বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারের কী পরিমাণ ব্যয় করতে হচ্ছে, এটি নিয়ে সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোসহ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় সফররত আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ক্যাপাসিটি চার্জের পাশাপাশি বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও আয়ের অবস্থা এবং এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এর আগে গত রবিবার প্রতিনিধিদলটি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে এবং গত বুধবার পেট্রোবাংলা ও বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করে জ্বালানি খাতের সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর তাগিদ দিচ্ছে সংস্থাটি। ভর্তুকি কমাতে গেলে দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলে জনমনে বিরূপ প্রভাব পড়বে চিন্তা করে আপাতত দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার।
বাংলাদেশকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের বাংলাদেশের মিশনপ্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি দল গত ৪ অক্টোবর ঢাকায় পৌঁছেছে। দলটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তাদের অধীন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের পর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির ছাড়ের বিষয়ে আলোচনার পর ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশ ত্যাগ করার কথা রয়েছে।
সূত্রমতে, বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির প্রদানের বিষয়টি জানতে চেয়েছে আইএমএফ। তারা বলেছে, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির ফলে সরকারকে যে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেখান থেকে বের হতে এই মুহূর্তে মূল্য সমন্বয়ের পরিকল্পনা কী? এ ছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক অবস্থা, বিদ্যুৎ ঘাটতি, বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা নিয়েও জানতে চায় প্রতিনিধিদলটি।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকার কাজ করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। বেসরকারি খাতের যেসব কেন্দ্রকে নবায়ন করা হচ্ছে, যেগুলো থেকে বর্তমানে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ শর্তে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। ফলে এখানে কোনো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া লাগছে না। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কীভাবে কমানে যায়, সেজন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।
বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে ২০২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ২৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে পিডিবির প্রায় ৫ টাকা লোকসান হচ্ছে। ভর্তুকি দিয়ে সরকার এ লোকসান সমন্বয় করছে।
কিন্তু বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আইএমএফ বেশ কয়েকটি শর্ত দিয়েছিল, যার মধ্যে একটি ছিল ভর্তুকি হ্রাস করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো। শর্ত অনুযায়ী, সরকার ইতিমধ্যে নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে কয়েক দফা।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দুদকের বৈঠক : বাংলাদেশ সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চার সদস্যের একটি দল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে বৈঠক করেছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুদকের প্রধান কার্যালয়ে বৈঠক করে। বৈঠকে আইএমএফের মিশনপ্রধান রাহুল আনন্দ এবং দুদকের পক্ষে সংস্থাটির সচিব মো. মাহবুব হোসেন নেতৃত্ব দেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি।
দুদকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশকে দ্বিতীয় কিস্তি ঋণ দেওয়ার আগে শর্ত পূরণ যাচাই করতে গত ৪ অক্টোবর দেশে আসে আইএমএফের দলটি। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখার পরামর্শ দেয়। সেই সঙ্গে দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথাও বলে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশে আসা আইএমএফের দলটি সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত কতটা পূরণ হয়েছে এবং সরকারি বিভাগগুলো শর্ত পূরণে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তা দিয়ে আলোচনা হয়।
দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, দুদক আইন ও বিধি অনুসারে কীভাবে কাজ করে, সেই বিষয়টি তারা জানতে চেয়েছেন। বর্তমানে দুদকের কাঠোমা, পারফরম্যান্স কী এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, সে বিষয়ে অবগত হয়েছেন। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো আলোচনা হয়নি। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা দরকার সেটা তারা উপলব্ধি করেছেন এবং গুরুত্বারোপ করেছেন।
আইএমএফের এবারের সফরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
