মুক্তি মিলেছে। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ ক্লাবগুলোর। বলা হচ্ছে ক্যাসিনোর থাবায় বন্ধ করে দেওয়া মতিঝিল পাড়ার ছয়টি ক্লাবের কথা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের উদ্যোগে এবং সাবেক ফুটবলার আবদুল গাফফারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রশাসনের সহায়তায় প্রায় সাড়ে তিন বছর পর খুলতে শুরু করেছে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের একাংশ, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, আরামবাগ ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের দুয়ার। এলাকার মানুষের স্বপ্ন আবারও নানা খেলার খেলোয়াড়ে মুখরিত হবে ক্লাব পাড়া। ক্লাব খুলে দেওয়ার দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে ফের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন ক্লাবের কর্তারা। তবে এখন তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যে যে কলঙ্কের কালি পড়েছিল, সেখান থেকে ভাবমূর্তি ফেরাতে হবে। একটা শক্ত আর্থিক অবকাঠামো নিশ্চিত করে ফের পুরোদমে ফিরতে হবে মাঠে-ময়দানে।
মতিঝিল পাড়ার ক্লাবগুলো একটা সময় ছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম চালিকাশক্তি। কালে কালে সেই ধারায় এসেছে পরিবর্তন। নানা কারণেই ক্লাবগুলোর গুরুত্ব কমেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনে। ক্লাবগুলোতে খেলাধুলার চর্চা কমতে থাকায় একটা সময় তাতে চোখ পড়ে ক্যাসিনো চক্রের। প্রভাবশালী সেই চক্র স্পোর্টিং ক্লাবগুলোকে বদলে ফেলে ঝলমলে ক্যাসিনোয়। রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে উড়েছে অবৈধ টাকা আর অবাধে হয়েছে মাদক ব্যবসা। ভয়ে সে সব কান্ড--কারখানা দূর থেকে দেখতে হয়েছে সত্যিকারের ক্লাব সংগঠকদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে ক্যাসিনোগুলোকে সিলগালা করে দেয়। তাতে ক্লাবগুলোর খেলাধুলার চর্চায় লাগে বড়সড় ধাক্কা। দিনের পর দিন প্রবেশাধিকার না থাকায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। তারপরও অস্তিত্ব রক্ষায় তারা কোনোমতে চালিয়ে গেছে খেলা।
যদিও নিজস্ব স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় নানা রকম সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের। তাই তাদের দাবি ছিল দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্লাব খুলে দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিজে উদ্যোগ নিয়ে ক্লাবগুলো খুলে দিতে আইনি জটিলতা নিরসনে দায়িত্ব দেন আবদুল গাফফারকে। প্রায় সাড়ে তিন মাস সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে সফল হন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সংগঠক, ‘এই ক্লাবগুলো একেকটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। ক্যাসিনোর কালো থাবায় এতদিন ক্লাবগুলো বন্ধ ছিল। বিষয়টি নিরসনে ক্রীড়ামন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দিলে আমি ক্লাবগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে নানা পর্যায়ে যোগাযোগ করে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি। আশা করছি, ক্লাবগুলোতে ভবিষ্যতে আর কোনো অনৈতিক ঘটনা ঘটবে না। তারা অতীতের মতো আবারও নির্বিঘ্নভাবে খেলাধুলা চর্চা শুরু করতে পারবে।’
স্থানীয় মতিঝিল থানার পক্ষ থেকে একটি দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে মুক্তি পাওয়া ক্লাবগুলোকে। সেগুলো মেনে বুধবার থেকেই ক্লাব ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখন ক্লাব কর্তাদের সামনে ভাবমূর্তি ফেরানোর বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ নিতে তারা প্রস্তুতও। তবে এই সময়টায় ক্লাবগুলোতে ঘটেছে অবিশ্বাস্য চুরির ঘটনা। জনমানবশূন্য হয়ে পড়া ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডারার্স, দিলকুশাসহ বিভিন্ন ক্লাবে চুরির বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। আসবাবপত্র, টিনের চাল, দরজা-জানালা খুলে নেওয়ার পাশাপাশি শতবর্ষী ক্লাবগুলোর ঐতিহ্যের প্রতীক ট্রফি, শিল্ডগুলোও চুরি হয়ে গেছে! যেটাকে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন ক্লাব কর্তারা।
১২০ বছরের পুরনো ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম তুহিনের কণ্ঠে আক্ষেপ, ‘ভাবমূর্তি যতটুকু নষ্ট হয়েছে, তা হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব। ক্লাব ঘর থেকে খোয়া যাওয়া আসবাবপত্রও হয়তো টাকার বিনিময়ে কিনতে পারব। তবে ১২০ বছরের যত অর্জনÑ সেই ট্রফি, শিল্ডগুলো তো আর ফিরে পাব না। আমাদের কাছে সেগুলো অমূল্য সম্পদ।’ গতকাল ভিক্টোরিয়া ক্লাবে গিয়ে মনে হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই যেন সুনামি বয়ে গেছে সেখানে। মেঝেতে পানি জমে মশার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। টিনের চালাও বিভিন্ন জায়গায় খুলে নেওয়া হয়েছে। নানা জায়গায় জমে আছে নর্দমার ময়লার স্তূপ। এই অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ক্লাবের সব সদস্যকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তুহিন, ‘ক্লাবটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ক্লাবকে বসার উপযোগী করতে কমপক্ষে ১৫-২০ লাখ টাকা লাগবে। আমরা এর মধ্যেই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন কিছু একটা করবেন। ক্লাবের সদস্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আশা করছি সবাইকে নিয়ে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব।’
ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাবের দরজা খুলবেন ১৮ সেপ্টেম্বর। তার আগেই অবশ্য অভ্যন্তরে বড় ধরনের চুরির অস্তিত্ব টের পেয়েছেন ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন, ‘ক্যাসিনো অভিযানের আগে আমরা এক সঙ্গে ৪০-৫০ জন খেলোয়াড়কে ক্লাবে রেখে খেলায় অংশ নিতে পারতাম। খেলোয়াড়দের ডরমেটরিগুলো ছিল সুসজ্জিত ও আধুনিক। প্রতিটির সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম ছিল। তবে এখন সেসব স্থাপনা দেখলে মনে হবে বড়সড় ভূমিকম্পে সব কিছু বিধ্বস্ত হয়েছে। আসবাবপত্র কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আমাদের অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।’
তুলনায় আরামবাগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম। ক্লাবটি অবশ্য ভুগছে নেতৃত্ব শূন্যতায়। এই সমস্যাটা কাটিয়ে ওঠাই আরামবাগের বড় চ্যালেঞ্জ জানালেন সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, ‘আমরা সেভাবেই এখন থেকে ক্লাব পরিচালনা করব। কোনো অসামাজিক কর্মকান্ড করার ইচ্ছেও আমাদের নেই। এখন ক্লাবের বেশ কিছু সংস্কার প্রয়োজন। আমরা চেষ্টা করছি ভালো একজন সভাপতির হাতে ক্লাবের দায়িত্ব তুলে দিতে।’
কমবেশি একই অবস্থা দিলকুশা ও ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুল ক্লাবের। তবে তাদের চেয়ে খানিকটা ভালো অবস্থায় আছে মোহামেডান। কারণ ক্লাবটির একাংশ অডিটোরিয়াম দখল করে চলেছে রমরমা ব্যবসা। মূল অংশ ছিল দখলমুক্ত। সরকারের পক্ষ থেকে বাধা উঠে যাওয়ায় এখন সেই অডিটরিয়াম ভবনটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে মোহামেডান।
