খায়রুল আনাম শাকিল। একাধারে নজরুলসংগীতের প্রখ্যাত শিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠক। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশের সংগীতাঙ্গনে অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক। কিন্তু এখনো তিনি ক্লান্ত নন। প্রতিনিয়ত ছুটে চলছেন দেশের আনাচে-কানাচে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নজরুলচর্চার প্রচার ও প্রসারে নানামুখী কর্মকা- নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। গুণী এই শিল্পী এসেছিলেন দেশ রূপান্তরের শুক্রবারের আড্ডার অতিথি হয়ে। তার সঙ্গে গল্প কথায় মেতে ওঠেন সিনিয়র কপি এডিটর সাইফ তারিক সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান ও বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ
মাসিদ রণ : ছোটবেলা, বেড়ে ওঠা কোথায়?
খায়রুল আনাম শাকিল : আমার জন্ম বেড়ে ওঠা সবটাই ঢাকাতে। আমার বাবা মো. আবুল খায়ের, মা নিলুফার খায়ের। বাবা ব্যবসার পাশাপাশি একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক, আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বর্তমানে যে শিল্পকলা একাডেমি, পাকিস্তান আমলে সেটি ছিল আর্ট কাউন্সিল। ১৯৫৬-৫৭ সালের কথা, আর্ট কাউন্সিলের অনারারি সেক্রেটারি ছিলেন বাবা। এছাড়া সে সময় বড় বড় কনসার্ট আয়োজন করতেন তিনি। মূলত ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের কনসার্ট আয়োজন করতেন বাবা। বড়ে গোলাম আলী খাঁ সাহেব থেকে শুরু করে বড় বড় প-িতরা আসতেন গাইতে। সেগুলো দেখেশুনেই তো বড় হয়েছি। এছাড়া বাবা চলচ্চিত্রের প্রযোজক ছিলেন। সুভাস দত্তের প্রথম সিনেমা ‘সুতরাং’ বাবার প্রযোজিত সিনেমা। এই ছবির মাধ্যমেই কবরী খালারও (কিংবদন্তি অভিনেত্রী প্রয়াত কবরী) আত্মপ্রকাশ হয়। আরেকটি ব্যবসাসফল সিনেমা ‘কাগজের নৌকা’ও নির্মাণ করেন বাবা। ১৯৭০ সালে ‘জয় বাংলা’ নামে একটি ছবি প্রযোজনা করেন। যদিও পাকিস্তান আমলে ছবিটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সে আরেক কাহিনি। অন্য কোনোদিন হয়তো বলা যাবে।
মাসিদ রণ : আজই বলুন না গল্পটি...
খায়রুল আনাম শাকিল : (একটু হেসে) আচ্ছা তাহলে বলছি। ‘জয় বাংলা’ সিনেমাটি প্রথমে অন্য নামে করা হয়। কারণ সে সময় ছবির পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ পশ্চিম পাকিস্তানেই করতে হতো। বাবা সব টেকনিক্যালি করে এনেছিলেন দেশে মুক্তি দেবেন বলে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সে খবর কীভাবে যেন জেনে ফেলে। প্রেসিডেন্ট অফিস থেকে একটি চিঠি এলো বাবার কাছে, তাতে লেখা ছবিটি নিয়ে পাকিস্তানে যেতে হবে। প্রেসিডেন্ট নিজেই ছবিটি দেখবেন। বাবা একটু ঘাবড়ে গেলেন, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই আরেকটি চিঠিতে জানানো হলো তোমার পাকিস্তান পর্যন্ত যেতে হবে না। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেই ছবিটির একটি প্রদর্শনী করো। ছবিটি দেখবেন কমান্ডার রাও ফরমান আলী (যার প্ল্যানিংয়েই ২৫ মার্চের সেই কুখ্যাত গণহত্যা অপারেশন সার্চলাইট হয়েছিল)। ১৯৭১-এর ২৩ মার্চ আমাদের দিলু রোডের বাড়িতে আর্মির গাড়ি এলো বাবাকে নিতে। মায়ের নির্দেশে আমিও বাবার সঙ্গে উঠে পড়েছিলাম সেই গাড়িতে। যদিও আমার বয়স তখন ১২ কি ১৩, বাবাকে রক্ষা করার কোনো ক্ষমতা আমার হয়নি। তবুও মা বললেন, ‘তুমি সঙ্গে যাও।’ টেনশনের চোটে বাবা খেয়ালও করেননি যে আমি গাড়িতে উঠে বসেছি। গাড়ি পাক মোটরে (এইতো আপনাদের অফিসের এই এলাকাকে তখন পাক মোটর বলা হতো, এখন হয়েছে বাংলা মোটর) আসার পর তিনি বললেন, ‘তুমি কখন উঠলে!’ যাই হোক ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে আমরা বসে আছি। রাও ফরমান আলী যখন এলেন কুচকাওয়াজে পুরো ক্যান্টনমেন্ট কেঁপে উঠল। বাবার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তার ঘাড়ে হাত দিয়ে নিয়ে গেলেন, ছবি চলার আগে বাবাকে তার পাশেই বসালেন। আর বললেন, ‘আপনি পাকিস্তানি অ্যাসেম্বলির একজন মেম্বার, আমাদের সম্মানিত একজন অতিথি। কিন্তু আপনি এমন একটি পলিটিক্যাল সিনেমা কেন নির্মাণ করলেন?’ বাবা বললেন, ‘না, এটি একটি সামাজিক ছবি।’ এরপর ছবিটি দেখার পর তিনি বাবাকে আবারও বললেন, ‘ঠিক আছে আপনি ছবিতে মানুষের অভাব-অনটনের চিত্র দেখাচ্ছেন, কিন্তু ঘটনার ব্যাকড্রপে তো প্রচুর মিছিল-মিটিংয়ের দৃশ্য। প্ল্যাকার্ডে ৬ দফাও দেখাচ্ছেন।’
এই ছবিরই গান ছিল জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়। পরবর্তী সময়ে তো গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের থিম সংয়ে পরিণত হয়, যা অসংখ্য মানুষকে আজও অনুপ্রাণিত করে। ফরমান আলী সবশেষে বাবাকে বললেন, ‘আসলে আপনি ৬ দফা নিয়েই ছবিটি করেছেন। কিন্তু আমরা তো এই ছবি প্রদর্শন হতে দিতে পারি না। আমরা এই ছবি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি।’ তিনি এও বলেন, ‘আপনি যেহেতু পাকিস্তানি অ্যাসেম্বলির সদস্য, ফলে আমরা আপনাকে সম্মান জানিয়েই বলছি ছবিটি আমাদের কাছে বিক্রি করে দেন। যা খরচ হয়েছে পাকিস্তান সরকার সেটা বহন করবে।’ কিন্তু বাবা তখন বললেন, ‘এই ছবিটি বিক্রির নয়। তোমরা যা করার করো, আমার যা করার আমি তাই করব।’ এরপর সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসি। আমাকে পাক মোটরে নামিয়ে দিয়ে বাবা সোজা চলে গেলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। উনি বললেন, ‘আপনি ভয় পাইয়েন না। অ্যাসেম্বলি মেম্বার হিসেবে আপনার গায়ে হাত তুলতে পারবে না।’ তখন তো আর আমাদের ধারণাও ছিল না মাত্র দুদিন পর দেশে কী হতে যাচ্ছে।
মাসিদ রণ : আপনার বাবা তো বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণও রেকর্ড করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় একমাত্র সেই রেকর্ডটিই ব্যবহার করা হতো। সেই গল্পটি শুনতে চাই...
খায়রুল আনাম শাকিল : হ্যাঁ, বাবার এই কাজটি সত্যি আমাদের পুরো পরিবারকে সবচেয়ে বেশি গর্বিত করে। তার ‘ঢাকা রেকর্ড কোম্পানি’ নামের একটি অডিও প্রতিষ্ঠান ছিল। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে স্পেশাল পারমিশন নিয়ে সাত মার্চের ভাষণ তিনি মঞ্চের নিচে থেকে লুকিয়ে পুরোটা অডিও রেকর্ড করেছিলেন। আর এখন যে ভিডিওটা দেখতে পাওয়া যায় সেটি করেছিলেন বাবারই বন্ধু, একই নামে নাম, অভিনেতা আবুল খায়ের। তবে ভিডিওটি যুদ্ধের সময় একটি গ্রামে তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে মুক্তিযুদ্ধের সময় তা আর কোনো কাজে আসেনি। দেশ স্বাধীনের পর আবার ভিডিওটি উদ্ধার করা হয়। যাই হোক, সেই রেকর্ড মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ‘জয় বাংলা’ শিরোনামে ক্যাসেট আকারে তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চে উপহার দিয়েছিলেন বাবা। তিনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন সেটি পেয়ে। ঠাট্টা করে তোফায়েল সাহেব বলেছিলেন, এই ক্যাসেটের রয়্যালিটি তো পাবে আওয়ামী লীগ। তখন বঙ্গবন্ধুও হাসতে হাসতে বলেছিলেন, কেন? আওয়ামী লীগ পাবে কেন? ভাষণ আমার, কণ্ঠ আমার, এটা তো আমি পাব! যাই হোক, ২৫ মার্চের গণহত্যার সময়ও আমাদের বাড়িতে ৫০ খানার মতো সেই রেকর্ড ছিল।
মাসিদ রণ : মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো আপনাদের জন্য কেমন ছিল?
খায়রুল আনাম শাকিল : ২৫ মার্চ সকালেই তো বাবা বেরিয়ে পড়েন বাড়ি থেকে, জিঞ্জিরা চলে যান। আমরা তারপরও কয়েকদিন ছিলাম বাড়িতে। এরমধ্যে তো বঙ্গবন্ধুকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে পাক বাহিনী। ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আপন ফুফাতো ভাই, আমাদের খোকা মামা বেগম মুজিব, রেহানা আপা আর রাসেলকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে এলেন। প্রধানমন্ত্রীর তখন বিয়ে হয়ে গেছে, তিনি থাকেন স্বামীর সঙ্গে অন্য জায়গায়। সেজন্য তিনি সঙ্গে ছিলেন না। এই ঘটনা আশপাশে জানাজানি হয়ে যাওয়াতে মাত্র এক রাত থেকেই উনারা চলে যান পুরান ঢাকায় খোকা মামার শ্বশুরবাড়িতে। সেখানেই পরবর্তী সময়ে উনাদের গৃহবন্দি করা হয়। আমরা অবশ্য বাবার কাছে জিঞ্জিরাতে চলে যাই। সেখান থেকে আমরা পুরো পরিবার কলকাতা চলে যাই। বাবা মুজিবনগর সরকারে হেড অব ফিল্ম ডিভিশন হিসেবে যোগদান করেন। সে সময় বাবা ৭ মার্চের ভাষণটি তাজউদ্দীন আহমেদকে দিলেন। তিনি সেটি পেয়ে বাবাকে অনেক সাধুবাদ দিলেন। রেকর্ডটি কপি করার জন্য ভারতের বিখ্যাত এইচএমভি কোম্পানিকে বলাতে তারা ফ্রি অব কস্টে তিন হাজার রেকর্ড তৈরি করে দিয়েছিল। প্রত্যেকটা মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র এবং বিভিন্ন দেশের অ্যাম্বাসিতে সেই রেকর্ড পাঠানো হয়। তখন তাজউদ্দীন সাহেবের নির্দেশে আরেকটি বিরাট কাজ হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের ওপর যে ধরনের অন্যায় অত্যাচার হচ্ছে তা নিয়ে তিন ডকুমেন্টারি তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মহল যাতে এ বিষয়ে সম্যক ধারণা পায়, সেজন্যই এই প্রামাণ্যচিত্র করা হয়। আগে একজন একটি ডকুমেন্টারি করেছিলেন, কিন্তু তাজউদ্দীন সাহেবের পছন্দ হয়নি, খরচও অনেক বেশি এসেছে। তাই তিনি বাবার ওপর দায়িত্ব দেন। ততদিনে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানও সেখানে ছিলেন। তখন এত বাজেটও ছিল না যে জহির রায়হানের মতো মানুষকে এই কাজ করার জন্য ভাবা যায়। কিন্তু তাও বাবা তাকে অনুরোধ করেন কাজটি করতে। তার মতো দেশপ্রেমী মানুষও আমি কম দেখেছি। মাত্র ২৫ হাজার টাকায় তিনি স্টপ জেনোসাইড, চিলড্রেন অব বাংলাদেশ আরেকটির নাম মনে পড়ছে না, এই তিনটি প্রামাণ্যচিত্র করে দিয়েছিলেন। পারিশ্রমিক হিসেবে চেয়েছিলেন, সন্তানের খাওয়ার জন্য দুধ কেনার পয়সা! শুধু তাই নয়, জহির রায়হান সাহেব ‘জীবন থেকে নেয়া’ কলকাতায় সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ছবি প্রদর্শনী করে যে টাকা পেতেন সবটাই মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে দিয়ে দিতেন।
মাসিদ রণ : এবার আপনার শিল্পী জীবনের দিকে আলো ফেলা যাক। সংগীত চর্চা কবে থেকে শুরু হলো, কীভাবে শুরু হলো?
খায়রুল আনাম শাকিল : পারিবারিকভাবেই সংগীতচর্চাটা ছিল। বিয়ের আগে আমার মা বুলবুল ললিতকলা একাডেমির ছাত্রী ছিলেন, বিয়ের পর ছায়ানটেও গান শিখেছেন। খুব ভালো রবীন্দ্র সংগীত করতেন। তখনকার দিনে মেয়েদের একা বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হতো না। তাই মায়ের সঙ্গে মামা মাহমুদুর রহমান বেনুও যেতেন ছায়ানটে। শুধু শুধু গিয়ে বসে না থেকে গান শিখলে ক্ষতি কী, এমন মনোভাব নিয়েই তিনিও গানে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিখ্যাত শিল্পী ও সংগঠক হয়েছেন, পেয়েছেন একুশে পদক। তারেক মাসুদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এও মামাকে বিশেষভাবে দেখা যায়। যাই হোক, তার কাছেই আমার গানের হাতেখড়ি। শুধু তাই নয়, সবদিক থেকেই তিনি আমার গুরু। ১৯৬৮ সালেই আমি শাপলা কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় অংশ নিই নানীর অনুপ্রেরণায়। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার সাহেব ছিলেন প্রোডিউসার। তিনি আমার অডিশন নেন। আমি টিকে যাই। আমার খালা শাম্মী রব্বানী ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’ রবীন্দ্রসংগীতটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন। কীভাবে কীভাবে যেন সেই গানটি গেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করি। সবাই তা দেখে আমাকে ভালোভাবে গান শিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। বেনু মামাই ছায়ানটে ভর্তি করে দেন। সেখানেই কোর্স শেষ করি। এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, দেশ স্বাধীনের পর আবারও ছায়ানটে যাওয়া শুরু করলাম।
একটা পর্যায়ে আমি বিলেতের বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হই। লন্ডনে এসে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করি। অনেকে এ কথা শুনে বলেন, তাহলে আপনি গানটা শিখলেন কবে। শেখার পুরোটা সময়ই তো ছিলেন বিদেশে। কিন্তু তারা এটা জানে না যে, আমার গুরু অর্থাৎ মামাই তো ছিলেন সেখানে। বেনু মামা বিলেতে গিয়েছিলেন পিএইচডি করতে। ফলে বিদেশে থাকলেও নিয়ম করে মামার কাছে গান শিখতাম। তবে আমার বেজটা তৈরি করে দেয় ছায়ানট। শিশুবেলায় আপনার মধ্যে কোনো চেতনা জাগ্রত হলে সেটির রেশ কিন্তু আজীবন রয়েই যায়। ফলে ১২ বছর বিদেশে থাকলেও আমার মধ্যে দেশপ্রেম, সংস্কৃতির প্রতি প্রেম, চর্চার জায়গাটা ছায়ানটই তৈরি করে দিয়েছে।
মাসিদ রণ : প্রফেশনালি গান করছেন কবে থেকে?
খায়রুল আনাম শাকিল : লন্ডনে যাওয়ার আগেই ১৯৭৪ সালে সন্জীদা খাতুন আপা আমাদের ছায়ানটের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বিটিভিতে পাঠালেন অডিশন দিতে। ১৫ বছর বয়স হলেও কণ্ঠ বরাবরই ভারী বলে তখনই বড়দের অনুষ্ঠানে তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে যাই। সেদিক থেকে বয়সের তুলনায় আমি অনেক সিনিয়র শিল্পী (হা হা হা)। বেনু মামা নজরুলের আদি রেকর্ড শুনে এমন এমন কঠিন সব গান শিখেছিলেন, সেসব আমাকেও শেখাতেন। এসব অপ্রচলিত নজরুল সংগীত আমি যখন দেশে ছুটিতে আসতাম, তখন গাইতাম। আশির দশকের কথা, লন্ডন থেকে ছুটিতে এসে আমি আলতাফ মাহমুদ সংগীতায়তনে একেবারেই নজরুলের লেখা ও সুরে ধ্রুপদ আঙ্গিকের ‘শংকর অঙ্গলীনা যোগ মায়া, শংকরী সে বাণী বালিকা কমলি’সহ বেশকিছু গান নিয়ে একক পরিবেশনা করি। তা শুনে ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট শিল্পী ওয়াহিদুল হকসহ সবাই অবাক হয়ে গেলেন। কারণ নজরুলের যেসব গান আমাদের দেশে জনপ্রিয় ছিল, সেগুলো ছিল সহজ ধাঁচের। ক্লাসিক্যাল বেইজ এমন সব গান নজরুলের রয়েছে সে কথা অনেকেই বিশ্বাস করত না। ১৯৮৫ সালে দেশে একেবারেই ফিরে আসি।
মাসিদ রণ : নজরুল সংগীত গাইতে গেলে ক্লাসিক্যাল চর্চা করতেই হয়। সবাই বলে যারা ক্লাসিক্যাল জেনে আসেন তারা সব ধরনের গান গাইতে পারেন। কিন্তু আপনাকে সেভাবে আর কোনো ধারার গানে পাওয়া যায়নি কেন?
খায়রুল আনাম শাকিল : কিছু আধুনিক গান যে গাইনি তা নয়। ছবিতেও দু-একটা গান করেছি। কিন্তু সবদিকে মন দিলে নজরুলের গানটিকে যে পর্যায়ে নিতে পেরেছি তা পারতাম না বলেই অন্যদিকে মন দিইনি। কারণ নজরুলের এমনও ধারা রয়েছে যা ভালোভাবে করতে গেলে নজরুলেরই অন্য ধারার গান গাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক পরিবেশ বিবেচনা করে আমি শুধু নজরুলেরই সব ধারার গানের কিছু কিছু আয়ত্ত করেছি।
মাসিদ রণ : নজরুলের গান গাইলে অতি দ্রুত তথাকথিত তারকা হওয়া সম্ভব নয়। জনপ্রিয়তাও জোটে কম। এসব ধারণায় কি আপনি বিশ্বাসী?
খায়রুল আনাম শাকিল : হ্যাঁ। এখন তো তাই দেখছি। রিয়েলিটি শো থেকে এসেই কয়েক বছরে গাড়ি-বাড়ি, দেশ-বিদেশে কনসার্ট সব হয়ে যাচ্ছে। আবার ঝরেও যাচ্ছে। তবে এসব জেনেবুঝেই আমি নজরুলের গানকে বেছে নিয়েছি। সবাই সবটা একসঙ্গে পাবে না, এটা জেনেই এ ধরনের গান করা উচিত।
সাইফ তারিক : বাংলাদেশে এক ধরনের অযাচিত চর্চা রয়েছে রবীন্দ্রনাথ বড় না নজরুল বড়। এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনাও কাজ করে। যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
খায়রুল আনাম শাকিল : রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে শাস্ত্রীয় গানের চর্চা ছিল। তিনি সেগুলো শুনেই বড় হয়েছেন। ফলে নিজের গানের সুর ও তালের ব্যবহার তিনি করেছেন ধ্রুপদ সুর ভেঙেই। তবে কিছু গান যে খেয়াল আঙ্গিকে লেখেননি, তাও নয়। কিছু গান ফোক ধাঁচেরও রয়েছে, কিছু গান আছে বিদেশি সুর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। তবে সেগুলো সংখ্যায় খুব কম। রবীন্দ্রনাথের সময় অন্য যারা গান লেখালেখি করতেন, সিংহভাগই ছিল রবীন্দ্রঘেঁষা। পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম রবীন্দ্রনাথের থেকে তিন দশক পর। ফলে দুজনের লেখালেখির মিল না থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে তার ব্যাগে সব সময় রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি, বইপত্র সারাটাক্ষণ থাকত। নজরুল একেবারেই আলাদা ঘরানায় নিজেকে মেলে ধরেন। সেটি হলো শাস্ত্রীয় গানের আরেকটি ধারা খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, গজল ও আধুনিক। আমরা সবাই জানি বাংলা সাহিত্যে পঞ্চকবির অবদানের কথা। কিন্তু তাদের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তিনিই কাজী নজরুল। কারণ এই দুজনের ভলিউম অব ওয়ার্ক অন্য তিনজনের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। ফলে রবীন্দ্র-নজরুলকে আসলে তুলনা করার মতো কিছু নেই। কারণ দুজনের ধারাটাই তো আলাদা। নজরুল সব সময় রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু বলেই সম্মান দিতেন, তাকে মাথার ওপরে রাখতেন। এখন অন্যরা যদি সেটি না মেনে নিজেদের অভিমত প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে বোকার মতো কাজ হবে।
সাইফ তারিক : আধুনিক সময়ে অনেকেই সংগীত নিয়ে ফিউশন করছে। আপনি এটার পক্ষপাতী কি না? আর ফিউশন যদি করতেই হয়, কোন কোন বিষয় মনে করতে হবে?
খায়রুল আনাম শাকিল : দেখুন, কাজী নজরুলের ৩৩ ধারার গান রয়েছে। প্রত্যেকটি আলাদা। এখন একটি খেয়াল আঙ্গিকের গান যার ১৬ মাত্রা তাল, সেটি তো ড্রামসে বাজানোই যায় না। ঠুমরি আঙ্গিকের গানে সারেঙ্গি না বাজলে বা ফোক আঙ্গিকের গানে দোতারা না বাজলে গানের রূপটাই তো খোলে না। আমি বিদেশি যন্ত্র ব্যবহার করতেই পারি, কিন্তু এই মাত্রা, তাল ও ছন্দ বুঝে না করলে সে ধরনের ফিউশন না করাই ভালো।
তাপস রায়হান : লন্ডন থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে এসেও সে পথে গেলেন না কেন? এ নিয়ে কখনো কোনো আফসোস কাজ করেছে?
খায়রুল আনাম শাকিল : বিদেশ থেকে পড়াশুনা শেষে দেশে ফিরে আমি কিন্তু ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিতে চাকরি পাই। পোস্টিং হলো চিটাগাংয়ে। কিন্তু সেই কাজ করতে গেলে আমার গানটা ছেড়ে দিতে হতো। বাবা মাকে বলার পর, তারাও আমার গানটা ছেড়ে দিই সেটা চাইলেন না। তাই পুরোদস্তুর গানেই সময় দিতে পারলাম। তবে জীবিকার জন্য গান গাইনি কখনো। পারিবারিক ব্যবসা থেকেই নিশ্চিত জীবনযাপন করেছি। গানটা মনের আনন্দ আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে করেছি। তাই এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।
মাসিদ রণ : আপনারা কয়েকজন মিলে নজরুল সংগীতের একটি জায়গা তৈরি করেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি সেই জায়গা ধরে রাখতে পারবে?
খায়রুল আনাম শাকিল : এ ব্যাপারে আমি একদিক দিয়ে খুবই আশাবাদী। তরুণ প্রজন্মের প্রচুর সংখ্যক ছেলেমেয়ে নজরুলের গানকে ভালোবেসে করছে। তবে মন খারাপ হয় যখন দেখি তারমধ্যে ৯০ শতাংশই অন্য ধর্মের। কয়েক বছর আগেও এমন চিত্র ছিল না। ইসলাম ধর্মের ছেলেমেয়েরা কেন সংস্কৃতিচর্চা থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে আমি বলতে পারব না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যা ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কারণ সংস্কৃতিচর্চা ছাড়া কোনো দেশ সুস্থ সমাজ গড়তে পারে না। আমাদের দেশের জন্মটা অনেকটাই সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে, এটা ভুললে চলবে না। এখনই সময়, নতুন করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার।
মাসিদ রণ : আপনি সারাক্ষণ নজরুলের গানের প্রচার ও প্রসার নিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে কী কী কাজে ব্যস্ততা রয়েছে?
খায়রুল আনাম শাকিল : আমি ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া নজরুল সংগীত সংস্থার সভাপতি। নজরুল ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও জড়িত। সংস্থা থেকে আমরা এরইমধ্যে দেশের প্রায় সব জেলায় কর্মশালা করিয়েছি। এখন নজরুলের প্রায় দেড় হাজার গানের শুদ্ধ স্বরলিপি পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো থেকে দেশ ও বিদেশের বরেণ্য শিল্পীদের কণ্ঠে রেকর্ড করছি। বিভিন্ন জেলার মেধাবী শিল্পীরাও সুযোগ পাচ্ছেন গাইতে।
তাপস রায়হান : আপনার স্ত্রী কল্পনা আনামও নজরুল সংগীতের প্রসিদ্ধ শিল্পী। তার সঙ্গে পরিচয় প্রণয় থেকে শুরু করে তার গায়কি সম্পর্কে আপনার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই।
খায়রুল আনাম শাকিল : কল্পনাও দেশের অন্যতম একজন নজরুল সংগীত শিল্পী। গানের মাধ্যমেই পরিচয়। তার অল্পদিনের মধ্যেই বিয়েটা হয়, তাও পারিবারিকভাবেই। সে যে কাজটি করে খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করে। তাই আজকের পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছে। আমাদের দুই ছেলে বিদেশে পড়াশুনা করছে। কেউই গানের সঙ্গে যুক্ত নয়।
তাপস রায়হান : এমন কোনো স্বপ্ন আছে যেটা আজও পূরণ হয়নি?
খায়রুল আনাম শাকিল : স্বপ্ন দেখি দেশের প্রতিটি ঘরে গান বাজবে। প্রতিটি ঘরের ছেলেমেয়েরা সংস্কৃতিচর্চা করবে।
গ্রন্থনা : মাসিদ রণ, ছবি : আবুল কালাম আজাদ
ভিডিও : লিটু হাসান, লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ