ইডিএফের শতকোটি টাকা ফেরত দেয়নি থার্মেক্স

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:১২ এএম

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে শতকোটি টাকার ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেয়নি ব্যবসায়ী আবদুল কাদির মোল্লার থার্মেক্স গ্রুপ। বাধ্য হয়ে বিদেশি মুদ্রার ঋণটিকে ফোর্সড লোনে রূপান্তর করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক। সময়মতো ঋণ ফেরত না দেওয়ায় ব্যাংক দুটিতে খেলাপি হয়ে পড়ে শিল্প গ্রুপটি। এখানেই শেষ নয়। এই ঋণ বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিল করে দায় পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংক দুটি।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানিকারকদের সহায়তায় ১৯৮৯ সালে গঠন করা হয়েছিল ইডিএফ, যা থেকে কাঁচামাল আমদানির জন্য উদ্যোক্তাদের ডলারে ঋণ দেওয়া হয়। এ ফান্ডের আকার বাড়তে বাড়তে ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারে পৌঁছালেও পরে আইএমএফের চাপে তা কমিয়ে ৪ দশমিক ১০ বিলিয়নে (৪১০ কোটি) নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু যারা এ ফান্ড থেকে ঋণ নিয়েছে তাদের অনেকেই ফেরত দিতে পারছে না মার্কিন মুদ্রায় নেওয়া এসব ঋণ। এতে বিপাকে পড়েছে রূপালী, অগ্রণীসহ আরও কিছু ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ থেকে গঠিত ইডিএফ থেকে থার্মেক্স গ্রুপকে ৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলেও তা শোধ দিতে পারেনি গ্রুপটি। বাধ্য হয়ে থার্মেক্স গ্রুপের নামে সুদে-আসলে ৭১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ফোর্সড লোন সৃষ্টি করেছে রূপালী ব্যাংক। বর্তমানে মাসিক কিস্তিতে আগামী ছয় মাসে তা পরিশোধের আবেদন করেছে থার্মেক্স। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি চেয়েছে রূপালী ব্যাংক। কিন্তু সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি এই ৭১ কোটি ৭৩ লাখ এবং থার্মেক্স গ্রুপের অন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিস্টার ডেনিম কম্পোজিট লিমিটেডের নামে নেওয়া ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দিতে না পারলে মন্দমানে খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কারণ এই ঋণগুলোর মাধ্যমে রূপালী ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করেছে থার্মেক্স। অর্থাৎ মূলধনের ২৫ শতাংশ (ফান্ডেড-নন-ফান্ডেড) অতিক্রম করেছে।

বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রূপালী ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বা মূলধন ছিল ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। বিধি অনুযায়ী, কোনো একক গ্রাহক বা গ্রুপকে ৫৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই রূপালী ব্যাংকের। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, থার্মেক্স গ্রুপের ঋণ রূপালী ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ গ্রুপটি রূপালী ব্যাংকের একটি বড় গ্রাহক। কিন্তু বার্ষিক প্রতিবেদনে বড় গ্রাহকের তালিকায় নাম নেই থার্মেক্সের। ৩৬৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া গ্রাহক নোমান স্পিনিং মিলসের নাম বড় গ্রাহকের তালিকায় থাকলেও থার্মেক্সের নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, রূপালী ব্যাংক থেকে থার্মেক্স গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার আশপাশে ছিল। কিন্তু এত দিন একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করেনি। নতুন করে ৮৩ কোটি ৭৯ লাখ (৬৬.২৭ ও ১৭.৫২ কোটি) টাকা যুক্ত হয়ে ঋণের সমষ্টি একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী যা অন্যায়।

এসব বিষয়ে জানতে পরপর তিন দিন রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গেলেও দেখা করেননি ব্যাংটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর।

এদিকে, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিএজি) কর্তৃক ২০২২ সালের এপ্রিলে পরিচালিত এক বিশেষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আবদুল কাদির মোল্লার থার্মেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থার্মেক্স ব্লেন্ডেড ইয়ার্নও রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে ইডিএফের ঋণ সুবিধা নিয়েছে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে থার্মেক্স ব্লেন্ডেড ইয়ার্নের একটি ৫৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করে অগ্রণী ব্যাংক। শর্ত অনুযায়ী, ওই ঋণের তিন কিস্তির সমপরিমাণ অর্থ জমা নিয়ে তারপর পুনঃতফসিল করার কথা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে ওই শর্ত মানা হয়নি। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ঋণ মঞ্জুরির শর্ত অনুযায়ী এই গ্রাহককে খেলাপি হিসেবেই বিবেচিত করতে বলা হয়।

এতে থার্মেক্স ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন ইডিএফের ঋণগ্রহণে অযোগ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু আইন পরিপালন না করে খেলাপি ঋণ গ্রহীতার অনুকূলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ইডিএফ ঋণ ও এলসি সুবিধা প্রদান করেছে। ইডিএফ ঋণপ্রাপ্তির যোগ্যতায় বলা হয়েছে, যেসব রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কোনো অনিয়মিত দায় নেই, তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যাদের কখনো স্টকলট সৃষ্টি হয়নি অথবা যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করে আমদানি মূল্য পরিশোধের প্রয়োজন হয়নি, শুধু সেসব গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের নামে ইডিএফ ঋণের আওতায় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা দেওয়া যাবে। কিন্তু নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানকে ইডিএফ ঋণ দেয় অগ্রণী ব্যাংক। যথারীতি তা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে একটি ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করা হয়। যার পরিমাণ ছিল ৩২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৯ সাল শেষে থার্মেক্স ব্লেন্ডেড ইয়ার্নের সিসি লোনের লিমিট ছিল ৮৮ কোটি টাকা। কিন্তু অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লিমিট থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৯ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি ব্যাংকটিতে প্রতিষ্ঠানটির পুনঃতফসিলকৃত ২২ কোটি ৩ লাখ টাকা ও নতুন করে সৃষ্টি করা ডিমান্ড লোনের ৩২ কোটি ২৩ লাখ টাকার দায় রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। যার পুরোটা এখনো অনাদায়ি রয়েছে।

শুধু তাই নয়, ব্যাংকঋণের বিপরীতে যে জামানত রাখা হয়েছে তাতেও কারসাজি করেছে থার্মেক্স গ্রুপ। নিয়ম অনুযায়ী অগ্রণী ব্যাংকের এসব ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ জামানত রাখার কথা ছিল তার থেকে ২০২ কোটি টাকার কম জামানত রেখেছে থার্মেক্স গ্রুপভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি।

সিএজির পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্রাহক প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়মিত নবায়নসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে স্বল্প জামানতের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ঋণের অর্থ পরিশোধে আগ্রহী নয়। এজন্য ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার জন্য দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি গ্রাহকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে টাকা আদায়ের সুপারিশ করেছে পর্যবেক্ষক দল।

পণ্য রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ইডিএফ থেকে ঋণ দেওয়া হয়। এ ঋণ ফেরত দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন সময় নিতে পারেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা, রূপালীসহ বেসরকারি খাতের একাধিক ব্যাংকের গ্রাহকরা ঋণ নিলেও তা ফেরত দিচ্ছেন না।

গত জানুয়ারিতে ঋণের সুদহার সাড়ে ৪ শতাংশ করা হয়, আর অনাদায়ি অর্থের ওপর অতিরিক্ত ৪ শতাংশ দ-সুদ আরোপ করা হয়। এখন পর্যন্ত ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্যরা ইডিএফ থেকে দুই কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। আগে একসময় এ ঋণের সীমা ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ডাইড ইয়ার্ন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিওয়াইইএ) সদস্যরা ঋণ নিতে পারেন সর্বোচ্চ এক কোটি ডলার। আগে তাদের ঋণের সীমা ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

ব্যবসায়ী আবদুল কাদির মোল্লা পোশাক ও বস্ত্র খাতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থার্মেক্স গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই বৃহৎ শিল্প গ্রুপে থার্মেক্স টেক্সটাইল মিলস, থার্মেক্স স্পিনিং, থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন, থার্মেক্স ইয়ার্ন ডাইং, থার্মেক্স ওভেন ডাইং, আদুরি অ্যাপারেলস, আদুরি নিট কম্পোজিটসহ আন্তর্জাতিক মানসম্মত ১৬টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান আছে। বর্তমানে তিনি বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের একজন পরিচালক। রূপালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার কল এবং এসএমএস করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র বলেন, কোনো ব্যাংক যদি আইন লঙ্ঘন করে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর ইডিএফের ঋণখেলাপি হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ নির্ধারিত সময় শেষে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই টাকা কেটে নেয়। এখন কোনো ব্যাংক যদি অন্যায়ভাবে ফোর্সড লোন তৈরি করে, সেই ঋণখেলাপি হয়ে যায় এবং নীতিবহির্ভূতভাবে পুনঃতফসিল করে তাহলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত