বিএনপির র‌্যালিতে চার স্থানে সংঘর্ষ আহত ৫৯

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৫:২১ এএম

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান  ঘিরে গতকাল শুক্রবার দেশের চারটি জেলায় দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। এর মধ্যে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সাতজন গুলিবিদ্ধসহ বিএনপির অন্তত ৩০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন দলটির নেতারা। গাইবান্ধায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে বিএনপির অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হন।

বগুড়ার নন্দীগ্রামে একই দিনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে একজন গুলিবিদ্ধসহ আটজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া মাগুরার মহম্মদপুরে বিএনপি-পুলিশ  সংঘর্ষে তিন পুলিশ সদস্য আহত এবং বিএনপির তিন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে গতকাল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‌্যালিতে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে কলমাকান্দার আট ইউনিয়ন থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে উপজেলা সদরের মধ্যবাজারে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর ২টার দিকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে বিএনপির নেতাকর্মীদের অনুষ্ঠান করতে বাধা দেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়।

কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এমএ খায়ের বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবর্ষিকী উপলক্ষে দলীয় কার্যালয়ে বাদ জুমা আলোচানা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের লোকেরা লগি ও বৈঠা নিয়ে সড়কে অবস্থান নেওয়ায় বাজারের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের লোকজন অফিসে আসতে পারেনি। তাদের বাধার মুখে আমরা দলীয় পতাকাও উত্তোলন করতে পারিনি। বাজারের পশ্চিমে মারকাজ মসজিদ এলাকায় আমাদের বেশিরভাগ লোক অবস্থান করছিল। আওয়ামী লীগের লোকজন লগি-বৈঠা নিয়ে আক্রমণ করে। পাশাপাশি পুলিশও গুলি ছুড়েছে।’

হামলায় যুবদল নেতা তাইমূল, খোকন, স্বপন, মামুন, সবুজ, সোহানুর ও কাশেম গুলিবিদ্ধ এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল, সদস্য সচিব শেখ রবিন মোবারক, বদির জামাল, রিপন, মাসুদ, রুবেলসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি বিএনপি নেতা খায়েরের।

তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘বিএনপির লোকজন দা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাদের লোকজনকে আক্রমণ করেছে। তারা দোকানপাট ভাঙচুর করেছে ও বোমা ফাটায়। আমাদের লোকজনকে কুপিয়েছে। সদর ইউনিয়নের সদস্য এমদাদুল হকের পেটে কোপ লেগেছে। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমরা কোনো কিছুই করিনি। পুলিশ তাদের (বিএনপি নেতাকর্মীদের) বাধা দিয়েছে।’

কলমাকান্দা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘দুই দলের মুখোমুখি মিছিলে সংঘর্ষ বাধে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও জানমাল রক্ষায় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট ছোড়া হয়েছে।’ সংঘর্ষের সময় এক পুলিশ সদস্য আহত হন বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

গাইবান্ধায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং পুলিশের টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটার ঘটনা ঘটে। এতে বিএনপির অন্তত ১৫ নেতাকর্মী আহত হন বলে দাবি করেছেন দলটির নেতারা। এ সময় পুলিশ দুই বিএনপি নেতাকে আটক করে। গতকাল বিকেলে শহরের পার্ক রোডে এসব ঘটনা ঘটে। পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জেলা বিএনপি শহরের সার্কুলার রোডের দলীয় কার্যালয় থেকে শোভাযাত্রা বের করে। এটি শহর প্রদক্ষিণ করে পার্ক রোডে পৌঁছলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-যুবদল নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ এবং নেতাকর্মীদের লাঠিপেটা করে। পরে সার্কুলার রোডের দলীয় কার্যালয় থেকে পুলিশ দুই বিএনপি নেতাকে আটক করে।

গাইবান্ধা সদর থানা বিএনপির সদস্য সচিব ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই পুলিশ বিএনপির শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রায় বাধা দেয় এবং লাঠিপেটা করে।’

তবে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাসুদ রানা বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীরা শোভাযাত্রা থেকে পার্ক রোডের কয়েকটি দোকান ভাঙচুর এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছয় রাউন্ড টিয়ার শেল ছোড়া হয়।’

বগুড়ার নন্দীগ্রামে একই দিনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলাকালে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় একজন গুলিবিদ্ধ ও ছাত্রদল সভাপতিসহ ৮ জন আহত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ৩০ মিনিট ধরে চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। ৬০-৭০টি চেয়ার ভাঙচুর ও ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয়। এতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রা ও সমাবেশ পন্ড হয়ে যায়।

গতকাল বিকেল ৪টার দিকে নন্দীগ্রাম ফিলিং স্টেশন এলাকায় বিএনপির অস্থায়ী দলীয় কার্যালয় চত্বরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভাস্থলে হামলা ও চেয়ার ভাঙচুরের এসব ঘটনা ঘটে।

আওয়ামী লীগের দাবি, একজন গুলিবিদ্ধসহ তাদের দুজন আহত হয়েছে। বিএনপির দাবি, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় তাদের দলের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।

পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করে ঘটনাস্থল থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে বঙ্গবন্ধু চত্বরে গিয়ে শান্তি সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হয়ে কৈগাড়ী মোড়ে বিক্ষোভ ও সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সভা করে বিএনপি।

নন্দীগ্রাম থানার ওসি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ এবং নন্দীগ্রাম ফিলিং স্টেশন এলাকায় দলীয় কার্যালয় চত্বরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভার প্রস্তুতি চলছিল। অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। আওয়ামী লীগের একটি মিছিল হঠাৎই বিএনপির অফিস চত্বরে প্রবেশ করলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি শান্ত করে দুই দলের নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’

মাগুরার মহম্মদপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মহম্মদপুর বাজারে উপজেলা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে তিন পুলিশ সদস্য আহত এবং বিএনপির তিন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের একটি গাড়ি ও দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিএনপি নেতাকর্মীরা জানায়, বিকেল ৪টায় দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির উদ্দেশ্যে মাগুরা-মহম্মদপুর সড়কের পল্লী বিদ্যুতের সামনে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। সেখান থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে মহম্মদপুর বাজারে উপজেলা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে তাদের সভা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সেখানেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষে র‌্যালি চলাকালে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল সকালে আগে-পিছে যাওয়াকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষ হয়। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে টাঙ্গাইল শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহতরা হলেন ভূঞাপুর থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব কাজী শাহিন, গোবিন্দাসী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান জুয়েল এবং অর্জুনা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ। এর মধ্যে কাজী শাহিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

* সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত