পৃথিবীর সব শিল্পই বিভ্রম

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:৫২ এএম

আমাদের জাদুশিল্পের পুরোধা জুয়েল আইচ। বিশ্ববরেণ্য ইল্যুশনিস্ট। একুশে পদকের পাশাপাশি পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। শুধু বিশ্বমানের একজন জাদুশিল্পীই নন- একাধারে গুণী বংশীবাদক, আদর্শ শিক্ষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত। দেশপ্রেমে আজও উদ্বেলিত। যে কারণে উন্নত বিশ্বের হাজারো হাতছানি তাকে দেশমাতৃকা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। সেই তিনি এসেছিলেন দৈনিক দেশ রূপান্তরের অতিথি হয়ে। আড্ডা জমে উঠেছিল সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল, বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ এবং ডিজিটাল প্রোডিউসার লিটু হাসানের সঙ্গে

এবারের আড্ডাটি নানা কারণেই কিছুটা ভিন্ন ছিল। তার আসার কথা ছিল দুপুর ২টায়, কিন্তু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ায় আগের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। তাপস রায়হানের তাড়ায় তিনি এসে হাজির সাড়ে ১২টায়। তাকে সামনে রেখেই আড্ডার সব প্রস্তুতি। শুরুটাও নতুনত্বে ভরা। জুয়েল আইচ বরাবরই ছক ভেঙে নতুন কিছু করতে চেয়েছেন। গৎবাঁধা বায়োগ্রাফি ধাঁচের প্রশ্নে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। তাই তো তাপস রায়হান শুরু করলেন পুরনো একটি ঘটনা দিয়ে।

গুণীজনের উপস্থিতিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ১৯৯৪ সালে এক অনুষ্ঠানে আপনি বলেছিলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। সে কথা কি মনে আছে? জানতে চাইলে জুয়েল আইচ কথা শুরু করলেন। বললেন, তোমরা যেভাবে ঘটনাটি মনে করিয়ে দিলে, তাতে স্মৃতিটুকু না মনে থেকে পারে! আমি তো এখনো সেই কথা বিশ্বাস করি। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু কথা যুক্ত করেছি। তা হলো, মানুষ তার হাসির সমান সুন্দর আর কাজের সমান সফল!

বিষয়গুলোর ঈষৎ ব্যাখ্যার পরই তিনি আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন। মানুষের রেটিং কেমন ও কীভাবে হতে পারে সেই বিষয়ে আলো ফেললেন। জুয়েল আইচের ভাষ্য, এখন তো নাটক-সিনেমা সব বিষয়েই রেটিং দেওয়া হয়। ফাইভ স্টারের মধ্যেই রেটিংটা হয়। শুধু কী তাই, কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাও, দেখবে সেখানে রেটিং চাইবে, উবারে চড়, শেষে তারাও রেটিং চাইবে। অর্থাৎ রেটিং আজকের সমাজে খুব ট্রেন্ডি। ফলে আমার মনে হয়, মানুষেরও রেটিং হওয়া উচিত। আমরা কেমন মানুষ, সেটি কিন্তু মনে মনে রেটিং করি। তবে তা সবার সামনে শেয়ার করি না। নিকট ভবিষ্যতে হয়তো মানুষকেও এই রেটিংয়ের দ্বারাই জাজমেন্ট করা হবে। আমার মতে, মানুষকে যে পাঁচটি স্টারের মাধ্যমে রেটিং করা হয়, তা হলো ১. সময় (মানুষের অবশ্যই জানতে হবে সময়কে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। সময়ের অপচয় মানে জীবনের অপচয়। পশ্চিমারা বলেছেন, টাইম ইজ মানি। আর আমি বলি, টাইম ইজ লাইফ), ২. ব্রেন (তোমার ব্রেনে সবসময় ইতিবাচক চিন্তা, মনোভাব ও ধারণা পোষণ করো। কারণ ব্রেন নিজে কিছুই করতে পারে না। তোমাকেই চালনা করতে হবে), ৩. বডি (শরীরের যত্ন নিতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, যাতে দেহটা বহু বছর কর্মক্ষম থাকে), ৪. পারসোনালিটি (্হেসে কথা বলবে নাকি বিরক্ত হয়ে কথা বলবে, সেটি কিন্তু সম্পূর্ণ তোমার বিষয়। চাইলেই নিজের পারসোনালিটিকে দ্যুতিময় করতে পার। নয়তো তোমাকে কেউ সহজে গ্রহণ করবে না। যেখানে যাবে সেখানেই বন্ধু বানাও।) ও ৫. এক খন্ড নিজস্ব জমি (নিজের একটা স্বাধীন দেশ হবে তার জন্যই কিন্তু আমরা এত ত্যাগের বিনিময়ে, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলাম। সুতরাং নিজের এক খন্ড জমির গুরুত্ব তোমার জীবনে বিশাল। নিজের স্থায়ী ঠাঁই না থাকলে যে কোনো সময় রাস্তায় নেমে যেত পার)।

মাসিদ রণ : বন্ধু বানানোর কথা বলছিলেন। আপনার বন্ধুত্বের দু-একটা গল্প যদি শোনান...?

জুয়েল আইচ : বন্ধুত্বের গল্প তো শেষ হবে না। এই যে আড্ডার আগে ছবি তুলতে গেলাম ছাদে, সেখানেই কতগুলো বন্ধু জুটে গেল। তারা তো শুধু নয়, তাদের বাবার গল্পও বলে গেল। আমাকে দুপুরের খাবারের দাওয়াতও দিয়ে দিল। আমি বন্ধু বানাতে পছন্দ করি বলেই সেই দাওয়াত কবুল করলাম। আমার পারসোনালিটি যদি অন্যরকম হতো তবে কিন্তু আমি প্রথম সাক্ষাতে দেওয়া দাওয়াত গ্রহণ করতাম না, তাই না? আসলে এভাবেই সারা পৃথিবীতে বন্ধু পেয়েছি। পৃথিবীতে আমার বন্ধু ভরা। বন্ধুর ভালোবাসায় আমি টগবগ করি। যদি আজকে যে কোনো দেশের যে কোনো এক বন্ধুকে বলি, তোমার ওখানে যেতে চাই, ওরা যত দ্রুত সম্ভব প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দেবে। তবে আমি বন্ধুত্বের সম্পর্ককে এভাবে ক্যাশ করি না। বন্ধুত্বের গাঢ়ত্ব বোঝাতে বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করলাম। তবে একটা ঘটনা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। সিঙ্গাপুরে পি সেক লিয়ং নামে আমার এক বন্ধু ছিল। একবার আমাকে এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে এসে আমার হাত ধরে বলল, ‘বন্ধু, আমার বিশেষ অনুরোধ, অনেক স্বাদ করে একটি বাড়ি বানিয়েছি, বড় সুইমিংপুলের মধ্যে জাহাজের আদলে। তুমি যখনই এই রুট দিয়ে কোথাও আস, দয়া করে সিঙ্গাপুরে সাত দিনের ট্রানজিট করবে। আমার বাড়িতে একটা সপ্তাহ থেকে তারপর তোমার কাজে যাবে।’ যতদিন বেঁচেছিল আক্ষরিক অর্থেই সে তার কথা রেখেছিল। সিঙ্গাপুরে গেলে আমার পুরো দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে নিয়ে নিত অতি আনন্দের সঙ্গে। এটা কি কোনো আপন ভাইয়ের থেকে কম? আমিও তাকে প্রমিজ করেছিলাম তার বাড়িতে যাব, সে কথা আমিও রেখেছি। তার ছেলে এখনো আমার বন্ধু।     

তাপস রায়হান : এই যে এখনো আপনার প্রবল কর্মস্পৃহা, পেছনে এই বিষয়গুলোই কি কাজ করেছে?

জুয়েল আইচ : আমি যে এখনো অ্যাকটিভ, সেটা এসব কারণেই হয়েছে। সময় অপচয় একদমই করতে পছন্দ করি না।  সময় যদি প্রোডাকটিভ কাজে ব্যয় না করতে পারি, তাহলে আমার অস্থির লাগে। প্রতিটা মুহূর্ত কাজে লাগিয়েছি বলেই বড় গলায় বলতে পারি, জীবনে যা কিছু আমার ভালো লেগেছে তার সবটাই করতে পেরেছি! আমার জাদুচর্চা করতে ভালো লাগত বলেই তা করেছি। ছবি আঁকতে ভালো লাগত, সেটি করেছি। বাঁশি বাজাতে ভালো লাগত, গ্রামে থেকে ক্ল্যাসিক্যাল বাঁশি বাজানো ছিল দুঃসাধ্য। তারপরও সেটি ঠিকঠাক শিখে বাজিয়েছি। ভাস্কর্য নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কাজ, আমি এখন সেটি নিয়েও কাজ করছি। মাত্র ৫-৭ মিনিটে আমি মানুষের স্কেচ করতে পারি। প্রথম অডিশনেই পাস করি এবং এমনভাবে পাস করলাম যে, রেডিও থেকে বলল, অতদূর থেকে এসেছেন, সময়টাকে কাজে লাগান। চার-পাঁচটা রাগ রেকর্ড করে দিতে পারবেন? আমি বললাম, হোয়াই নট? তারা বলল, এই ভরদুপুরে ভোরের রাগ, কিংবা সান্ধ্য রাগ বাজাতে অসুবিধা হবে না? আমি বললাম, এখানে তো এসি রুম। বাইরের দুনিয়ার আঁচ এখানে আসে না। আমি চোখ বন্ধ করলেই যে সময়ে যেতে চাই সেখানেই যেতে পারব। তারপর তো পাঁচ-পাঁচটা রাগ অডিশন দিতে এসে রেকর্ড করে বাড়ি ফিরলাম! এরপর ডাক পেলাম কলকাতার আকাশবাণী থেকে। বাঁশি নিয়ে আমি দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাক্ষাৎকার দিয়েছি, বিবিসিতে বাজিয়েছি, ভয়েস অব আমেরিকাতে বাজিয়েছি, জার্মানির ডয়েচে ভেলেতে বাজিয়েছি, চীনের রেডিওতে বাজিয়েছি। অর্থাৎ তোমার যা ভালোলাগে সেটিই তুমি করে দেখ। সেটি মন দিয়ে ভালোভাবে করো। তবেই তোমার সময়টা কাজে লাগবে, জীবন পূর্ণতা পাবে।

মাসিদ রণ : এত কাজে পারদর্শী হওয়ার পরও জাদুশিল্পী বা ইল্যুশনিষ্ট পরিচয়কেই সবচেয়ে বড় করলেন। সেটির কারণ কী?  

জুয়েল আইচ : একাত্তর-পরবর্তী যা যা করেছি, তার সবকিছুর অনুপ্রেরণা আমাকে দিয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। আজকে আমরা যে যাই করছি, তার সবটাই মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল। আমরা স্বাধীনভাবে গণম্যাধ্যমে কথা বলছি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দুই ঘণ্টার রাস্তা আধা ঘণ্টায় চলে এলাম, এর সবটাই তো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা দেশটাকে স্বাধীন করেছি বলেই হয়েছে। পরাধীন থাকলে এতদিন তারা, আমাদের পিষে মেরেই ফেলত। ভিক্ষে করেও বাঁচার উপায় ছিল না। আমার জাদুশিল্পী হয়ে ওঠার প্রেরণা মুক্তিযুদ্ধই।

দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের হকি টুর্নামেন্ট হলো। বাংলাদেশ খুব বাজেভাবে পরাজিত হলো। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শরীরের রক্ত তখন ফেটে বেরুচ্ছে। কী দিয়ে তাদের মোক্ষম জবাব দেব, সেটিই ভাবছিলাম। তখন আমি শিক্ষকতা করি। ভেবে দেখলাম, আমি যদি শিক্ষকতা ছেড়েও দিই কোনো অসুবিধা হবে না। আরও অনেক গ্রেট শিক্ষক আসবেন এ দেশে। আমি যদি বাঁশি বাজানো ছেড়েও দিই, তাও কিছু আসবে যাবে না। অনেক মেধাবী বাঁশিবাদক আসবেন। কিন্তু জাদুশিল্পে দেশে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ মাইথোলজিতে রয়েছে, বাংলাদেশ জাদুবিদ্যার প্রাচীন ভূমি। তাই আমি সেই শিকড়ের সন্ধানেই ফিরে যেতে চাইলাম। এভাবেই জাদুশিল্পকে নিজের মধ্যে ধারণ করা শুরু করি। অনেকে জেনে অবাক হবেন, জীবনে যা যা করেছি সবটাই কোনো কোনো গুরুর কাছ থেকে শিখেই করেছি। একমাত্র জাদুই রয়েছে, যা আমি কখনোই গুরু ধরে শিখিনি। আজ পর্যন্ত জাদু নিয়ে যা যা এক্সপেরিমেন্ট করেছি, সবটাই নিজের মেধাপ্রসূত। অসম্ভব চর্চা, পরিশ্রম, সততা আর নিষ্ঠা নিয়ে আমি কাজ করেছি দিনের পর দিন। পরিশ্রম কখনোই মানুষকে নিরাশ করে না। আমার সাধনা এতটাই তীব্র ছিল যে, ফলস্বরূপ সারা বিশে^র মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। বিশ^ময় আমি সমাদৃত হয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের মনের মধ্যে আমি ভালোবাসা নিয়ে ঢুকতে পেরেছি। 

মাসিদ রণ : ক্যারিয়ারে স্ট্রাগল করতে হয়েছে কতটুকু?

জুয়েল আইচ : ক্যারিয়ারে সফল হবেই, যদি তোমার কাজের মান উন্নত হয়। সেদিক থেকে বললাম না, জাদুশিল্পে এ দেশে আমার মতো অত এক্সপেরিমেন্ট কেউ করেইনি। তাই অল্প বয়সেই আমি যথেষ্ট পপুলার। কিন্তু যেদিন থেকে আমার মাথায় আসল আমার নিজের এক খন্ড জমি দরকার। সেদিক থেকে বলতে গেলে নিজের ওপর টর্চার করেছি। খেয়ে না খেয়ে শুধু সঞ্চয় করেছি। তখনো তো বিয়ে করিনি। তাই পিছুটান তেমন ছিল না। রাস্তায় বের হলে মানুষ আমাকে চিনে ফেলত। রোদ হোক আর অন্ধকার, সেই আমি ধোলাইপাড় থেকে হেঁটে ধানমন্ডি, শাহবাগ এসব এলাকায় আসতাম শুধু বাসের অতটুকু পয়সা বাঁচাতে। চিনাবাদাম আমার খুব প্রিয়, কীসের চিনাবাদাম! মুখে লজেঞ্জ পুরে তার সঙ্গে চিনাবাদাম খেতে আরও ভালো লাগত, কীসের লজেঞ্জ! সব বাদ দিয়ে শুধু সঞ্চয় করেছি। তবে নিজের মধ্যে মানবিক বোধ কিংবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের মানুষের কথা কখনো ভুলিনি। তখন আমার নব্বই শতাংশ শোই ছিল চ্যারিটি, বিনা পয়সায় করতাম মানুষকে সাহায্য করতে। বাকি যে দশ শতাংশ কমার্শিয়াল শো হতো, সেটা থেকেই জীবনধারণ আর সঞ্চয় দুটোই করতাম এবং সে যাত্রায় আমি সফল হই।

তাপস রায়হান : দুই যুগের বেশি সময় ধরে আপনি ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর। আপনাকে এমন সম্মান দেওয়ার কারণ কী ?        

জুয়েল আইচ : আমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। তবে এটুকু খেয়াল করেছি যে, তাদের নজর আমার প্রতি অনেক আগে থেকেই ছিল। কারণ, ইউনিসেফের বড় কেউ দেশে এলেই সেখানে আমাকে আলাদাভাবে তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। তার মধ্যে একটা ঘটনা বলতেই হয়। আমার স্বপ্নের দেবী হচ্ছেন, অড্রে হেপবার্ন। তার জীবনী শুনলে তো তোমরা অবাক হয়ে যাবে। বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ নায়িকা যেমন সুচিত্রা সেন, তেমনি বিশ্ব সিনেমার সেরা নায়িকা হলেন অড্রে হেপবার্ন। সৌন্দর্যের প্রতীক ধরা হয়, অড্রে হেপবার্নকে। তিনি ছিলেন ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর। একবার তাকে আমাদের দেশে আমন্ত্রণ করে আনা হলো। সেখানেও আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সি লাইকড মি সো মাচ! তিনি তো আমার মায়ের বয়সী, এখানে অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করেছে। আমি শিশুদের খুব পছন্দ করি, তিনি সেটা নোটিস করেছেন বলেই আমার সঙ্গে তার এক ধরনের সখ্য গড়ে ওঠে। খাবারের সময়ও তিনি আমাকে নিজের পাশে বসিয়েছিলেন। এ ছাড়া সারাক্ষণ তিনি আমার হাত ধরে রেখেছিলেন! আমার অনুভূতি কেমন ছিল আন্দাজ করতে পারছ তোমরা? যিনি আমার স্বপ্নের দেবী, তার সাক্ষাৎ পাওয়া, শুধু সাক্ষাৎই নয়, মাতৃসুলভ আদর পাওয়া কতখানি ভাগ্যের ব্যাপার! শুধু এই একবারই নয়, এমন ঘটনা আমার সঙ্গে বহুবার ঘটেছে।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : ওয়ার্ল্ড সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ওরসন ওয়েলসের সঙ্গেও তো আপনার দারুণ একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেটি যদি শোনান...?

জুয়েল আইচ : অবশ্যই। এটিও আমার জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা! ওরসন ওয়েলস হলেন সেই নির্মাতা, যিনি সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছেন। সে সময় তার ‘সিটিজেন কেইন’ ছবিটি দেখেনি এমন সিনেমাপ্রেমী দর্শক পাওয়াই যাবে না। যাই হোক, ১৯৮১ সালের কথা, বোস্টনের পার্ক প্লাজা হোটেলে শো করার পরে ব্যাকস্টেজে এসে ঘাম মুছছিলাম। তখন এক তরুণ এসে বলল, ‘জুয়েল, ওরসন ইজ ওয়েটিং ফর ইউ’। একে তো শো করে আমি ক্লান্ত, তার ওপর পিচ্চি এক ছেলে আমার নাম ধরে ডাকার ফলে মেজাজ খারাপ হলো (আসলে পশ্চিমা দেশে সবাই সবার নাম ধরেই ডাকে)। তারপরও একজন আমার জন্য অপেক্ষা করছে, যেতে তো হবেই। গিয়ে দেখি, একজন লোককে আরও অনেক লোক ঘিরে ধরে আছে। আমি যেতেই ভিড় সরিয়ে দেওয়া হলো। আমাকে লোকটার পাশে বসাল। আমি তখনো তাকে চিনিনি। কিন্তু তিনি যখন আমাকে ধরে বললেন, ‘বয়, ইউ ডিড এ গ্রেট জব। ইউ ট্রাইড টু সে এ স্টোরি থ্রু ইরর ম্যাজিক, অ্যান্ড ইউ সাকসেসফুলি ডিড ইট, অ্যামাজিং।’ ভয়েসটা শুনে তো আমি অজ্ঞান প্রায়। ও মাই গড, দিজ ইজ ওরসন ওয়েলস! যার সিটিজেন কেইন দেখে তো আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম!  

তাপস রায়হান : আপনার একটা উক্তি পড়েছিলাম, যেখানে বলেছিলেন, অলীক বা অযৌক্তিক বলে কিছু নেই, পৃথিবীর সব কিছুই বিজ্ঞানসম্মত।

জুয়েল আইচ : না, না, তা নয়। আমি তো মনে করি, অলীক বিশ্বাসে ভরা পৃথিবী। মানুষের বিশ্বাসের পেছনে তেমন কোনো যুক্তিও নেই। এই যে তুমি যুক্তিবাদী মানুষ, কিন্তু রাতের অন্ধকারে একটা লাশের সঙ্গে একা থাকতে দিলে দেখবে তোমার মনের অবস্থা কী হয়! একটা ভৌতিক পরিবেশ তোমাকে আচ্ছন্ন করবেই। তোমার প্রশ্নের যেটা অর্থ হয়েছে আমি সেটার জবাব দিলাম। আমি আসলে আমার ম্যাজিকের বইয়ে বলেছিলাম, সারা পৃথিবীতে যত রকমের আর্ট আছে, সমস্ত আর্টই আসলে লজিক্যাল এবং সমস্ত আর্টই ইল্যুশন তৈরি করে। আমি বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে কাঁদাই। কিছু ছবি বোঝা যায় না, কিন্তু মুগ্ধ হয়ে যাই আমরা। এই যে সিনেমা দেখি, আমরা হাসি-কাঁদি, অথচ জানি যে এগুলো কিছু ছায়া ছাড়া কিছুই না। এগুলোই তো ইল্যুশন।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আমরা জানি যে, জাদুতে যা দেখা যাচ্ছে তা মিথ্যা। তা না হলে তো মানুষ বাজারে গিয়ে কিছু কিনত না, রুমাল দিয়ে জাদুর সাহায্যে সব পেয়ে যেত। তাহলে আপনি দর্শককে কী দিচ্ছেন?

জুয়েল আইচ : আমি দর্শককে ইল্যুশন বা বিভ্রম উপহার দিচ্ছি। আনন্দ দিয়ে আনন্দ পাচ্ছি।       

লিটু হাসান :  মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতি শুনতে চাই?

জুয়েল আইচ : মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি জগন্নাথ কলেজে বিএ পরীক্ষার্থী। ২৫ মার্চে ঢাকাতেই ছিলাম। নিজ চোখে দেখেছি পাক সেনাদের বর্বরতা, গণহত্যার চিত্র। ২৬ মার্চ কারফিউ একটু শিথিল হলেই, গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দিই। কয়েকদিন ধরে হেঁটে, নৌকায় পার হয়ে, ঠেলাগাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছাই। কিছুদিন পর শুনি বরিশালে পাক বাহিনী পৌঁছে গেছে। তখন বুঝতে আর বাকি থাকল না যে, তারা পুরো দেশটাতেই অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞ চালাবে। যেহেতু আমি অনেক আগে থেকেই রাজনীতিসচেতন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত, তাই যুদ্ধে যাওয়াটা আমার জন্য অবধারিতই ছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো রাস্তা পাচ্ছিলাম না। একদিন শুনলাম, বরিশালের পেয়ারা বাগানে এক দল মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটি গেড়েছেন। আমি বাড়ির কাউকে কিছু না বলে রওনা দিলাম, সঙ্গী হলো ছোটবেলার বন্ধু নিটুল। কিন্তু গেলেই তো তারা সবাইকে দলে যুক্ত করবে না। তিন দিন কাঁচা পেয়ারা খেয়ে, পোকামাকড়ের কামড় সহ্য করার পর যখন তারা দেখল যে আমরা জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত তখনই দলে যুক্ত করল। আমরাই ছিলাম প্রথম প্রতিরোধী। যে মানুষ আমি কোনোদিন একটি পোকামাকড় মারিনি, সেই আমি পাকিস্তানের জানোয়ার-পিশাচদের মেরেছি। একদিন এক খাল থেকে এগারোজনের লাশ তুললাম, তার মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, মামাতো ভাইও ছিল। সেটা দেখে কে ঠিক থাকতে পারে! পেয়ারা বাগানে যখন টিকতে পারলাম না তখন হেঁটে ভারতে পৌঁছাই ট্রেনিং নিতে। পরে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিই।   

গ্রন্থনা : মাসিদ রণ

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত