হাসেম ফুডের মালিক ও ৪ ছেলের অব্যাহতিতে ক্ষোভ

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:১৩ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডে আগুনে পুড়ে ৫৪ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এতে কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহেন শাহ্ আজাদসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কারখানার মালিক আবুল হাসেম ও তার চার ছেলেকে। তবে কারখানার মালিককে অব্যাহতি দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও স্বজনহারারা।

গতকাল সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, রবিবার দুপুরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির নারায়ণগঞ্জ অফিসের পরিদর্শক মোকছেদুর রহমান ১৩ পৃষ্ঠার এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রের বিষয়ে মামলার বাদী তৎকালীন ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন আহমেদ (বর্তমানে চট্টগ্রামে এসবিতে কর্মরত) বলেন, মামলার ফলাফলের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে কিছু জানাননি। তার ভাষ্য, এ ঘটনায় কারখানার মালিক দায় এড়াতে পারেন না। এ কারণে হত্যা মামলা করা হয়েছিল। আবুল হাসেমের সঙ্গে তার চার ছেলে হাসিব বিন হাসেম, তারেক ইব্রাহিম, তাওশীফ ইব্রাহিম ও তানজীম ইব্রাহিমকে আসামি করা হয়েছিল।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ইয়াসিনের মা নাজমা বেগম বলেন, ‘কারখানার মালিক ও তার ছেলেদের নাম মামলার এজাহার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে শুনে খুব অবাক হলাম। আমরা এর পূর্ণ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’ আরেক নিহত শ্রমিক আমেনা বেগমের স্বামী রাজীব বলেন, ‘আমরা গরিবরা কখনোই বিচার পাব না। দেখেন কারখানার সিইও, ডিজিএম ও কলকারখানা অধিদপ্তরের রূপগঞ্জ শাখার নেছার উদ্দিন যদি আসামি হয়, তবে তারা বাদ যায় কীভাবে।’

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনার দুই বছর পর এ অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো। আসামিদের বিরুদ্ধে অবহেলার দ্বারা মৃত্যু সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ধারায় একজন আসামির সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে বিধান রয়েছে।

তিনি জানান, অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহেন শাহ আজাদ (৪৩), উপ-মহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ (৫৪), সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাম প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন (২৬), প্রধান প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক) ওমর ফারুক (৩৮), কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ অফিসের পরিদর্শক নেছার উদ্দিন (৪০) ও সৈকত মাহমুদ (৩৭)।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির নারায়ণগঞ্জ অফিসের পরিদর্শক মোকছেদুর রহমান জানান, তার আগে আরও চার কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। তদন্তে তাদের প্রাপ্ত ফলাফল তিনি নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে সাক্ষ্য স্মারকলিপি দাখিল করে কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কারখানার মালিকসহ পাঁচজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ৩৪ হাজার ৫০০ বর্গফুটের হাসেম ফুড কারখানার মূল নকশায় তিনটি সারি থাকলেও নির্মাণকালে দুটি সিঁড়ি রাখা হয়। ২ দশমিক ৫৯ একর জমির ছাড়পত্র নেওয়া হলেও অনুমতি ছাড়া কারখানা সম্প্রসারণ করা হয়। কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। দুর্ঘটনাকবলিত ভবনে শ্রমিকদের বের হতে ভেতর ও বাইরে থেকে খোলার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রতিটি ফ্লোর নেট দিয়ে শ্রমিকদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল ও সিঁড়ি তালাবদ্ধ ছিল। কারখানায় শ্রমিকদের ফায়ার প্রশিক্ষণ ও ফায়ার কর্মী ছিল না। দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের নিচতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে দাহ্য পদার্থ মজুদ ছিল। সেই দাহ্য পদার্থের সঙ্গে উৎপাদিত মালামাল মজুদ করে রাখা হয়েছিল। কারখানার ভবনের ভেতরে মেশিন স্থাপনে দূরত্বের লেআউট প্ল্যান মানা হয়নি। এ ছাড়া কারখানাটি ছয় মাসের শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন নিয়ে করা হলেও সেই শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। শিশু আইন অমান্য করে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আগুনে পোড়া অধিকাংশ মৃতদেহ শিশু বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নিয়মিত কারখানাটি পরিদর্শন করেনি। অথচ কারখানার লাইসেন্স অসাধুভাবে নবায়ন করে গেছেন। প্রতিষ্ঠানের উপমহাব্যবস্থাপক সৌমেন বড়ুয়া ও পরিদর্শক নেছার উদ্দিন কারখানা পরিদর্শনে উদাসীনতা দায়িত্বে অবহেলার কারণে ৫৪ জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক শাহ্ আলম যথাযথভাবে কারখানা পরিদর্শন না করে সনদ নবায়ন করেছেন। তারা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা, সাক্ষ্য-প্রমাণে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিডিও ফুটেজ, মরদেহ সুরতহাল, ডিএনএ টেস্ট প্রতিবেদন, ঘটনার পারিপাশির্^কতা হাসেম ফুডসের নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা অপরিকল্পিত-অব্যবস্থাপনা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কার্যকলাপ, উদাসীনতাসহ নিজেদের খুশিমতো কারখানা পরিচালনা করার কারণে এ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের সৃষ্ট হয়। এতে কারখানা কর্মকর্তা-শ্রমিক ৫১ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। আগুনের ঘটনায় তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে মারাত্মক আহত হয়ে নির্মমভাবে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। অত্র মামলার এজাহারনামীয় ছয় আসামির প্রাথমিকভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে তদন্তকালে হাসেম ও তার চার ছেলের বিরুদ্ধে মামলায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই আসামি আবুল হাসেম ও তার চার ছেলেকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত