হামাসের নেতা কারা, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী কে

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৩, ০২:২৩ পিএম

শনিবার ভোর থেকে ইসরায়েলে অতর্কিত রকেট হামলা শুরু করে ফিলিস্তিনের গাজাভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন হামাস। মুহূর্তের মধ্যে ইসরায়েলে হাজার হাজার রকেট নিক্ষেপ করে সংগঠনটি। এ ছাড়া দক্ষিণ ইসরায়েলের সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার হামাস যোদ্ধা প্রবেশ করে হামলা চালায়।

সশস্ত্র সংগঠন হামাসের হামলার জবাবে গাজায় প্রতিশোধমূলক বিমান ও কামান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সম্পূর্ণ অবরোধ দেয় গাজা অঞ্চলে। পানি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, খাবার, এমনকি চিকিৎসা সামগ্রীও ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরায়েল।

হামলা-পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত দুই পক্ষে নিহত হয়েছে ২১০০ এরও বেশি মানুষ। আহত হয়েছে হাজার হাজার। এ ছাড়া ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান ও কামান হামলায় গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি।

ভয়াবহ ও মানবিক সংকটের এই হামলায় স্বাভাবিকতই এখন সবার মনে প্রশ্ন, সশস্ত্র সংঘঠন হামাসের নেতা কারা? তাদের লক্ষ্য কি আর কেনই বা এই হামলা? এখানে এসবের উত্তর দেয়া হল

হামাস কি?

আল জাজিরার তথ্যমতে, হামাসের অর্থ হলো ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন। আরবি ভাষায় যার অর্থ গভীর অনুভূতি বা উদ্যম।

১৯৮৭ সালে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রথম ইন্তিফাদা বা বিদ্রোহের সময় গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনি শেখ আহমেদ ইয়াসিন প্রতিষ্ঠিত করেন সংগঠনটি।

আন্দোলনটি মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি শাখা হিসাবে শুরু হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য ইজ আল-দিন আল-কাসাম ব্রিগেড নামে একটি সামরিক শাখা তৈরি করেছিল।

পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশনের (পিএলও) প্রধান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনুগত ফাতাহ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংক্ষিপ্ত এক যুদ্ধের পর হামাস গাজা উপত্যকায় ক্ষমতায় রয়েছে।

হামাসের নেতা কারা

image

বর্তমানে গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসের প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইয়াহিয়া আল-সিনওয়ার। ২০২১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি।

২০১৭ সাল থেকে ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় হামাসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ সালে ২০ বছরের বেশি সময় ইসরায়েলের কারাগারে বন্দিজীবন কাটিয়ে মুক্ত হন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি গুপ্তচর হত্যাসহ কয়েকটি অভিযোগ ছিল।

২০১১ সালে অপহৃত ইসরায়েলি সৈনিক গিলাদ শালিতের সাথে বন্দী বিনিময়ের অংশ হিসাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির ঘোর বিরোধী ইয়াহিয়া সিনওয়ার। এরপরও গাজা সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে তাঁর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে মিসরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে সদা উচ্চকণ্ঠ সিনওয়ার।

image

অন্যদিকে হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং সংগঠনটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইসমাইল হানিয়াহ। ২০২১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে চার বছরের জন্য হামাসের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।

গাজায় হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিনের ডানহাত ছিলেন ইসমাইল হানিয়াহ। ৫৮ বছর বয়সী এই নেতা ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

বর্তমানে ইসমাইল হানিয়াহ কাতারে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। হামাসের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ দেইফের সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই গোষ্ঠীর বেশিরভাগ পাবলিক মেসেজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন তিনি।

হামলার মূল পরিকল্পনাকারী কে

রয়টার্সের মতে, ঘটনার সূত্রপাত হয় দুই বছর আগে ২০২১ সালে মে মাস থেকে। তখন পবিত্র রমজান মাসে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল আকসা মসজিদে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা, প্রার্থনারতদের মারধর, তাদের উপর হামলা, বয়স্ক ও যুবকদের মসজিদ থেকে টেনে বের করার দৃশ্য আরব এবং মুসলিম বিশ্বকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

মূলত তখন থেকেই এই হামলার পরিকল্পনা শুরু হয় বলছে রয়টার্স। হামাসের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ দেইফ এই অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন বলে জানায় হামাসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র।

রয়টার্স বলছে মসজিদ প্রাঙ্গণে সেই হামলা, জেরুজালেমের সার্বভৌমত্ব এবং ধর্মের বিষয়ে দীর্ঘদিনের সহিংসতাই এই হামলার সূত্রপাত।

image

২০২১ সালে সবচেয়ে সাম্প্রতিক সাতটি ইসরায়েলি হত্যা প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া, হামাসের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ দেইফ খুব কমই কথা বলেন এবং জনসমক্ষে কখনোই উপস্থিত হননি। তাই শনিবার যখন হামাসের টিভি চ্যানেল ঘোষণা করে যে তিনি বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন, তখন ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পেরেছিল যে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

২০১৪ সালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার স্ত্রী, ৭ মাস বয়সী ছেলে এবং ৩ বছরের মেয়ে নিহত হয়।

ডেইফের হদিস অজানা, সম্ভবত গাজাযর নীচে সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধায় রয়েছেন তিনি। ইসরায়েলের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানায়, ডেইফ হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

হামাসের বহিরাগত সম্পর্ক প্রধান আলি বারাকা বলেছেন, "আমরা এই যুদ্ধের জন্য দুই বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছি।"

একজন মাস্টারমাইন্ড

হামাসের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেছে যে হামলার প্রস্তুতির সিদ্ধান্তটি যৌথভাবে গৃহীত হয়েছিল। হামাসের আল কাসাম ব্রিগেডের কমান্ডর দেইফ এবং গাজার হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন। তবে এটি পরিষ্কার ছিল যে হামলার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন একজনই, মোহাম্মদ দেইফ।

একটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স বলছে যে, হামলার গোপনীয়তা এমন ছিল যে ইরান, যে দেশ হামাসের প্রধান অর্থ সরবরাহকারী, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, তারাও জানত যে একটি বড় অভিযানের পরিকল্পনা হচ্ছে কিন্তু সময় বা বিস্তারিত জানত না।

সূত্রটি বলছে যে, হামাস, ইরান-সমর্থিত লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইরান জড়িত কোন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সাথে এই হামলা নিয়ে আলোচনা করেনি। শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকজন বিস্তারিত জানতেন এই হামলার বিষয়ে।

দেইফ গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন, যেখানে তিনি পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং জীববিদ্যাতেও পড়াশোনা করেছেন। তার শিল্পকলার প্রতি অনুরাগ ছিলো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদন কমিটির প্রধান ছিলেন এবং মঞ্চে কমেডিতে অভিনয় করেছিলেন।

হামাস পদোন্নতি পেয়ে দেইফ সংগঠনটির টানেলের নেটওয়ার্ক এবং এর বোমা তৈরির দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।

সূত্র: এপি, ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি, রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত