২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থায় তারল্য সংকট থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারকে সবচেয়ে বেশি ধার দেওয়া হয়েছে। এতে টাকার সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপক মুনাফা হয়েছে। সরকারকে রেকর্ড ঋণ দিয়ে সাত হাজার কোটি টাকা সুদ আয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা সংস্থাটির আয়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু সরকারকে ঋণের সুদ নয়, বিপুল পরিমাণের ডলার বিক্রির আয়ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফায় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডলার বিক্রি করে ছয় হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। সরকারকে দেওয়া ঋণ ও ডলার বিক্রি থেকে ব্যাপক আয়ের কারণে বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিট ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৬৭ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২২-২৩ হিসাব বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব গতকাল মঙ্গলবার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালন পর্ষদ। পর্ষদের সভাপতিত্ব করেন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। এ সময় সব পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। সভা সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ হিসাব বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২০-২১ হিসাব বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিট মুনাফা ছিল ৫ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছর বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে রেকর্ড পরিমাণের ঋণ দেয়। ওই সময় সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার মধ্যে ৯৭ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকার ঋণের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময়ে দেশে বিদেশি মুদ্রার সংকটেও রেকর্ড পরিমাণের ডলার বিক্রি করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এতে করে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেলেও ডলার বিক্রি থেকে ভালো আয় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গতকালের বোর্ডসভা শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২২-২৩ হিসাব বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা পরিচালন আয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে সরকারকে ঋণ দিয়ে সাত হাজার কোটি টাকা, ডলার বিক্রি থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা ও বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণ দিয়ে দুই হাজার কোটি টাকা আয় হয়েছে। বিপরীতে সর্বশেষ হিসাব বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। আর নিট মুনাফা হয়েছে ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে ১০ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা।
এদিকে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের নগদ লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নগদ ফাইন্যান্স পিএলসিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাহারের আবেদন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি, যা গতকাল মঙ্গলবারের বোর্ডসভায় গৃহীত হয়েছে। এর আগে গত ১ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নগদ ফাইন্যান্স পিএলসির চূড়ান্ত লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়। তবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করার আগেই নগদ ফাইন্যান্স পিএলসি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সমর্পণের আবেদন করে চিঠি পাঠায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষা যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বলে সভা সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া সভায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পর্যবেক্ষণ ও আমদানি মূল্যের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে ব্লুমবার্গ টার্মিনাল স্থাপনে বিষয়টি এজেন্ডভুক্ত থাকলেও আলোচনা হয়নি। পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমদানির বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি করার জন্য ব্লুমবার্গের সঙ্গে একটি চুক্তি দরকার। যাতে পণ্যের দর সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা যায়। পণ্যের দর সাশ্রয়ী করার ক্ষেত্রে এটা ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে সভায় এজেন্ডা হিসেবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের অনুকূলে পুনঃ অর্থসংস্থান বাবদ এক হাজার কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুরি, বাণিজ্যিক ব্যাংকের কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ এবং আদায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডকে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকে রাখা আমানতের সুদহার হিসাবায়নের ক্ষেত্রে লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) পরিবর্তে বেঞ্চমার্ক সুদহার ও মার্জিন নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
