গত চার দিন ধরেই কমতে কমতে এখন অদ্রিজার প্লাটিলেট ২ লাখ ১০ হাজার থেকে নেমে এসেছে ৬২ হাজারে। গত বুধবার মধ্যরাতে জ¦র সেরেছে বটে; কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই হাতে-পায়ে র্যাশ দেখা দিয়েছে। এতদিন একটু-আধটু চোখ মেললেও এখন আর চোখটুকুও মেলছে না শিশুটি। কোলের মধ্যে সন্তানকে ধরে রেখে মা হাসি সেন বললেন, ‘আজ (গতকাল) বাচ্চাটা আরও নিস্তেজ হয়ে গেছে। কী করব বুঝতে পারছি না!’
অদ্রিজার পাশের বেডের আড়াই বছরের শিশু রাজশ্রীর অবস্থাও খারাপ। ডেঙ্গু শনাক্তের পর পাঁচ দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো ২ লাখ ১০ হাজার থেকে প্লাটিলেট নেমে এসেছে দেড় লাখে। রাজশ্রীর বাবা সুদর্শন মিত্র বলেন, ‘ডাক্তাররা বলেছে ভালো হয়ে যাবে, কিন্তু মন তো মানে না।’
গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু কর্নারে চিকিৎসাধীন এ দুই শিশুর পরিবার এভাবেই তাদের সন্তানদের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে।
শুধু অদ্রিজা বা রাজশ্রীই নয়; সরেজমিনে হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড ঘুরে, রোগীর স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে চিকিৎসাধীন বেশিরভাগ শিশুর অবস্থায় জটিল। বেশিরভাগই রক্তের প্লাটিলেট কম নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। ভর্তির পর তা আরও কমে যাচ্ছে। চিকিৎসার দু-তিন দিনের মধ্যে জ¦র সেরে যাচ্ছে। কিন্তু তারপর দেখা দিচ্ছে নতুন জটিলতা হাতে-পায়ে র্যাশ উঠছে, প্লাটিলেট কমছে, একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত নিতে হচ্ছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখানে বা এর আগেই মারাও যাচ্ছে শিশুরা।
এ হাসপাতালের শিশু ডেঙ্গু রোগীদের এমন জটিলতার জন্য দেরিতে হাসপাতালে আসা প্রধান কারণ বলে জানালেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিডনি ও হার্ট ফেইলিউরসহ সব খারাপ লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে তারা। একেবারে শেষদিকে হাসপাতালে আসছে। ফলে শক সিনড্রোম দেখা দিচ্ছে। রক্তচাপ কমে যায়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, নিস্তেজ হয়ে যায়। তিনি বলেন, এখানে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভর্তি হওয়া রোগীদের কারও অবস্থাই খারাপ হয়নি। তারা চিকিৎসা পেয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়তে পারছে। কিন্তু যারা খারাপ অবস্থায় আসে, তাদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। আর এ ধরনের রোগী বেশি আসছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৫১৪ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৯ জন।
বেশিরভাগের প্লাটিলেট কম : শিশু হাসপাতালে দুটি ডেঙ্গু কর্নার ঘুরে ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর তারা প্রথমে বাইরে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়েছেন। অবস্থার উন্নতি না হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে ভর্তি করেছেন বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও উন্নতি না হওয়ার আক্রান্তের চার-পাঁচ দিন পর নিয়ে এসেছেন এই হাসপাতালে। কিন্তু ততদিনে প্লাটিলেট কমতে কমতে গড়ে ৫০ হাজারের নিচে নেমে যাচ্ছে।
ডেঙ্গু কর্নার-১-এ কথা হয় শ্যামলী থেকে আসা আড়াই বছরের শিশু হামিদার বাবা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ডেঙ্গু হওয়ার পাঁচ দিন পর তিনি গত বুধবার রাতে সংকটাপন্ন অবস্থায় মেয়েকে হাসপাতালে এনেছেন। তখন প্লাটিলেট ছিল ৪০ হাজার। গত দুদিনে হামিদার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং প্লাটিলেট আরও কমেছে। কিন্তু কত কমেছে তা জানেন না জসিম। তিনি বলেন, নার্সদের বললে বলেন অবস্থা ভালো। কিন্তু কী হয়েছে, তা বলেন না। গতকালও হামিদার রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন তারা রিপোর্টের অপেক্ষায় আছেন।
জসিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর চেয়ে ভালো হাসপাতাল আর নেই। অবস্থা যদি আরও খারাপ হয়, তখন কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।
আইসিইউ লাগছে ৯% শিশুর : হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, এখানে আইসিইউতে বেড সীমিত। এই মুহূর্তে আইসিইউতে ডেঙ্গু রোগী আছে ১০ জন। নানারকমের আইসিইউ মিলে মোট বেড ১০০টি। হাই-ডিপেনডেন্সি ইউনিটে বেড আছে ১৬টি। আইসিইউতে অন্য রোগীর পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের রাখা হচ্ছে। সে হিসাবে, এখানে ভর্তি রোগীর ৯ শতাংশের আইসিইউ লাগছে। বর্তমানে এখানে চিকিৎসাধীন ১০৬ জন।
বেডের চেয়ে রোগী বেশি : হাসপাতাল পরিচালক বলেন, আগে একটি ডেঙ্গু কর্নার ছিল। রোগী বেড়ে যাওয়ায় এখন দুটি কর্নার করেছেন তারা। বেড ৯২টি। কিন্তু এখন রোগী আছে ১০৬ জন। অর্থাৎ বেডের তুলনায় রোগী ১৪ জন রোগী বেশি।
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বেডের তুলনায় অতিরিক্ত রোগীদের জন্য এ ওয়ার্ডেই বিছানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো শিশুই মেঝেতে নেই।
প্লাটিলেট মেশিন নেই : এ হাসপাতালে কখনই প্লাটিলেট সেপারেশন মেশিন ছিল না বলে জানান হাসপাতাল পরিচালক। তিনি বলেন, এখানে খুব একটা প্লাটিলেট লাগে না। লাগলেও আশপাশের সরকারি হাসপাতালের মধ্যে পঙ্গু হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেও সরকারি নির্দেশ দেওয়া আছে প্লাটিলেট দেওয়ার জন্য।
পরিচালক আরও বলেন, এবার ডেঙ্গু রোগীদের রক্তের চাহিদাও কম। লাগে না বললেই চলে। খুব বেশি হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণ) হলে রক্ত লাগে। তবে সেটার পরিমাণ খুবই কম। তবে গতকাল ব্লাড সেন্টারে কয়েকজন রোগীকে প্লাটিলেটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সেন্টার থেকে তাদের বলা হচ্ছে, এখানে প্লাটিলেট হয় না। বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হবে। ব্লাড সেন্টারে কর্মরত টেকনোলজিস্টরা জানান, এখানে শুধু ব্লাড ক্রসম্যাচিং হয়। রোগী ডোনার আনলে রক্ত নেওয়া হয়।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সব রেকর্ড ছাড়াল : বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে মৃত্যুর সব রেকর্ড ছাড়াল এ বছর। গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন করে ১০ জন মারা গেছে। এর মধ্য দিয়ে এ বছর মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ২৮৩ জন। এ সংখ্যা দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু অতীতের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। এর আগে ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে এক বছরে সর্বোচ্চ ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে ২০০০ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২০০৬ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে ৪৪, ৫৮, ১০, ১৩, ৪ এবং ১১ জন মারা যায় ডেঙ্গুতে। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর খবর নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে। এরপর ২০১১ সালে ৬, ২০১২ সালে ১, ২০১৩ সালে ২ জন মারা যায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। ২০১৪ সাল ছিল মৃত্যুশূন্য। ২০১৫ সালে ৬, ২০১৬ সালে ১৪, ২০১৭ সালে ৮, ২০১৮ সালে ২৬ জন মারা যায় ডেঙ্গুতে।
২০১৯ সালে সারা দেশে রেকর্ড ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের। এরপর ২০২০ সালে ৭, ২০২১ সালে ১০৫ এবং ২০২২ সালে ২৮১ জন মারা যায় ডেঙ্গুতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৫৮৯ জন রোগী। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৫৯ হাজার ৭১৬ জনে। বাংলাদেশে এর আগে শুধু ২০১৯ ও ২০২২ সালে এর চেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে যত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তাদের ১ হাজার ৪৮৮ জনই ঢাকার বাইরের ও ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ১১০১ জন রোগী। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ হাজার ২১০ জন রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ৬৫০ এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ৪ হাজার ৫৬০ জন।
