আলোকদ্যুতিময় নিভৃতচারী প্রাণপুরুষ

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:৩৬ পিএম

হারিয়ে গেছেন তিনি, চিরদিনের মতো। এ রকম বহুমাত্রিক পরিচয়ের মানুষ খুব কম থাকেন। নাটক বা চলচ্চিত্রের প্রতি তার নির্মোহ ভালোবাসা ছিল, ঈর্ষা করার মতো। ১৯৪৬ সালের আগস্টে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি নীরবেই গত সোমবার রাতে চলে গেলেন। অথচ কী দারুণ কর্মময় জীবন কেটেছে তার! সৃষ্টির উন্মাদনায় ছুটে বেড়িয়েছেন অনেক দেশ। স্বাধীনতার পর ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে যে দুজন মানুষ চলচ্চিত্র পরিচালনার ওপর পড়াশোনা করতে যান, তাদের একজন ছিলেন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। অন্যজন চলচ্চিত্র পরিচালক এবং নাট্যকার বাদল রহমান, যিনি গত হয়েছেন আগেই। সেখানে তারা বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিদের সঙ্গে পরিচিত হন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকদের দেখেছেন খুব কাছ থেকে। শিখেছেন, কীভাবে সেলুলয়েডে আঁকতে হয় স্বপ্নের ছবিঘর। দেশে এসেই সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী ১৯৮০ সালে হাত দিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তৈরি করলেন, ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্র। বড় পর্দায় অভিষেক হলো অভিনেত্রী সাংসদ সুবর্ণা মুস্তাফার। সালাহউদ্দিন জাকী জড়িত ছিলেন নাট্যচক্র, ড্রামা সার্কেল, ঢাকা থিয়েটার, ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে। বলা যায়, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সাবেক সভাপতিই শুধু নন, প্রকৃত অর্থে ছিলেন চলচ্চিত্র শিক্ষক। ১৯৮০ সালে তার প্রথম ছবি ‘ঘুড্ডি’তে শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে অর্জন করেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তবু থেমে থাকলেন না। একে একে নির্মাণ করলেন লাল বেনারসী, আয়না বিবিরি পালা। ঘুড্ডি ছবিতে সাংবাদিক আহমেদ জামান চৌধুরীর লেখা এবং হ্যাপি আখন্দের গাওয়া আশির দশকের সেই বিপুল জনপ্রিয় গান আবার এলো যে সন্ধ্যা/ শুধু দুজনে/ চলো না ঘুরে আসি অজানাতে/ যেখানে নদী এসে থেমে গেছে আজও মানুষের অন্তরে গেঁথে আছে। এরপর পেলেন একুশে পদক।

টেলিফিল্মের কোনো ধারণা, বাংলাদেশে ছিল না। তিনিই প্রথম বিটিভির ডিজি থাকাকালীন নাটকের এই ধারা চালু করেন। সম্প্রতি তিনি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় দুটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করেন। একটি ‘অপরাজেয় একা’ অন্যটি ‘ক্রান্তিকাল’। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। এই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রথম প্রদর্শিত হয় একটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে ইচ্ছামতো ছোটাছুটি করতে পারতেন না সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। তারপরও তাকে দমানো যায়নি। হুইলচেয়ারে বসেই ক্যারিয়ারের ৭ নম্বর চলচ্চিত্রটি তৈরিতে হাত দেন। ‘অপরাজেয় একা’ নামের চলচ্চিত্রটির কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিলেও শেষ করে যেতে পারেননি। কাহিনি লিখেছেন ঘুড্ডি, উত্থান পতন, সে, নদীর নাম মধুমতি, মেঘলা আকাশ এবং লালসালু ছবির। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একুশে পদক (২০২১) পাওয়া এই নির্মাতা এফডিসির পরিচালক (উৎপাদন) এবং বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে তিনি বেসরকারি টিভি চ্যানেল এসএ টিভির নির্বাহী প্রধান ছিলেন। সেখান থেকেই অবসরে চলে যান।

মনে পড়ছে অনেক কথা। কখনো বিষয়হীন দীর্ঘ আড্ডা, কখনো তার উপদেশ অথবা শিখাতেন টিভি অনুষ্ঠানের কলাকৌশল। বলতেন ক্যামেরার সামনে কখনো ভাববে না, তোমাকে কেউ দেখছে। যদি একবার এই চিন্তা মাথায় গেড়ে বসে তাহলে আর হবে না। ভয়ে কুঁকড়ে যাবে। কণ্ঠ দিয়ে কোনো কথা বের হবে না।

১৯৯৮ সালের শেষ দিক। তখন তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক। যেহেতু নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান গ্রন্থনা, নেপথ্য কণ্ঠ এবং উপস্থাপনা করতে হতো, তাই রামপুরা টিভি ভবনে যাওয়া হতো নিয়মিতই। তখন জাকী ভাই বসতেন শাহবাগে। একদিন শাহবাগ থেকে জাকী ভাইয়ের পিএস ফোন করলেন। বললেন স্যার বলেছেন, বিকেল ৪টার দিকে এখানে আসতে। বিকেলে তার অফিসে যেতেই হাসিমুখে বললেন কী খাবে?

কিচ্ছু না। কী করতে হবে, বলেন?

না। তোমাকে একটি খবর দেওয়ার জন্য ডেকেছি। আমাকে তোমার কথা বলেছেন সৈয়দ আবু জাফর সিদ্দিকী (পরবর্তী সময়ে তিনিও বিটিভির মহাপরিচালক হয়েছিলেন)। তুমি তো নিয়মিত ধারা বর্ণনা এবং উপস্থাপনা করছ। তোমার কণ্ঠ বেশ ভারী। উচ্চারণও ভালো। আমাদের এখানে নিউজে অডিশন দিতে পারো। কয়েকদিন পরই পরীক্ষা হবে। একটা অ্যাপ্লিকেশন করো।

এরপর সংবাদ পাঠক হিসেবে বিটিভিতে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য, প্রায় ৩০০ ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিলেন। সেখানে টিকলেন ৫০ জন। তারপর বলা হলো, রামপুরা বিটিভি ভবনের সেমিনার রুমে উত্তীর্ণ সংবাদ পাঠকদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস হবে। সেই ক্লাসের ওপর আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে। সেখানে নেওয়া হলো ১০ জন! এবার স্ক্রিন টেস্ট। সেখানে টিকল ৫ জন। আবার চূড়ান্তভাবে মৌখিক পরীক্ষা হবে শাহবাগের মহাপরিচালকের রুমে। সালাহউদ্দিন জাকীই সেই পরীক্ষা নেবেন। পরীক্ষা হলো। তিনি গম্ভীর হয়ে একটি প্যানেলের সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন। সেই প্যানেলে ছিলেন নওয়াজিশ আলী খান, মো. বরকতউল্লাহ,  সৈয়দ আবু জাফর সিদ্দিকী, ম. হামিদ, প্রযোজক আবু তাহের এবং আরও দু-তিনজন। সপ্তাহখানেক কোনো খবর নেই। একদিন আবার ফোন। এবার রামপুরা থেকে সৈয়দ আবু জাফর সিদ্দিকী ফোন করেছেন। তখন আমি জনকণ্ঠে। জাফর ভাই বললেন দ্রুত রামপুরায় যেতে। জানালেন, আমি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছি। নেওয়া হয়েছে মাত্র ৩ জনকে। একজন মেয়ে আর ২ জন ছেলে। রামপুরা টিভি ভবনে গিয়ে ডিডিজি (নিউজ)-এর কাছ থেকে অভিনন্দনপত্র নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে থাকবে চলতি মাসের বুলেটিন ডেট অ্যান্ড টাইম। বিটিভি ভবনে পৌঁছামাত্র দেখি, জাকী ভাই দাঁড়িয়ে আছেন মূল গেটের সামনে। অভিনন্দন জানিয়ে বললেন দেখব, কেমন খবর পড়ো? এখন কিন্তু প্রতি মাসে ৪-৫টি বুলেটিন পাবে। কখনো বিকেলে। আবার কখনো লেট নাইট। তোমরা ৮টার সংবাদ পড়তে পারবে না। সেখানেই তাকে বললাম ভাই, বিকেলে তো পারব না। অফিস আছে যে? তিনি হাসলেন। বললেন, এই মাসে ১ দিন পড়ো। আগামী মাস থেকে তুমি নিয়মিতভাবে, লেট নাইট করো।

মনে আছে, প্রথম দিন খবর পড়ার কথা। লেট নাইট নিউজ। সরাসরি সম্প্রচার রাত সাড়ে ১১টায়। কলটাইম রাত সাড়ে ১০টা। ১ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে মেকআপ বা পাফ নেওয়া, ভিটিআর (যে খবরে ভিডিও থাকে), নন ভিটিআর স্ক্রিপ্ট পড়তে হতো। ওপরে ওঠে নিউজরুমে গিয়ে দেখি, সৈয়দ আবু জাফর সিদ্দিকী এবং প্রযোজক নূর হোসেন দীলু আমাকে দেখে হাসছেন। ইশারা করলেন, তাদের সামনে যেতে। বললেন স্যার আসবেন। তিনি তোমাদের সংবাদ পাঠের ধরন স্টুডিওতে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষ করবেন! স্বাভাবিকভাবেই ঠোঁট-মুখ শুকিয়ে গেল। সৈয়দ আবু জাফর সিদ্দিকী অভয় দিয়ে বললেন আরে, ভয়ের কিছু নেই। টেকনিক্যাল বিষয়টা তো তোমাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছেই। জাস্ট অটোকিউটা ঠিক রাখবে। বাক্যের ভাবার্থ যেন তোমার চেহারায় প্রকাশ পায়। এমন সময় জাকী ভাই এসে উপস্থিত। আমাকে উদ্দেশ করে বললেন নিউজ রুমে আসো। এরপর তিনি বেশ কিছু কৌশল আবার বুঝিয়ে দিলেন। বললেন তোমার নিউজ পড়ার শেষ পর্যন্ত আমি আছি। এরপর একসঙ্গে যাব। তুমি থেকো। বাসায় নামিয়ে দেব। রাতে আমি মিরপুরেই যাব, জরুরি একটা কাজে। মুচকি হেসে তিনি চলে গেলেন।

এরপর অনেকবার তার সঙ্গে একান্তে কথা হয়েছে। বিটিভি নিয়ে কিছু বিষয়ে হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কীভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের দাপট চলছে বিটিভিতে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা বহালতবিয়তেই রয়েছেন। ডিজি হিসেবে তিনি কিছুই করতে পারছেন না! আরও কত কথা যে তিনি বলেছিলেন...! আজ সবই যেন হারিয়ে যাওয়া শব্দগুচ্ছ। সেই মানুষটিই আজ আর নেই, এটাই চিরন্তন। প্রিয় পরিচালকের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন সংসদ সদস্য অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা। তার ভাষায়, ‘১৩ তারিখ রাতেও কথা হলো। বুঝিনি এটাই শেষবার! ক্ষমা করে দিয়েন জাকী ভাই, কিছুই করা হয়নি আপনার জন্য। আমি কেবল গ্রহণই করেছি আপনার আদর, আপনার ভালোবাসা, শিক্ষা। আবার অভিভাবক শূন্য হলাম আমরা। অনেক ভালোবাসি আপনাকে। শান্তিতে ঘুমান আপনি। পরম শ্রদ্ধা।’ নির্মাতা পরিচয়ের বাইরেও সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী একজন কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার ও লেখক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অথচ কী অসাধারণ বিনয়! আচরণে কোনো অহংকারের স্পর্শ নেই। সদা হাসিমুখ তার। চোখ বন্ধ করলেই যেন সাদা দাঁতের হো হো শব্দের হাসি কানে বাজে। কী যে প্রাণবন্ত ছিলেন তিনি, যারা তার সঙ্গে গভীরভাবে মিশেছেন, তারাই জানেন।

স্ত্রী শাহানা বেগম, এক ছেলে সৈয়দ শামস আদনান অনন ও  এক মেয়ে সৈয়দ অন্তরা শবনমকে রেখে গেছেন। ছেলেমেয়ে দুজনেই কানাডা থাকেন। গতকাল তারা এসেছেন অথবা আজ আসবেন। এলেই সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীকে আজিমপুর গোরস্তানে দাফন করা হবে।

সবার প্রিয় সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী ঘুমিয়ে আছেন চিরদিনের মতো। সেখান থেকে কেউ কোনো দিন জেগে ওঠেনি-ওঠে না। দৃশ্যমান, সজীব জীবনে যেমনটি ছিলেন, অনন্ত অদৃশ্য জীবনেও তেমনটিই থাকবেন, প্রিয়জন। মহাতল শ্রদ্ধা, জাকী ভাই ...!

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত