ধীরগতির কারণে প্রকল্পঋণ কমাল বিশ্বব্যাংক

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৫২ পিএম

গ্রামের রাস্তায় সেতু করার প্রকল্পে ধীরগতির কারণে ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক প্রকল্প ঋণের কিছু অংশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তাতেই বিপাকে এলজিইডি। ঋণ প্রত্যাহার করায় পুরো প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় সেতু ও কালভার্ট করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘গ্রামীণ সড়কে সেতু সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যা চলতি বছরের আগস্টে শেষ হওয়ার কথা। ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকার প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন ১ হাজার ৫২৫ কোটি আর বিশ্বব্যাংকের ঋণ ৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি কম থাকায় প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ডলার প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিশ^ব্যাংক। কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় ডলার সংকটের এমন সময়ে প্রকল্প ঋণ কমিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা ঘটছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৬ জুলাই ‘গ্রামীণ সড়কে সেতু সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ণ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) একেএম ফজলুল হক।

সভায় এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুল আহসান জানান, প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের (আইডিএ) অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এখন বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্প থেকে ৮ কোটি ৪৬ লাখ ইউএস ডলার প্রত্যাহার করায় পূর্তকাজের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধনী প্রস্তাব ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান প্রকল্প পরিচালক।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত ডিপিপির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে এলজিইডি। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারের অর্থায়নের পরিমাণ অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে প্রকল্প ঋণ বাবদ ২৫৫ কোটি ৪৬ লাখ কমানো হয়েছে। আর বাস্তবায়নের মেয়াদও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। অর্থাৎ ২ বছর ৪ মাস বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে বিশ্বব্যাংক প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ডলার প্রত্যাহার করে নিলেও প্রকল্প ব্যয় কমানো হয়েছে ২৫৫ কোটি টাকা। এতে করে সংশোধিত প্রকল্পের ঘাটতি অর্থায়ন কীভাবে সংস্থান হবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে একেএম ফজলুল হক বলেন, বিদেশি ঋণে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ালে ঋণের সুদ বেড়ে যায়।

কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান মো. ছায়েদুজ্জামান জানতে চান, বিবেচ্য প্রকল্প থেকে ৮ কোটি ৪৬ লাখ ডলার স্থানান্তর করা হয়েছে কেন। জবাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রেজাউল করিম বলেন, গত অর্থবছরে বাজেট সাপোর্ট দেওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন যে সব প্রকল্পের অগ্রগতি কম সে সব প্রকল্প থেকে কিছু টাকা কমিয়ে একই উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অন্য প্রকল্পে দেওয়া হয়। বিবেচ্য প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি কম বিধায় এ প্রকল্প ৮ কোটি ৪৬ লাখ ডলার স্থানান্তর করে অন্য প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে।

পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় এ প্রকল্পে এ যাবত কত মিলিয়ন ডলার বা সমপরিমাণ কত কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পাওয়া গেছে তা জানতে চান। এ সময় এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, এ যাবত প্রকল্পটিতে প্রোগ্রাম ফর রেজাল্ট খাতে ৯ কোটি ৫৭ লাখ বা ৮০৮ কোটি টাকা এবং ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং খাতে ৮৪ লাখ ২৫ হাজার ডলার বা ৭৬ দশমিক ৮২ কোটি টাকাসহ ১০ কোটি ৪১ লাখ ডলার বা ৮৮৫ কোটি টাকা পাওয়া গেছে।

প্রকল্পটির অগ্রগতি কম হওয়ার ব্যাখ্যায় এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ডিএলআই অনুসরণ করে পূর্তকাজ বাস্তবায়ন এলজিইডির জন্য নতুন বিধায় প্রকল্পের শুরুতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ব করে স্কিম প্রণয়ন করতে বিলম্বিত হয়েছে। জরিপের মাধ্যমে ব্রিজ বা কালভার্টের হালনাগাদ তথ্যসংগ্রহ করে কম্পিউটার সফটওয়্যারে ইনপুট প্রদান করতে গিয়ে নির্ধারিত শর্তাদি অনুসরণ করে অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়নে সময়ক্ষেপণ হয়েছে এবং ডিজাইন ও রক্ষণাবেক্ষণ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সময়ভিত্তিক পদ্ধতিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণে এবং কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিলম্বিত হওয়ায় পূর্তকাজের অগ্রগতি মন্থর হয়েছে।

তবে অগ্রগতি কেমন হয়েছে তার ব্যাখ্যা তারা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়নি। ব্যাখ্যায় এলজিইডি বলছে, আরডিপিপি পুনর্গঠনের সময় জুন ২০২৩ পর্যন্ত হালনাগাদ আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতির তথ্য প্রতিফলন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের অগ্রগতি অনেক কম তাই ২২টি পরিদর্শন যানবাহন ভাড়া খাতের যৌক্তিকতা এবং এ খাতে যানবাহনের সংখ্যা ও পরিমাণ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে এলজিইডি এ ব্যয় কমাতে নারাজ।

এ বিষয়ে সেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, এই প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশের ৬১টি জেলাকে ১৯টি অঞ্চলে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১৯টি আঞ্চলিক অফিসে ১৯টি, নির্মাণকাজ পরিদর্শন ও নির্মাণ সামগ্রী ল্যাবরেটরির পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ কাজে একটি এবং সদর দপ্তরের মনিটরিং কাজে দুটি গাড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই যানবাহনের সংখ্যা ও পরিমাণ হ্রাস করার সুযোগ নেই।

অর্থ বিভাগের উপসচিব জাকির হোসেন বলেন যে, আউটসোর্সিং সেবা খাতে ৫৬ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ব্যয় অত্যধিক। এর ব্যাখ্যায় সেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, মূল ডিপিপি প্রক্রিয়াকরণের সময় আউটসোর্সিং সেবা খাতে কোনো ইকোনোমিক কোড ছিল না ফলে হায়ারিং চার্জ থেকে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হতো। পরবর্তী সময়ে আউটসোর্সিং কোড সৃষ্টি হওয়ায় সংশোধিত ডিপিপিতে বর্তমানে আউটসোর্সিং কোডে বেতন ভাতা বাবদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে এ খাতের ব্যয় কমানোর ব্যাপারে অর্থ বিভাগের আউটসোর্সিং নীতিমালা ও সেবা মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী আউটসোর্সিং খাতে পাঁচ কোটি টাকা কমিয়ে ৫১ কোটি টাকা সংস্থানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থ বিভাগ যুক্তি দিয়ে বলেছে, অর্থ বিভাগের আউটসোর্সিং-সংক্রান্ত ওই নীতিমালা বা পরিপত্র অনুযায়ী আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত জনবলকে যাতায়াত ভাতা প্রদানের কোনো সুযোগ নেই বিধায় এই বাবদ কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত