স্ক্যানার নেই চট্টগ্রামের কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:২৮ এএম

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি সত্ত্বেও কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে থামছে না মাদক পাচার। চট্টগ্রামের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কুরিয়ারে চট্টগ্রাম থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ, পণ্য ও চিঠির  মোড়কে দেশ ও বিদেশে পাচার হচ্ছে মাদক। বিদেশ থেকে কুরিয়ারে দেশে আসছে ডিএমটি, এলএসডি, ডিওবির মতো ভয়ংকর মাদক। কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা রাখার সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৮০০টি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে সরকার অনুমোদিত মাত্র ৮২টি। চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন নামে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ৪০টি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে মাদক পাচারে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস ও এসএ পরিবহনের নাম আসছে বেশি।

চলতি বছরের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ৫০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে স্কুল ব্যাগে করে ইয়াবাগুলো পাচারের চেষ্টা করেছিলেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার ননীক্ষীর এলাকার মাদক কারবারি সাইফুল ইসলাম। ইয়াবার ওই চালান তিনি সন্দুরবন কুরিয়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ শাখায় বুকিং দিয়েছিলেন ৪ মে। আদালতে দেওয়া সাইফুলের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ১২ জনের নাম। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করছে না মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের কর্মকর্তারা। 

এর আগে ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর নগরের ধনিয়ালাপাড়া এলাকায় এসএ পরিবহনের পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাচারের সময় ১ লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেছিল র‌্যাব-৭। এ ঘটনায় ওই শাখার ব্যবস্থাপক এম এ মমিন ও সহকারী মো. শামসুদ্দিনকে আটক করা হয়।

এসএ পরিবহনের উত্তরা শাখা থেকে এক লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনায় ২০১৯ সালের ১৯ মে প্রতিষ্ঠানটির তিন কর্মকর্তাকে আটক করে র‌্যাব।

কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর কঠোর নজরদারি থাকার কথা জানিয়ে র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক মাহবুব আলম বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশ ও দেশের বাইরে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা করছে একটি চক্র। বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বহন করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় মাদকের চালান ধরা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। কুরিয়ার সার্ভিসের তল্লাশি দুর্বলতা এবং পার্সেল আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্বল পদ্ধতির সুযোগ নিচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ীরা।

পার্সেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের কুরিয়ার সার্ভিসগুলো সরকারি নির্দেশনা মানছে না। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ের (উত্তর) উপপরিচালক হুমায়ুন কবীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পার্সেলের আড়ালে মাদক পাচারে জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর কোনো আগ্রহ নেই। চট্টগ্রামে কুরিয়ার সার্ভিসের কোনো প্রতিষ্ঠানেই স্ক্যানার মেশিন নেই। পার্সেল বুকিং নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কুরিয়ার সার্ভিসের অপব্যবহার হচ্ছে। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে অভ্যন্তরীণ সিস্টেম ডেপেলপ করতে হবে।’

মাদক পাচারে নিজেদের লোক জড়িত থাকার কথা নাকচ করে দিয়েছেন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড, চট্টগ্রামের মহাব্যবস্থাপক কিরণ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘পার্সেল বুকিংয়ের সময় আমরা যাচাই করছি। প্রেরকের এনআইডির (জাতীয় পরিচয়পত্র) ফটোকপি নিচ্ছি। অপরাধীকে ধরে নিজেরাই পুলিশের কাছে সোপর্দ করছি।’ সব প্রতিষ্ঠানে স্ক্যানার মেশিন বসানোর সরকারি নির্দেশনা কেন মানা হচ্ছে না জানতে চাইলে কিরণ বড়ুয়া বলেন, ‘একটি স্ক্যানার মেশিনের অনেক দাম। তবু আমরা পার্সেলের আড়ালে মাদক শনাক্তকরণে শিগগির বিভাগীয় পর্যায়ে স্ক্যানার মেশিন বসাব।’

চট্টগ্রামের কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর ওপর নজরদারি আছে মন্তব্য করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর জোন) আলী হোসেন বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে মাদক পাচারের ঘটনা ঘটছে। মাঝেমধ্যে ধরাও পড়ছে। যাচাই-বাছাই না করে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পার্সেল বুকিং নিচ্ছে এবং দিচ্ছে। বিভিন্ন নামে চট্টগ্রাম শহরে কুরিয়ার সার্ভিসের দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু একটিতেও স্ক্যানার মেশিন নেই।’

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরের মুরাদপুর এলাকায় বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ‘আরাম্যাক্স’-এর শাখা কার্যালয়ে গিয়ে কথা হয় সুপারভাইজার আবদুল হান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের দেওয়া সব কটি পণ্য খুলে দেখা হয়। এরপর গ্রাহকের সামনেই পণ্য পার্সেল করা হয়।’ এই প্রতিষ্ঠানের পাশেই আছে বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিস ডিএইচএলের শাখা। অবশ্য সেটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মো. ইমরান এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। 

ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে, নগরের নুর আহমদ সড়কে অবস্থিত এসএ পরিবহন চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানের চার কর্মী গ্রাহকদের এনআইডির ফটোকপি গ্রহণ করা ছাড়াই পলিব্যাগ ও কাগজের কার্টনে পার্সেল করা পণ্য বুকিং নিচ্ছেন। তাদের একজন সাকিব হোসেনের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের বুকিং স্লিপেই লেখা আছে, কোনো গ্রাহকের পার্সেল খোলা হয় না। শুধু মোবাইল ফোন হলে চেক করা হয়।’

চট্টগ্রামে এসএ পরিবহনের কোনো প্রতিষ্ঠানে স্ক্যানার মেশিন নেই বলে স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জাকির হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে মাদক ঢোকে মিয়ানমার থেকে। তাই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুধু কক্সবাজার অফিসে স্ক্যানার মেশিন বসানো হয়েছে। ঢাকায়ও স্ক্যানার মেশিন আছে। পার্সেলের নামে মাদক পাচাররোধে আমরা সচেষ্ট আছি। মাঝেমধ্যে অপরাধী ধরে পুলিশেও দিয়েছি।’

মাদক পাচারে এসএ পরিবহনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত নন বলে দাবি করেন জাকির হোসেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে নগরের অক্সিজেন এলাকায় অবস্থিত সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের শাখা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহকদের প্যাকেট করে আনা পণ্য শুধু এনআইডির ফটোকপি ও মোবাইল ফোন নম্বর নিয়ে বুকিং নিচ্ছেন কর্মচারী অলি আহমদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত