আমদানি নয় ফলন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৫৮ পিএম

বাংলাদেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়। সরকারি ভাষ্যমতে, চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু প্রতিবছরই  সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানি করতে হয়। আর গমের চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে  ১০ লাখ ৫৬  হাজার টন চাল ও ৩৯ লাখ টন গম আমদানি করা হয়।  বাংলাদেশে আমদানিকৃত চালের বড় উৎস হলো ভারত। নিজেদের বাজার সামলাতে গত মে মাসে ভারত গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। গত ২১ জুলাই বাসমতী ছাড়া অন্যসব সাদা চাল রপ্তানিতে দেশটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারপর আবার গত ২৫ আগস্ট সেদ্ধ চাল রপ্তানির ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। 

ভারতীয় নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ভারতীয় চালের সংকট দেখা দিয়েছে। রপ্তানির শীর্ষে থাকা ভারত বিশ্বের মোট চালের চাহিদার ৪০ ভাগ রপ্তানি করে। চাল রপ্তানিকারক অন্য শীর্ষে দেশগুলো হলো থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে চাল আমদানিকারক দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে চীন, ফিলিপাইন এবং নাইজেরিয়া। আর অভ্যন্তরীণ বাজারে ঘাটতি দেখা দিলে ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ সামান্য পরিমাণ চাল আমদানি করে। গত বছর ভারত বিশ্বের ১৪০টি দেশে ২২ মিলিয়ন টন চাল রপ্তানি করে। জুলাইয়ে (২১.৭.২৩) ভারতের চাল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞায়  বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এই নিষেধাজ্ঞা চালের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের দাম ১৫ শতাংশেরও বেশি বাড়তে পারে।

ভারতের নিজস্ব মজুদকৃত ৪১ মিলিয়ন টন চাল রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনার ৩ গুণ। তাই ভারতের চাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ঠিক হয়নি। হঠাৎ  নিষেধাজ্ঞা  খাদ্য নিরাপত্তাকে শঙ্কিত করে তুলবে। অন্যদিকে সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রপ্তানিতে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে মিয়ানমার। কৃষ্ণসাগর হয়ে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির জন্য জাতিসংঘ সমর্থিত একটি চুক্তি থেকে গত জুলাই মাসে বেরিয়ে  এসেছে  রাশিয়া। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় আমদানিকারক দেশগুলো ভীষণ বিপাকে পড়েছে। 

রয়টার্সের তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) করা ২৪ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, থাইল্যান্ডে ৫ শতাংশ ভাঙা আতপ চালের দাম উঠেছে  প্রতিটন ৬০৯ মার্কিন ডলার, যা এক মাস আগের তুলনায় ১৪ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায়  প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি। সরকারি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে ঢাকায় খুচরা বাজারে এক কেজি মোটা চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম। ত্রিশালে লোকনাথ খাদ্য ভা-ারের স্বত্বাধিকারী বিশিষ্ট চাল ব্যসায়ীর প্রদীপ মোদকের  সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতের নিষেধাজ্ঞা ও ২০ ভাগ শুল্ক আরোপে বাংলাদেশে চালের দামে কোনো প্রভাব পড়েনি। বর্তমানে ২৫ কেজি ওজনের কাটারি ভোগ চালের বস্তা মানভেদে ১৪৫০ থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ব্রিআর-২৯ চাল ৫০ কেজির বস্তা পাইকারি বাজারে  বিক্রি হচ্ছে ২২৫০ থেকে ২৫০০ টাকায়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাাংলাদেশে চালের উৎপাদন আগের পূর্বাভাস থেকে ৭ লাখ টন কম হতে পারে। ফলে বাংলাদেশকে ৩ লাখ টন বাড়িয়ে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে বলে গত ২৩ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। এবার আউসের ভরা মৌসুমে বাংলাদেশে টানা তাপপ্রবাহ ছিল। বৃষ্টিও হয়েছে কম। জুলাই মাসে আমন রোপণের শুরুতে একই অবস্থা ছিল। তবে আগস্টে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় সারা দেশের কৃষক তাড়াতাড়ি আমন ধান রোপণের কাজ শেষ করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে ইউএসডিএ বলছে,  বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ধানের আবাদ কম হয়েছে।  এটাই উৎপাদন কমার এবং উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণ হতে পারে।  কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, চাল আমদানির বেশি প্রয়োজন হবে না। আগস্টে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমনের উৎপাদন বাড়তে পারে। দেশে উৎপাদিত চাল দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। 

ইউএসডিএ গত মার্চে তাদের পূর্বাভাসে জানায়, বাংলাদেশে ২০২৩-২৪ বিপণনবর্ষে তিন মৌসুম মিলিয়ে ৩ কোটি ৭১ লাখ টন চাল উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  সর্বশেষ পূর্বভাসে তা কমিয়ে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টন ধরা হয়েছে। আউসের আবাদি জমির পরিমাণ পূর্বাভাসে ৫ শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ১০ লাখ হেক্টর ধরায় এ মৌসুমে আউসের উৎপাদন ৪ শতাংশ কমে ২৪ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। আমনে আবাদি জমির পরিমাণ আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ৩ শতাংশ কমে সাড়ে ৫৭ লাখ হেক্টর এবং চালের উৎপাদন ১ কোটি ৪০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। গত বোরোতে ২ কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়েছে বলে প্রাক্কলন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ। তাদের পূর্বাভাস ছিল বাংলাদেশকে ৭ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে। নতুন পূর্বাভাসে সেটা বাড়িয়ে ১০ লাখ টন করা হয়েছে।

দেশে গত বছর আমনের প্রতিকেজি ধান উৎপাদনে ২৮ টাকা খরচ পড়েছিল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ বলছে, বৃষ্টি কম হওয়ায় আমনে সেচ দেওয়াসহ অন্যান্য কারণে উৎপাদন ব্যয় ৫ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ১ টাকা বেশি ব্যয় হতে পারে।  ইউএসডিএ বলছে, আমনে সেচের ব্যয় কৃষকভেদে ভিন্ন। তবে গড় খরচ একরপ্রতি দুই হাজার টাকা। জ¦ালানি, সার ও কীটনাশকের বাড়তি দাম ও শ্রমের বাড়তি মূল্যও উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে।  ইউএসডিএ প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩-২৪ বিপণনবর্ষের শুরু থেকে চালেল দাম প্রতি মাসেই কিছু কিছু বেড়েছে। জুলাই মাসে মোটা চালের গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রতিকেজি ৪৯ টাকা ৪০ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ের সমান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এখন  পর্যন্ত সরকারি গুদামে ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন চাল আছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।

ইতিমধ্যে সারা দেশে আমন ধান রোপণের কাজ শেষ হয়েছে। ফলন বাড়াতে হলে এখন সময়মতো আগাছা দমন, উপরিসার প্রয়োগ, সম্পূরক সেচ প্রদান, পোকা-মাকড় ও রোগবালাই দমন করতে হবে। কৃষিবিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড আরও জোরদার ও গতিশীল করতে হবে। সম্পূরক সেচ ও উপরিসার প্রয়োগের জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে প্রয়োজনে সহজে ও স্বল্প সুদে কৃষিঋণ দিতে হবে। এ ব্যাপারে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ভূমিকা রাখতে পারে। সেচ যন্ত্রের অভাবে যাতে আমন ধানে সম্পূরক সেচ ব্যাহত না হয়, সেচ যন্ত্রগুলো যাতে সচল থাকে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সচেষ্ট থাকতে হবে। প্রতিকেজি ধানের বিদ্যমান সরকারি দাম ২৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে এখনই ৩০ টাকা করা উচিত।

গৌরীপুর উপজেলার ডেউয়াখোলা গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল আজিজ এ বছর আমন মৌসুমে  ব্রিধান ৪৯, ব্রিধান ৫১ জাতের চাষ করেন।  বিলম্বিত বর্ষার কারণে তিনি মাত্র ১৬ দিন আগে ধান রোপণের কাজ শেষ করেন। বিলম্বে রোপণের কারণে এবার আমনের ফলন গত বছরের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য একটু বেশি পরিমাণে সার দিতে হবে। গত বছর তার প্রতি কাঠা অর্থাৎ ১০ শতক জমিতে ধান ফলেছিল ৬ মণ। ধান বিক্রি করেছিলেন ৮০০ টাকা মণ দরে। তার ১০ শতক জমিতে নিজের পরিশ্রম বাদে ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছিল ৩ হাজর টাকা। বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকা। নিজের শ্রমের মূল্য যোগ করলে ধান চাষে কোনো লাভই হয় না। পরিবারের খাবার জোগানের জন্যই শুধু ধানের চাষ করতে হয় তাকে। তার মতে, এবার ধান উৎপাদন খরচ আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই ধানের মণপ্রতি দাম কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়া উচিত।

কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পেলে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হবে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেও আমি চাল কিনতে পারছি না। চাল পাওয়া যায় না। যদি চাল খেতে হয়, আপনাদের চাল পয়দা করে খেতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর এই উক্তিকে গুরুত্ব সহকারে স্মরণ করেই আমাদের আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত