মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে মৃত্যুর অসত্য তথ্য দেওয়ায় মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্র ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে দুজনকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এএম জুলফিকার হায়াত এ রায় দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, আসামিরা মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অসত্য ও বিকৃত তথ্য দিয়েছেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের এ মামলায় সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন সাত বছর কারাদণ্ড। কিন্তু আসামিদের সামাজিক অবস্থান, বিচারকাজের সময় আদালতকে সহযোগিতা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আগের কোনো ফৌজদারি মামলার তথ্য না থাকায় সাজা কম দেওয়া হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (পরে আইনটি পরিবর্তিত) ৫৭ ধারায় দুজনকে এ দণ্ড দেওয়া হয়। ১০ বছর আগের এ মামলায় গত ২৪ আগস্ট যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হলে আদালত ৭ সেপ্টেম্বর রায়ের জন্য দিন ধার্য করে। তবে, ওইদিন (৭ সেপ্টেম্বর) রায়ের তারিখ পিছিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ধার্য করে আদালত। শুনানিকালে ২২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
জামিনে থাকা আদিলুর ও এলানকে রায় ঘোষণা শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। রায়ের পর আদালতের ডকে থাকা আদিলুর ও এলানকে স্বাভাবিক এবং হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়।
রায়ের সময় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের মানবাধিকার-বিষয়ক কর্মকর্তা সোফিয়া মেউলেনব্রেগ, জাতিসংঘের ঢাকা কার্যালয়ের মানবাধিকার-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হুমা খানসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫৭ ধারা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী, গণমাধ্যমসহ সবার আপত্তি ছিল। পরে ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু এই ধারাতেই বিচার করা হলো।’ তিনি বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে মানবাধিকারকর্মীদের কর্মীদের এক ধরনের শঙ্কা ও ভীতির মধ্যে কাজ করতে হবে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী রুহুল আমিন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, তারা ন্যায়বিচার পাননি। সাজা থেকে খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। সাইবার ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নজরুল ইসলাম শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে সাজা অপর্যাপ্ত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে তা পর্যালোচনা করে আপিলের সিদ্ধান্ত হবে।’
উল্লেখ্য, বিভিন্ন অভিযোগে ২০২২ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে অধিকারের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত দেয় এনজিওবিষয়ক ব্যুরো।
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে শাপলা চত্বর এলাকায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬১ জনের মৃত্যুর তথ্য ওই বছরের ১০ জুন অধিকার তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। অসত্য ও বিকৃত তথ্য প্রকাশের অভিযোগে আদিল ও এলানের বিরুদ্ধে দুটি জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করা হয়। মামলার পর ওই বছরের ১০ আগস্ট আদিলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও অধিকারের কার্যালয়ে তল্লাশি করে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ করে পুলিশ। তদন্ত শেষে ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি)। এতে বলা হয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসত্য ও বিকৃত তথ্য প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বিঘেœর অপচেষ্টাসহ অধিকার রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র আমলে নেয় আদালত। অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে আবেদন করা হলে ২০১৭ সালের ৯ জানুয়ারি তা খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের এ সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগেও বহাল থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র, অ্যামনেস্টির উদ্বেগ : আদিলুর ও এলানের দুই বছরের সাজার রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গতকাল ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র মানুষের অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রচার ও সুরক্ষায় মানবাধিকারকর্মী এবং সুশীল সমাজ সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এই অবস্থায় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান এবং পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং মনে করছে, এটি মানবাধিকারকর্মী এবং সুশীল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালনের সদিচ্ছাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক সমাজকে অব্যাহতভাবে সমর্থন করি এবং মৌলিক অধিকার নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করি।
গতকাল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অফিসের সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, অধিকার ২০১৩ সালে সংঘটিত এক বিক্ষোভের ঘটনায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর জেরে অধিকারের বিরুদ্ধে বিতর্কিত আইসিটি আইনে মামলা হয়। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সত্য ঘটনা তুলে ধরায় রাষ্ট্র ‘অধিকার’ ও এর নেতাদের ধারাবাহিকভাবে ধরপাকড় করছে। আদিলুর ও এলানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে অ্যামনেস্টি আরও বলে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথিভুক্ত করা কোনো অপরাধ নয়। আমরা বাংলাদেশি কর্র্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে আদিলুর রহমান খান ও নাসিরউদ্দিন এলানকে মুক্তি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
