তোশাখানা দুর্নীতি মামলায় সাজা পেয়ে কারাবন্দি হয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরের জন্য তাকে ভোটে নিষিদ্ধ করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে হাইকোর্টে করা ইমরানের আবেদনও ইতিমধ্যে খারিজ হয়ে গেছে। এ দফায় গ্রেপ্তারের পর তার দলের কর্মী-সমর্থকরা ছিলেন নিরুত্তাপ। ফলে ইমরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সূর্য ডুবে গেছে বলেও মনে করছেন অনেকে। এর মধ্যে অবশ্য একটি খবর তার সমর্থকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করতে পারে। ইমরানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব শোনা যাচ্ছিল, তা বাস্তব হয়ে উঠেছে। ফাঁস হওয়া এক নথি বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে না থাকার কারণেই দেশটি তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চাপ দেয় পাকিস্তানের কূটনীতিক ও আমলাদের।
গত বছর ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ইমরান বারবার বলে এসেছেন, তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর নেপথ্যে আছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর সেজন্য চাপ প্রয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযুক্ত দুপক্ষই ইমরানের এমন দাবি নাকচ করে এসেছে বরাবর। এমনকি ইমরান এ দফায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিষয়টি ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ’ বলেও মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’-এর বরাতে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ না নেওয়ার কারণেই গদি হারিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। যুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ায় সফর এবং সফর শেষ করে পাকিস্তানে এসে জনসমাবেশে ইউক্রেন যুদ্ধে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানের ঘোষণাই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরানকে সরানো হয় গত বছর।
বিবিসি বলছে, গত বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইমরান খান রাশিয়া সফরে যান। ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের মধ্যে তিনি রুশদের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করার চেষ্টা করেন।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ইমরানের মস্কো সফরে সমর্থন দিলেও সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে মতদ্বৈততা তীব্র হতে থাকে। পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের পর ইমরান অভিযোগ করেন, রাশিয়া সফর এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বেছে নিতে চাওয়ার শাস্তি হিসেবে তাকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ইসলামাবাদে গত ২৭ মার্চ এক সমাবেশে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে একটি চিঠি দেখান ইমরান খান। তার দাবি, তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণে কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তার ভাষ্য ছিল, তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য বিরোধী দলগুলো ষড়যন্ত্র করছে। আর এর পেছনে মদদ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
তার অভিযোগের জবাবে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায় যুক্তরাষ্ট্র। অনাস্থা প্রস্তাবের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে দেশটি। তবে ফাঁস হওয়া নথির বিষয়ে ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউক্রেন ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে একটি গোপন বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু এবং ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান।
বৈঠকে ডোনাল্ড লু আসাদ মজিদকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। আসাদ মজিদকে তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান কোনোভাবেই আমাদের কাছে নিরপেক্ষ বলে মনে হচ্ছে না।
বৈঠকে আসাদ মজিদ ডোনাল্ড লুর কাছে জানতে চান, পাকিস্তান ইউক্রেন ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। এ কারণেই কি যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রতিক্রিয়া? এতে ডোনাল্ড লু নেতিবাচক জবাব দেন। তিনি বলেন, এটি মূলত ইমরান খানের মস্কো সফরের কারণেই হয়েছে।
ডোনাল্ড লুর এমন হুমকির জবাবে আসাদ মজিদ খান জানতে চান, ইউক্রেন ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থান যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তবে কেন ওয়াশিংটন ইমরান খানের রাশিয়া সফরের আগেই বিষয়টি নিয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি।
জবাবে ডোনাল্ড লু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন চিন্তা করেছে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আগেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেনি এবং আমরা পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাকেই উপযুক্ত বলে মনে করেছি।’
এ ফাঁস হওয়া বার্তার বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুমতাজ জাহরা বালুচ পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনকে বলেছেন, এই ফাঁস হওয়া নথি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব এবং পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবালও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ফাঁস হওয়া নথির ব্যাপারে বলেছে, এসব বিষয়বস্তু নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে, পাকিস্তানের নেতা কে হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থান নিচ্ছে।
এদিকে এ নথি এমন সময় ফাঁস হলো, যখন আগামী পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ভোটে লড়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন ইমরান। আর তার দল পিটিআইতেও নেই সমন্বয়। এর মধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে ভোট করা নিয়ে সংশয় থাকলেও তাতে যে ইমরান লড়তে পারছেন না, সেটি একরকম নিশ্চিত হয়ে গেছে। তবে এখন এ নথি ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে তার দলের নেতাকর্মীরা যদি রাজপথে নামেন বা আগেরবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট কোনো ভূমিকা রাখে, সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
