তারা পথচলার দিশারি হিসেবে কাজ করেছেন

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৩, ১২:৩৬ এএম

তিতা করলা আমি কখনোই খাইনি, সেদিন প্রথম করলা ভাজিতে ভাত মেখে লুচি আপা আমার মুখে তুলে দিয়েছিলেন। আপা আদর করে দিয়েছেন তাই আর বলা হয়নি আমি করলা পছন্দ করি না। আপার ভালোবাসায় সেদিন তিতা করলাও মিঠা লেগেছিল। তখন আমার বয়স সাত কী আট। আমাদের প্রাইমারি স্কুলে তখন প্রধান শিক্ষক হিসেবে ছিলেন এই নুরুন্নাহার লুচি আপা। তখনো আমরা শিক্ষিকাদের ম্যাম, মিস বা ম্যাডাম বলে ডাকা শিখিনি। আমরা আপা ডাকতাম। আপা দুপুরে আমাদের সঙ্গে বসেই টিফিন করতেন। খেতে বসে নিজের পাত থেকে আমাদের মুখেও তুলে দিতেন। কী এক মা মা আদর মনে হতো। প্রাইমারি পেরিয়ে যখন হাইস্কুলে যাই তখন কী যে খারাপ লেগেছিল আপার জন্য। মনে হয়েছিল আপাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাই নতুন স্কুলে। কিন্তু কী সৌভাগ্য, নতুন স্কুলেও পেয়েছিলাম পছন্দের অনেক শিক্ষককে। হালকা কলাপাতা রঙা শাড়িতে, চুলগুলো টেনে পেছনে খোঁপা করা মাঝবয়সী এক নারী প্রথম যেদিন আমার ক্লাসে ঢুকেছিলেন পুরো ক্লাসই এক পলকে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। যেমন দেখতে মিষ্টি তেমনি আদরে ভরা কথা। পেয়েছিলাম আরেকজন তেজস্বী অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষককে যিনি ছিলেন আমাদের বড় আপা (প্রধান শিক্ষক)। বড় আপাকে এত এত পছন্দ ছিল আমার যে তখনই ভেবে নিয়েছিলাম আমি একদিন বড় আপার মতো (শিক্ষক) হবো। হবো নুরুল ইসলাম স্যারের মতো, যিনি কখনো চেয়ারে বসে ক্লাস নেননি, যার লাগেনি কোনো বই। তিনি নিজেই যেন ছিলেন আস্ত একটা বই। বিভা দিদির মতো রাগী রাগীও হতে চাইতাম। আবার রানী আপার মতো মিষ্টভাষীও, যার প্রতিটা কথা, উপদেশ আজও আমার কানে বাজে। চোখে ভাসে আমি সেই কাঠের বেঞ্চে বসে আছি আর আমার প্রিয় শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন। দুষ্টুমির অপরাধে কান মলে দিচ্ছেন, পরক্ষণেই করে দিচ্ছেন আদর।

মাথায় হাত রেখে সঠিক পথ দেখিয়েছেন যখন আমরা বয়সের দোষে পথ হারিয়ে ফেলছিলাম। আদরে বা শাসনে আমার শিক্ষকরাই ছিলেন পাশে। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময়টায় বাচ্চা কোলে নিয়ে যখন ক্লাসে যেতে হতো তখন হুমায়ুন স্যার বলতেন, ‘আমার মেয়েরা সব পারে’। ঠিক এই একটা কথাই আমাকে দিয়েছিল ভরসা আর মনের জোর। 

জীবনের প্রতিটা ধাপে আমরা এ রকম অনেক শিক্ষককে পেয়েছি। যাদের দেখে মুগ্ধ হয়েছি, হতে চেয়েছি তাদের মতো। এইম ইন লাইফ রচনায় লিখেছি আমি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই।

হয়েছি আমি শিক্ষক, কিন্তু তাদের মতো হতে পেরেছি কিনা জানি না। আমি আজও চাই বড় আপার মতো অসাধারণ হতে। আজও ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে নিজেকে বাচ্চাদের ওই বেঞ্চে দেখতে পাই, আর আমার সামনে দাঁড়ানো সেসব প্রিয় শিক্ষকদের। যাদের আদর্শ আমি আজও বুকে লালন করি। যাদের জন্য আমি আজ নিজেকে মানুষ দাবি করতে পারছি।

শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আমার সব পর্যায়ের শিক্ষাগুরুর প্রতি। যারা আমাদের ভালোবেসে পথচলার দিশারি হিসেবে কাজ করেছেন।

সাদিয়া জামান

শিক্ষক, আফরোজ খান মডেল স্কুল, ময়মনসিংহ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত