স্বাধীনচেতা, তাই থাকছেন প্রবীণ নিবাসে

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৩, ০২:৩৮ পিএম

বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে আমাদের মাথায় চিন্তা আসে যে, এখানে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। শেষ বয়সে ছেলেমেয়ে কিংবা আত্মীয় স্বজন খোঁজ না নিলে নিতান্ত অনিচ্ছায় এখানে থাকেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও ঘটে। বিশ্ব প্রবীণ দিবসে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য থাকছে তেমনি এক ব্যতিক্রম প্রবীণের কথা।

আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে এই ব্যতিক্রম প্রবীণ হাজেরা আক্তার লিলির সাথে কথা হয়।

পেশাজীবনে বেশ ভালো একটা সরকারি চাকরি করেছেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করেন। গণমাধ্যমে কথা বলতে না চাইলেও আমার বাড়ি সুনামগঞ্জ শুনে ফিরে এসে বললেন, খোকা সুনামগঞ্জের কোথায়? তারপর পাশে বসে গল্পের ঝাঁপি খোলে বসলেন। বললেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে সুনামগঞ্জ সদরে। সেখানে এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। বাবা মুনসেফ ছিলেন (আগে সিনিয়র সহকারী জজকে মুনসেফ বলা হতো)। তারপর ঢাকা চলে এলাম। সুনামগঞ্জের জল জোছনায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলাম আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ (হাওর কন্যা)।’

হাজেরা আক্তার পেশাগত জীবনে একটা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪-১৫টা বই লিখেছেন। যার অধিকাংশের নামই ভুলে গেছেন। তার পরও জানালেন, নির্জনে নীল ও দৃষ্টিতে বৃষ্টি নামে দুটো ছোট গল্পের বইয়ের কথা। পাশাপাশি তিনি লিখেছেন, ‘সীমান্তের ওপারে’ নামে একটা উপন্যাস। জানালেন, হুমায়ূন আহমেদ তার প্রিয় লেখক।

বাসা ছেড়ে প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে উঠে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগে বুঝতে পারলাম নানা বিষয়ে একমাত্র মেয়েটার সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। নাতিকে নিয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতে হতো। মেয়ে বড়লোক স্বামীর প্রশ্রয়ে, যে লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত সেটা আমার পছন্দ ছিল না। তাছাড়া মেয়ের পরিবারের সঙ্গে থাকলেও একা খেতে হতো। আমার সঙ্গে বসে খাওয়ার সময় কারও নেই। ফলে চিন্তা করলাম একাই যদি খেতে হবে তাহলে এখানে থাকব কেন। তাই মেয়ের বাসা থেকে বের হয়ে এখানে এসে উঠি। পাশাপাশি আমার লেখালেখির জন্য মেয়ের বাসার পরিবেশ উপযুক্ত ছিল না।’

এ বয়সে একা নিবাসে এসে খারাপ লাগে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। নিজের একমাত্র মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছি।’ তবে তার একমাত্র নাতি তাকে দেখতে আসে না এ নিয়ে বেশ আক্ষেপের কথা জানান তিনি। বলেন, ‘আমি কল দিয়ে ডাকলে মাঝেমধ্যে আসে, তবে এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর ডাকব না।’

আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে ৩৫টা কক্ষ রয়েছে। বর্তমানে এখানে ১৯ জন মহিলা ও ১২ জন পুরুষ থাকেন। একজন ডাক্তার ও নার্স প্রতিদিন এখানে বসবাস করা প্রবীণদের চিকিৎসা দেন। এখানে থাকতে হলে কক্ষ ভাড়া ৭ হাজার টাকা করে দিতে হয়। সেই সঙ্গে যদি খাবার যোগ করেন তাহলে মাসে আরও তিন হাজার মিলিয়ে মাসে খরচ হয় ১০ হাজার টাকা। তবে কেউ ইচ্ছে করলে নিজেরা রান্না করেও খেতে পারেন বলে জানান নিবাসের সহকারী ম্যানেজার আবদুস সাত্তার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত