যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৫০তম অর্থাৎ সর্বশেষ অঙ্গরাজ্যটি হলো হাওয়াই। এটি উত্তর আমেরিকার বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র অঙ্গরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে দুই হাজার মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাওয়াই। বিশ্বের সমুদ্র পর্যটনের অন্যতম জনপ্রিয় হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পর্যটনেও শীর্ষে। অথচ প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে প্রায়ই আক্রান্ত হওয়া হাওয়াই যেন অবহেলিত। অন্তত হাওয়াইয়ের বাসিন্দাদের এমন হতাশাকে এবার যেন পাকাপোক্ত করল দানবীয় ধ্বংসলীলা চালানো দাবানল। হাওয়াইয়ের মাউই দ্বীপে বিশেষ করে পুরনো শহর লাহাইনা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সব পুড়িয়ে আগুনের তেজ কমার পর বেরিয়ে আসছে কয়লা হয়ে যাওয়া প্রাণ-প্রকৃতি, ভস্মীভূত বাড়ি-গাড়ির কাঠামো। হাওয়াইতে স্মরণকালের এ ভয়াবহ দাবানলে এখন পর্যন্ত মাত্র ৯৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বীপ জুড়ে এখনো নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
অথচ অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত, অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনীর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এ অঙ্গরাজ্যে দাবানলের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও উদ্ধারকাজে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। গত মঙ্গলবার হাওয়াইয়ের মাউইয়ে দাবানলের সূত্রপাত হয়। যা মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় প্রাণ বাঁচাতে অনেক সাগরে ঝাঁপ পর্যন্ত দেন। তবে সবাই দাবানল থেকে বাঁচতে পারেননি। অনেকে নিজ ঘর বা গাড়িতে আটকা পড়ে যান। রবিবার পর্যন্ত ৯৬ জনের মরদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়। যা নিশ্চিতভাবে আরও বাড়বে। গভর্নর জস গ্রিন জানিয়েছেন, এ দাবানলে সবমিলিয়ে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে তাদের ১০ দিনের বেশি সময় লাগবে। বর্তমানে দ্বীপটিতে ১ হাজার ৩০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করে গভর্নর আরও বলেন, ‘পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। লাহাইনা শহরের ১২ হাজার বাসিন্দার সবাই সম্ভবত আগুন থেকে বেঁচে অথবা আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা আশঙ্কা করছি আরও মরদেহ পাওয়া যাবে। তবে মরদেহ শনাক্ত করার বিষয়টি খুবই কঠিন।’
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত শনিবার পর্যন্ত লাহাইনা শহরের মাত্র ৩ শতাংশ অংশে অভিযান চালানো গেছে। বর্তমানে হতাহতদের খুঁজে পেতে উদ্ধারকারী কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের এ অঙ্গরাজ্যে ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়াদের অভিযোগ, দ্বীপজুড়ে দাবানল সতর্কীকরণ সাইরেন লাগানো হলেও প্রকৃত দুর্যোগের সময় সেগুলো একটিও বাজেনি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে হাওয়াইয়ের বাসিন্দা ভিলমা রিড বলেন, ‘আমাদের পেছনের পাহাড়ে আগুন লেগেছে সেটা কেউ আমাদের জানায়নি। আমরা কখন জানলাম জানেন? যখন আগুন আমাদের সামনের রাস্তায় এসে পড়েছে।’
সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাওয়াইয়ের উপদ্রুত বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন সরকার গোটা দুর্যোগকালে নিষ্ক্রিয় ছিল। এখন উদ্ধারকাজেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এদিকে যেসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো চোখে দেখে শনাক্ত করা অসম্ভব হওয়ায় চলছে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ।
এদিকে দ্বীপের একদিকে যখন ধ্বংস আর স্বজন হারানোর বেদনা তখন অন্যদিকে চলছে পর্যটকদের আনন্দ-উৎসব! এতে হাওয়াইবাসী অনেকের মধ্যেই ঘৃণা জাগছে। ভয়াবহ এ দাবানলে মাউইয়ের ঐতিহাসিক লাহাইনা শহর মাটির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে গেছে আস্ত একটি শহরের অস্তিত্ব।
বিবিসিকে মাউইর এক বাসিন্দা ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দেখুন, যেখানে মাত্র তিন দিন আগে আমাদের স্বজনদের লাশ ভেসেছে, সেখানে এখন পর্যটকরা ডুবসাঁতার দিয়ে বিনোদিত হচ্ছেন।’ এমনকি গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া ভয়াবহ দাবানলের সূত্রপাত পর্যটকদের মাধ্যমেই কি না, তা নিয়েও জাগছে প্রশ্ন।
