জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রী হলের রোকেয়া থেকে ‘বেগম’ বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৮:৫৪ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নবনির্মিত ১৭ নম্বর ছাত্রী হলের নাম পরিবর্তন করে ‘রোকেয়া’ রাখা হয়েছে। এর আগে হলটির নামকরণ হয়েছিল ‘বেগম রোকেয়া’। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আবু হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওনার নাম তো বেগম রোকেয়া না। বেগম রোকেয়া নামে হলের নামকরণের পর একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক লিখিতভাবে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়কে জানিয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনার নামে রোকেয়া হল আছে। আমরাও খোঁজ-খবর নিয়েছি। আসলে তার নাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। নামের আগে বেগম নেই। তাই সংক্ষেপে রোকেয়া হল রাখা হয়েছে।’

তাহলে প্রথমে বেগম রোকেয়া রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সে কারণে হয়তো বেগম রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে বেগম শব্দটি নেই বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ হলটির নাম ‘বেগম রোকেয়া’ রাখায় আপত্তি জানিয়ে চিঠি লেখেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।

এ কে এম শাহনাওয়াজ এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে লিখেছিলেন, ‘‘জীবদ্দশায় রোকেয়া তার নামের আগে ‘বেগম’ শব্দ যোগ করেননি। তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পত্রে অবস্থাভেদে তিনি ‘রোকেয়া’ অথবা ‘রুকু’ লিখেছেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর দাফতরিক চিঠিপত্রে আর. এস. হোসাইন (রোকেয়া সাখাওয়াত হোসাইন) স্বাক্ষর করেছেন। আর নিজের লেখা গ্রন্থে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসাইন লিখেছেন ’’

অধ্যাপক শাহনেওয়াজ আরো লেখেন, ‘‘এটি বুঝতে অসুবিধা নেই যে, পরবর্তী সময় রোকেয়াকে সম্মানিত করতে ‘বেগম’ শব্দ যুক্ত হয়েছিল। যেমন পুরুষ হলে আমরা ‘জনাব’ ব্যবহার করি। কিন্তু বিপদ হচ্ছে যখন অতি ব্যবহারে তা নামের অংশ করে ফেলি। আমাদের সমাজে অনেক মেয়ে পাব যাদের নামই বেগম। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে বেগম রোকেয়া একটি অবিভাজ্য নামে পরিণত হতে বাধ্য। যা ইতিহাসের সত্যকে খণ্ডিত করবে।’’

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‌‘রোকেয়া রচনাবলী’তেও বেগম নেই। এর একটি সংস্করণে বাংলা একাডেমির তৎকালীন (২০০৬) মহাপরিচালক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ লিখেছিলেন, ‘বেগম রোকেয়ার প্রকৃত নাম রোকেয়া খাতুন হলেও পরবর্তীকালে মিসেস আর, এস, হোসেন ও বেগম রোকেয়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। রচনাবলীর নামকরণে তার পরিচিত নামই ব্যবহৃত হয়েছে।’

তিনি ওই লেখায়, বেগম রোকেয়া নামটি ব্যবহার করেছেন।

এ ছাড়া ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি ছাত্রী হলের নাম শুধু রোকেয়া রাখা হয়। তবে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘বেগম রোকেয়া’। সরকারি পুরস্কার অথবা অন্য মাধ্যমেও বেগম ব্যবহৃত হয়।

রোকেয়ার নামের সঙ্গে বেগম ব্যবহার নিয়ে নারী অধিকার কর্মী ফরিদা আখতার তার একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘তাকে সংক্ষেপে বেগম রোকেয়া বলা হয়, যদিও এই বেগম কোথা থেকে এলো তার কোন হদিস পাওয়া যায় না। বেগম তার নামের অংশ নয়। তার আসল নাম রোকেয়া খাতুন।’

তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শাহ নিসতার জাহান আরেকটি দৈনিকে লিখেছিলেন, ‘বিভিন্নজনকে চিঠি লিখতে গিয়ে তিনি কখনও কখনও মিসেস আর, এস, হোসেন লিখেছেন। সেক্ষেত্রে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা ছোট করে বেগম রোকেয়া হয়তো বলা যেতে পারে। অবশ্য তিনি কখনও কখনও শুধুই ‘আর এস হোসেন’ লিখতেন। পরিবারের দেওয়া নাম রোকেয়া খাতুন। আর রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার বহুল প্রচলিত ও পরিচিত নাম। দুটি নামেই তার আপত্তি ছিল বলে মনে হয় না।’

ফরিদা আখতারের কাছ থেকে জানা যায়, শিক্ষাবিদ কাজী আবদুল ওদুদ রোকেয়ার নামের সঙ্গে ‘মিসেস’ ব্যবহার করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘মিসেস আর এস হোসেন’।

বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান তার এক লেখায় জানাচ্ছেন, ‘‘আমরা এক্ষণে যাহাকে ‘বেগম রোকেয়া’ নামে ডাকিতেছি তাহার বাল্যনাম ছিল রোকেয়া খাতুন। বিবাহ সম্বন্ধ করিবার পর তাহার পরিচয় দাঁড়ায় মিসেস [রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ওরফে] আর. এস্. হোসেন। যখন তিনি পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশ করিতেছিলেন তখন সকলে তাহাকে ‘মিসেস আর. এস্. হোসেন’ নামেই ডাকিতেন। কালক্রমে তিনি ‘বেগম রোকেয়া' নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ হইয়াছেন’।

সলিমুল্লাহ খানের ভাষায়, ‘‘বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে সাধারণ বিচারে যাহারা অভিজাত বা সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলা তাহাদের নামেই বেগম বা খানম শব্দ ব্যবহারের রীতি। মিসেস আর. এস্. হোসেনও সেই কথাটি বিলক্ষণ জানিতেন। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামক সুন্দর গল্পের বাংলা সংস্করণে তিনি ইহার প্রমাণ রাখিয়া গিয়াছেন। লিখিয়াছেন, ‘ভারতে যে সকল বেগম খানম প্রমুখ বড় ঘরের গৃহিণীরা রন্ধনশালার ত্রিসীমানায় যাইতে চাহেন না, তাহারা এমন কেন্দ্রীভূত সৌরকর পাইলে আর রন্ধনকার্যে আপত্তি করিতেন না।’ [রোকেয়া-রচনাবলী, আবদুল কাদির সম্পাদিত, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ১৯৮৪, পৃ. ১৪৭]।’’

ফরিদা আখতার তার আরেক লেখায় বলেন, ‘‘এই যুগে তিনি রোকেয়া খাতুন কিংবা মিসেস আর এস হোসেন নন, তিনি একমাত্র ‘বেগম রোকেয়া’। তার নামের আগে এই বেগম জুড়ে দেয়া হয়েছে নারীমুলক সম্মান ও সংস্কারের জন্য। বেগম বলার মধ্যে পুরুষতন্ত্রের গন্ধ আছে; কিন্তু রোকেয়ার সমস্ত কর্মকাণ্ড, তাঁর লেখা, তাঁর দুরদৃষ্টি – সবকিছু মিলিয়ে নামের সাথে ‘বেগম’ যুক্ত করা একদিক থেকে ফেমিনিজমের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বেগম রোকেয়া মানে হচ্ছে ‘ফেমিনিস্ট’ রোকেয়া। এই ফেমিনিজমের অনুবাদ আমি নারীবাদ করলাম না কারণ বাংলায় নারীবাদ যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, বেগম রোকেয়া সেই ধরণের নারীবাদ চর্চা করেন নি। তিনি নারী মুক্তির কথা বলেছেন, কিন্তু ‘মুক্তি’ কথাটিকে দেশকালপাত্র বিবর্জিত বিমূর্ত ধারণা বানান নি।’’

ওই লেখায় তিনি বেগম রোকেয়া নামটিই ব্যবহার করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১১ আগস্ট সিন্ডিকেট সভায় নবনির্মিত ৬টি হল ও একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্সের নামকরণ করা হয়। মেয়েদের তিনটি হলের (১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর) নাম যথাক্রমে বেগম রোকেয়া হল (পরে রোকেয়া), ফজিলাতুন্নেসা হল ও বীর প্রতীক তারামন বিবি হল হিসেবে রাখা হয়।

আর ছেলেদের তিনটি হল (২০, ২১, ২২ নম্বর) যথাক্রমে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ হল, শেখ রাসেল হল ও কাজী নজরুল ইসলাম হল হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। আর স্পোর্টিং কমপ্লেক্সের নাম শেখ কামাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স রাখা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ছেলে ও মেয়েদের তিনটি করে মোট ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়। যার মধ্যে একটি এই ১৭ নম্বর হল। তবে এখনও হলটি চালু হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত