
আগামী নির্বাচনের আগে এ রায় বিভ্রান্তিমূলক বিএনপির এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে বিভ্রান্ত করার কী আছে? বিচারিক কাজ হয়েছে, রায় বেরিয়েছে। আসামি তো আগে থেকেই সাজাপ্রাপ্ত। এখন নতুন করে এটা (রায়) দিয়ে ওনার (তারেক রহমান) ভাবমূর্তি খারাপ করার তো আমাদের প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়ে না।’
সাজা কার্যক্রমে দন্ডপ্রাপ্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ফিরিয়ে আনার চেষ্টা সবসময় থাকবে। এটা সরকারের দায়িত্ব। ফিরিয়ে আনার চেষ্টা আমরা অবশ্যই করব।’
