কন্ট্রাক্ট ফার্মিং স্পষ্ট সুদি কারবার

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩, ১১:০৬ পিএম

কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বলতে প্রচলিত বিশেষ একটি চুক্তিকে বুঝায়। যা সম্পাদিত হয়ে থাকে চাষী ও দোকানি/কোম্পানির মধ্যে। চুক্তি মোতাবেক মাছ/মুরগি পালনের জন্য দোকানি/কোম্পানি চাষিকে পোনা/বাচ্চা, প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ ও কীটনাশক প্রদান করে। চুক্তি মোতাবেক চাষি তার উৎপাদিত মাছ/মুরগি উক্ত দোকানি/কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে বাধ্য থাকে। বাজার দর যাই থাকুক অন্যত্র বিক্রি করার সুযোগ চাষির থাকে না। চাষিকে বাধ্য করতে আগেই সাদা চেক ও জমির দলিল দোকানি/কোম্পানি জমা রেখে দেয়। বর্তমানে অনেক মুরগি খামারি পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। আবার বৃহৎ করপোরেট কোম্পানিগুলো লাভ বেশি থাকায় কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের প্রতি খুবই আগ্রহী।

কল্যাণকর, ইনসাফভিত্তিক সুষ্ঠু একটি বাজার ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিতে এ পদ্ধতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ পদ্ধতি যদি এখনি বন্ধ করা না হয় এবং তা ছড়িয়ে পড়ে আর মোট উৎপাদনের প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ এ পদ্ধতির কবজায় চলে যায় তাহলে মুক্ত বাজার থাকবে না। ১৮ কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় আর লাখ লাখ প্রান্তিক চাষির উৎপাদিত মাছ, মাংস, ডিমের দাম নির্ধারণ করবে দেশের মাত্র কয়েকটা বৃহৎ করপোরেট কোম্পানি।

কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের কারণে কোম্পানিগুলো নিজেদের উৎপাদিত বাচ্চা/পোনা, খাদ্য, ওষুধ, কীটনাশকের দাম নিজেদের ইচ্ছে মতো বেশি ধরে চাষিদের সরবরাহ করে আবার চাষিদের উৎপাদিত মাছ, মাংস, ডিম চুক্তির জোরে নিজেদেরে ইচ্ছে মতো কম দামে চাষিদের থেকে কিনে নেয়। সব নিয়ন্ত্রণ কোম্পানির হাতে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানির মালিকরা হচ্ছে আরও বেশি ধনী বিপরীতে চাষিরা হচ্ছে আরও বেশি গরিব। হয়তো কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থে চাষিদের বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনে নিরুপায় হয়ে যৎকিঞ্চিৎ একটা লাভ চাষিদের ধরিয়ে দেয়। যাতে করে চাষিদের দিয়ে তারা নিজেরা আরও ধনী হতে পারে। প্রান্তিক দরিদ্র চাষিরা সব বোঝার পরেও কোনোভাবে জীবন বাঁচাতে শুধুমাত্র নিরুপায় হয়ে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে আবদ্ধ হয়।

ইসলামের লেনদেন ব্যবস্থা মানবজাতির জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর ও ভারসাম্যপূর্ণ। যা বাজার ব্যবস্থাকে কারওর কুক্ষিগত হতে দেয় না বরং বাজারকে মুক্ত রাখে। ইসলাম একটা চুক্তির মধ্যে আরেকটা চুক্তি জুড়ে দেওয়াকে অবৈধ করেছে। আমরা আলোচিত কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের বিষয়ে লক্ষ করেছি, তাতে বর্তমানের কোম্পানির বাচ্চা ও খাদ্য বিক্রির চুক্তির মধ্যে ভবিষ্যতের চাষির মাংস বিক্রির চুক্তিকে আবশ্যকীয় শর্তরূপে জুড়ে দেওয়া হয়। আবার ইসলাম ঋণ প্রদান করে প্রদত্ত ঋণের অতিরিক্ত যে কোনো সুবিধা গ্রহণের চুক্তিকে সুদি কারবার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তা অবৈধ করেছে। আলোচিত কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে কোম্পানি চাষিকে বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ বাকিতে দিচ্ছে এ শর্তের ওপর যে উৎপাদিত মাংস তার কাছেই চাষি বিক্রি করবে। যা কোম্পানির জন্য বিরাট এক আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করে। কোম্পানি ঋণ ফেরত নিচ্ছে আবার অতিরিক্ত একটা সুবিধাও নিচ্ছে। এটা সুদি কারবার।

সুতরাং সুদি চুক্তি হওয়ায় এবং এক চুক্তির মধ্যে আরেক চুক্তির অনুপ্রবেশ থাকায় প্রচলিত কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ইসলামের দৃষ্টিতে নাজায়েজ। সংশ্লিষ্ট মুসলিম ব্যবসায়ী, চাষি, এবং উদ্যোক্তাদের ইমানি দায়িত্ব কন্ট্রাক্ট ফার্মিং থেকে নিজেকে বিরত রাখা। প্রান্তিক চাষিদের কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের কালো থাবা থেকে মুক্ত রাখর প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা গণস্বার্থেই সরকারের দায়িত্ব। মসজিদের ইমাম-খতিবদের দায়িত্ব- কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের বৈষয়িক ও পরকালীন ক্ষতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত