পারস্পরিক অধিকার রক্ষায় গুরুত্ব

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:৩৮ এএম

কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবি করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারেও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।’ -সুরা আন নিসা : ১

সুসম্পর্ক ও হৃদ্যতা, উত্তম আচরণ ও ভালোবাসা এবং সৌহার্দ্য, বিশ্বস্ততা ও ভ্রাতৃত্ব একটি ইবাদত ও সৎকাজ। এটি এমন কর্তব্য যা আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছেন এবং এর জন্য প্রতিদান ও সওয়াব ধার্য করেছেন, আর বিরুদ্ধাচরণে রেখেছেন পাপ ও শাস্তি।

পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায়, প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবের হক, এমনকি অপরিচিত মুসলিমের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস মীমাংসা করে দাও। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ -সুরা আল হুজুরাত : ১০

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।’ -সহিহ বোখারি

আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত নোমান বিন বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পারস্পরিক সম্প্রীতি, দয়া ও সহমর্মিতার দিক থেকে মুমিনদের দৃষ্টান্ত একটি মানবদেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন তার সমগ্র দেহ তাপ ও অনিদ্রা ডেকে আনে।’ -সহিহ মুসলিম

মানুষের ভালোবাসা, সহানুভূতি ও আন্তরিকতা পাওয়ার অধিক হকদার হলেন নিকটাত্মীয়রা এবং যারা একই রক্তসম্পর্কীয়। ইসলাম তাদের একতা, হৃদ্যতা ও সম্পর্ক জোরদানে আগ্রহী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। এটি উত্তম তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় এবং তারাই সফলকাম।’ -সুরা আর-রূম : ৩৮

সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে ইমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ -সহিহ বোখারি

নিশ্চয় অনৈক্য, বিভেদ ও ঘৃণা, পরস্পর বিচ্ছিন্নতা, বিচ্ছেদ ও বিরোধিতা, বিদ্বেষ ও হিংসা, শত্রুতা ও অবজ্ঞা এবং যেসব বিষয় হৃদয়কে বিক্ষুব্ধ করে ইত্যাদি এগুলো সবই সর্বনাশ ও ক্ষতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, স্বামী-স্ত্রী ও প্রিয়জনদের আলাদা করে এবং ভাই, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের ভালোবাসা বিনষ্ট করে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে হিংসা পোষণ করো না, পরস্পর ধোঁকাবাজী করো না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না। (একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশে) পশ্চাতে শত্রুতা করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, কারও দোষ অনুসন্ধান করো না এবং একের বেচাকেনার ওপর অন্যে বেচাকেনার চেষ্টা করবে না। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তোমরা আল্লাহর বান্দারূপে ভাই ভাই হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই; সে তার ওপর জুলুম করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং হেয় করবে না। তাকওয়া এখানে (এ কথা বলে নবী কারিম সা. তার বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন), একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয়জ্ঞান করে। প্রত্যেক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু হারাম।’ -সহিহ মুসলিম

যা দেখে ও শুনে অশ্রুতে ললাট ভিজে আর হৃদয় ভেঙে যায় তার একটি হলো একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিচ্ছেদ ও সম্পর্কহীনতা। শয়তান তাদের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের বিভক্ত করেছে এবং তাদের ঐক্যকে বিনষ্ট করেছে। অথচ ‘বিদ্রোহ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছেদ ছাড়া এমন কোনো গোনাহ নেই, যার শাস্তি আল্লাহতায়ালা আখেরাতে দেওয়া সত্ত্বেও দুনিয়াতেও ত্বরান্বিত করেন।’ -সুনানে আবু দাউদ

যোগাযোগ রক্ষা ও সৌহার্দ্য নবায়নে উদাসীনতা এমন একটি বিচ্ছেদণ্ড যা হৃদ্যতা ও স্নেহ নষ্ট করে এবং তরুণদের লালন-পালনকে প্রভাবিত করে। তাই আপনারা সম্পর্ক নবায়ন করুন এবং দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা, সাক্ষাৎ করা এবং বিচ্ছেদ পরিহারের উদ্যোগ নিন। ভালোবাসা ও সম্প্রীতির অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলুন। মানুষকে ক্ষমা ও মার্জনা করা, রাগ দমন করা ও অন্যের দুর্ব্যবহার সহ্য করা আল্লাহর কাছে একটি বড় সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত। আর এটার অধিক হকদার হলেন স্বজনেরা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তীব্রগতিতে চলো নিজেদের রবের ক্ষমার দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আর আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।’ -সুরা আলে ইমরান : ১৩৩-১৩৪

কোরআন মাজিদে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে।’ -সুরা আশ শুরা : ৪০

সুতরাং আপনারা ক্ষমা ও মার্জনার ওপর নিজেদের গড়ে তুলুন এবং সওয়াবের আশা করুন। পরস্পরকে উপদেশ দিন ধৈর্য ধারণের, উপদেশ দিন দয়া-অনুগ্রহের।

আপস-মীমাংসা উত্তম এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আল্লাহতায়ালা এর মাধ্যমে কত জীবন, অর্থ ও সম্মান রক্ষা করেছেন, কত ফেতনা থেকে তিনি রেহাই দিয়েছেন, কত বিবাদ মীমাংসা করেছেন এবং কত বিচ্ছেদ ও ঝগড়ার নিষ্পত্তি করেছেন। আল্লাহতায়ালা মানুষকে নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করতে আদেশ করেছেন, ফেতনা; ঝগড়া-বিবাদ ও দ্বন্দ্বের আগুন নিবারণের মাধ্যমে এবং বিভেদ নিরসন, হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা দূরকরণের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই, কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস মীমাংসা করে দাও। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ সুরা আল হুজুরাত : ১০

পরস্পরে আপস-মীমাংসা করা বিশাল সওয়াব ও নৈকট্যের কাজ এবং শ্রেষ্ঠ আমল ও সদকা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি গ্রন্থির জন্য তার ওপর সদকা রয়েছে। সূর্যোদয় হয় এমন প্রতিদিন (অর্থাৎ প্রত্যেহ) দুজন মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও সদকা। কাউকে সাহায্য করে সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়াও সদকা। ভালো কথাও সদকা। নামাজ আদায়ের উদ্দেশে পথচলায় প্রতিটি কদমেও সদকা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সদকা।’ -সহিহ বোখারি

হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম সদকা হলো- পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করিয়ে দেওয়া।’ -মুজাম তাবারানি

পরস্পরের মধ্যে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে উম্মতের ঐক্য ও সংহতি পূর্ণতা পায়, হৃদয় পবিত্র হয় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা হৃদয়ের মিলন ঘটান। আরও বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা উম্মতের বিচ্ছেদ, দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং তার ওপর যে দুর্যোগ আসে তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। এর মাধ্যমে উম্মত একটি শক্ত কাঠামো এবং একটি দেহের মতো হয়; যদি একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় তবে শরীরের বাকি অংশগুলো অনিদ্রা ও জ¦রে আক্রান্ত হয়। হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও ফজিলতপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ।’ -মুসনাদে আহমাদ

৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত