কট্টর ‘সরকারবিরোধী’ নেতাদের কমিটিতে রাখা নিয়ে দোটানায় পড়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সর্বশেষ কাউন্সিলে গঠিত কমিটির সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে খসড়া তালিকা তৈরির তিন সপ্তাহেও ঘোষণা দিতে পারেনি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
একাধিক সূত্র বলেছে, চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় আগের কমিটি থেকে বাদপড়া সবাইকে নিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। কমিটিতে পদবিন্যাসের জন্য একটি উপ-কমিটিও করে দেওয়া হয়। কিন্তু কমিটি থেকে বাদ দেওয়া সরকারবিরোধী নেতাদের আবার অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছে না সরকার। এ নিয়ে চাপে রয়েছেন নেতারা। আবার কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্তের তিন সপ্তাহেও তা কার্যকর করতে গড়িমসিতে সংগঠনে অসন্তোষ বাড়ছে। হেফাজতের এখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের কমিটিতে যারা ছিল তাদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তাদের পদবিন্যাসের বিষয়টি নিয়ে আমরা একবার বসেছিলাম; আরও বসতে হবে। আশা করছি আগামী সপ্তাহে কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হবে।’ কমিটি ঘোষণার বিষয়ে চাপ বা প্রতিবন্ধকতার কথা অস্বীকার করেন তিনি।
হেফাজতের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করতে গিয়ে ২০২১ সালের মার্চে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ওই সংঘাতে বেশ কিছু প্রাণহানি ঘটে। মামলায় জড়ান বিভিন্ন এলাকার প্রচুর নেতাকর্মী। গ্রেপ্তার হন সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীসহ অনেকে। পরে সরকারের চাপের মুখে ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল রাতে হেফাজতের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করতে বাধ্য হন তৎকালীন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। ওই বছরের ৭ জুন সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত নেতাদের বাদ দিয়ে ৩৩ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। সরকারের প্রেসক্রিপশনেই তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে সংগঠনে।
বাদপড়া নেতাদের মধ্যে যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নাছির উদ্দিন মুনির, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, জাকারিয়া নোমান, খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, হাসান জামিল, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মুনির হোসাইন কাশেমী ও হাফেজ মুহাম্মদ রয়েছেন।
সংগঠন সূত্র জানায়, নেতাদের বাদ পড়ার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে নেয়নি সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরাট অংশ। তারা ক্ষুব্ধ। ক্ষোভ বাড়তে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বাদপড়াদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান নেতৃত্ব। কিন্তু তা কার্যকর করতে গিয়ে সরকারের চাপের মুখে পড়েছেন তারা। কট্টর সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজি, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী, মাওলানা হারুন ইজহার প্রমুখকে কমিটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের আপত্তির কথা ইতিমধ্যে জেনেছেন সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্ব। এদের কমিটিভুক্ত করা হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যকরে গড়িমসিতে সংগঠনে অসন্তোষ বাড়ছে। বাদপড়া নেতাদের অনুসারীরা এটিকে বর্তমান নেতৃত্বের দুর্বলতা হিসেবে দেখছে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আগের কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ সদস্যের উপ-কমিটি এ নিয়ে কাজ করছেন। আমরা আশা করছি, দ্রুত সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি ঘোষণা করা হবে।’ কমিটি ঘোষণায় গড়িমসির বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা আহমদ শফির নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গঠিত হয়। তার মৃত্যুর পর ২০২১ সালের জুন মাসে মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির নির্বাচিত করা হয়। ওই বছর ২১ আগস্ট মারা যান জুনায়েদ বাবুনগরী। বর্তমানে মাওলানা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতের আমির ও মাওলানা সাজিদুর রহমান মহাসচিব।
