নদীর জীবন আছে। জীবন আছে বলেই এই নদী আমাদের সেচব্যবস্থা, যাতায়াত, মৎস্য উৎপাদন, পানি সরবরাহ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। সময়ের পরিক্রমায় নদীর প্রাকৃতিক গঠনগত পরিবর্তন, কম পানিপ্রাপ্তি, দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে দেশের নদ-নদীর অবস্থা বেহাল। দখল-দূষণের সঙ্গে পলিচাপা পড়ে দম বন্ধ হয়ে নদীগুলো মারা যাচ্ছে! দেশের কোনো কোনো নদী শেষ চিহ্নটুকু নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে!
বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের আয়োজিত এক সেমিনারে জানানো হয় দেশে এখন ১ হাজার ৮টি নদী আছে, যার দৈর্ঘ্য ২২ হাজার কিলোমিটার। দেশের নদ-নদী জলাশয়ের পরিস্থিতি কেমন তা কমিশনের চেয়ারম্যানের কথায় প্রকাশ পেয়েছে। বলাবাহুল্য বিষয়টি মোটেও সুখকর নয়। কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরীর ভাষ্যেই কথাগুলো তুলে ধরা যাক। সেমিনারে তিনি বলেছেন, ‘মেঘনায় আগে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। যাদের নেতৃত্বে এই কাজ বন্ধ করা হয়েছে, তাদের পরে পানিশমেন্ট হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছে। স্ট্যান্ড রিলিজ দেওয়া হয়েছ। আবার সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। আর এখানে ভূমিকা রয়েছে একজন নারী মন্ত্রীর।’ বাংলাদেশের নদীগুলো হায়েনারা দখল করে ফেলছে উল্লেখ করে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত বছর এই হায়েনারা ৬৬৮ কোটি সিআরটি বালু চুরি করেছে। যা টাকায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। এই হায়েনার দল থেকে নদীকে বাঁচানো যাচ্ছে না। এই হায়েনার দলের পেছনে আছে রাজনৈতিক শক্তি।’
ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনায় ঢাকার আশপাশের শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ এবং বুড়িগঙ্গা দখল ও দূষণমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আমরা দখলমুক্ত করতে পারলেও দূষণমুক্ত করতে পারিনি। এ নদীগুলো দখলমুক্ত করতে পারলেও পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের অন্য নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করতে পারিনি।’ কর্ণফুলীর অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ইকোনমিক জোন অথিরিটি (বেজা) নদী দখল করে ইকোনমিক জোন গড়ে তুলেছে। তারা এখন বিভিন্ন কোম্পানিকে লিজ দিয়েছে। কর্ণফুলী নদী শুধু পরিবেশগতভাবেই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এই আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নদীর কাগজপত্র দিলেও মন্ত্রণালয় বলছে এটা নদীর অংশ না।’
নদীরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘কর্ণফুলীকে লিজের নামে টুকরা টুকরো করে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। সচেতন মহল, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সবাই মিলে এই কাজ করছে। এই দখলের পক্ষে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও এনজিওকর্মী তারা শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে। নদীরক্ষার জন্য নদীরক্ষা কমিশন নিঃসঙ্গ শেরপার মতো কাজ করছে। আমাদের পাশে কেউ নেই। আমাদের যেসব দক্ষ অফিসার যারা ছিল তাদের তাৎক্ষণিক (স্ট্যান্ড রিলিজ) অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কারণ নদ-নদী রক্ষায় দখলদারদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে ছিল।’
যুগের পর যুগ নদ-নদীগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। নদীগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে চলেছে। কিন্তু কমিশনের চেয়ারম্যানের কথায় স্পষ্ট যে বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা ভালো নেই। মানুষের লোভ-লালসার ছাপ পড়েছে নদীর ওপর। নদী দখল হয়ে যাচ্ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করছেন নদীর ওপর। অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্যরে লাইন জুড়ে দিয়েছে নদীর সঙ্গে। অনেক স্থানে গৃহস্থালির বর্জ্যরে লাইন জুড়ে দেওয়া হয়েছে নদীর সঙ্গে। আবার কোনো কোনো স্থানে শহরের সিটি করপোরেশনের ময়লা-আবর্জনা গিয়ে পড়ছে পাশের নদীতে। শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। নদ-নদী দূষণ-দখল আর ভরাটের সঙ্গে যারা জড়িত তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে একটার পর একটা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, নদীর উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছোট-ছোট খাল-বিল, শাখানদী, উপনদীগুলো ধীরে ধীরে মেরে ফেলা হয়েছে। ফলে বড় বড় নদ-নদীতে পানি সরবরাহের উৎসে এখন টান পড়েছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। মনে রাখতে হবে নদীগুলো আমাদের সম্পদ ও সৌন্দর্য। নদ-নদীর গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না।
নদী-নদীগুলো প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছে! সরকার বছরের পর বছর নদ-নদী বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সেসব অর্থের যথার্থ ব্যবহার হয়নি! সময়মতো নদীগুলো খনন করা হয়নি। আর হলেও নদী খনন কাজে দক্ষতার অভাবে নদ-নদীগুলোর পলি অপসারণ করার পরপরই নদ-নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে গেছে। পলি অপসারণ করেই ওই মাটি নদীর তীরেই রাখা হয়েছে, ফলে সেই মাটি নদীতেই আবার এসে পড়েছে। এভাবে বছরের পর বছর নদীতে পলি ও বালু পড়ে ডুবোচরের সংখ্যা বেড়েছে। নদীখনন কাজে জবাবদিহি ও পরিকল্পনার অভাবে নদ-নদীগুলোর আজ বেহাল দশা। নৌপথ ক্রমাগত কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে চার হাজার কিলোমিটারে (যদিও পানির মৌসুমে নৌপথ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার!)। আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে নৌপথের সুবিধা অনেক। নৌপথে পরিবহন খরচ কম, জ¦ালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ।
নদীর ওপর এমনসব অত্যাচার চলতে থাকলে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশের বদলে ‘নদীমৃত্যুর দেশে’ পরিণত হবে! আগে বাংলাদেশে নদীরক্ষায় এত এত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছিল না, অথচ তখন নদ-নদীর দখল-দূষণ-ভরাট কম হতো। আর এখন নদীরক্ষায় বহু প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও নদ-নদীগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না! সম্প্রতি হাইকোর্ট এক রায়ে দেশের নদ-নদী রক্ষায় কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। রাজধানীর তুরাগ নদকে ‘লিগ্যাল পারসন, জুরিসটিক পারসন ও জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে হাইকোর্ট বলেছে, নদী দখলকারীরা সব ধরনের নির্বাচনের অযোগ্য হবেন, তারা ঋণও পাবেন না। এটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ে আরও বলা হয়েছে, একজন মানুষের যেমন আইনগত অধিকারের সুযোগ আছে, তেমনি নদ-নদীর সে ধরনের অধিকার আছে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন সারা দেশের নদী দখলকারীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। শুধু তালিকা প্রকাশ করলেই হবে না, কালক্ষেপণ না করে এখনই সময় নদনদী দখলকারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার। নদী দখল-দূষণকারীদের ছাড় দিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। বিদ্যমান আইনে সব ধরনের হীন স্বার্থের বেড়াজাল ভেদ করে নিরপেক্ষভাবে নদী হত্যাকারী হায়েনাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীর দখল-দূষণ রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)
