মহাখালীর খাজা টাওয়ারে আগুন নারীসহ ৩ মৃত্যু

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৩:৪৯ এএম

রাজধানীর মহাখালীতে খাজা টাওয়ার নামের একটি বহুতল ভবনে আগুন লেগেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ভবনের ১৩ তলায় আগুন লাগে। এ ঘটনায় দুই নারীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন হাসনা হেনা (৩০), আকলিমা রহমান (৩৩) ও ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম (৬২)।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্তব্যরত কর্মকর্তা রোজিনা আকতার জানিয়েছেন, বিকেল ৫টার দিকে খাজা টাওয়ারে আগুন লাগার খবর পান।

প্রথমে দুটি ইউনিট এবং পর্যায়ক্রমে আগুন নিয়ন্ত্রণে ১১টি ইউনিট কাজ শুরু করে।

রাত ১২টায় ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন বলেন, এখনো আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে। কারণ এ ভবনে ব্যাটারি আছে, কেব্ল, সুইচস, আইসোলেশন ফোম এবং ১২ ও ১৩ তলাতে ইন্টেরিয়র দিয়ে খুব সুসজ্জিত করা। এসব দাহ্য পদার্থ। তিনি বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে নেভাতে সময় লাগছে।

ফায়ারের ডিজি জানান, তারা নয়জনকে উদ্ধার করেছেন। একজন নিখোঁজ আছেন বলে জানতে পেরেছেন।  অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল না। তবে বিভিন্ন ফ্লোরে কিছু ফায়ার এক্সটিংগুইশার পাওয়া গেছে, যা কার্যকর ছিল।

ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগুন লাগার পর অনেকে নিচে নামার চেষ্টা করেন। ভবনের ১১ বা ১২ তলা থেকে ইন্টারনেটের তার ধরে নামার চেষ্টা করছিলেন কয়েকজন। এ সময় হাসনা হেনা নামে এক নারী প্রথমে একটি এসির ওপর পড়েন। এরপর সেখান থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে মহাখালী মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতালের তথ্য কেন্দ্রের কর্মী আরিফুল হক জানান, একজন নারীকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। তার বয়স ত্রিশের মতো হতে পারে। অগ্নিকান্ডে আহত হয়ে দুজন এসেছেন। একজনের হাত পুড়ে গেছে, আরেকজনের পা ভেঙে গেছে।

অন্যদিকে আকলিমা ও রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বনানী থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ধোঁয়ায় অসুস্থ চারজনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা হলেন সৈয়দ মেহেদী হাসান (২৭), আর্থ কমিউনিকেশন প্রকৌশলী কাজী তাহসিন মাহমুদ রাকিব (২৩), একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আবদুস সবুর (৪৫) ও গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম (৪৫)।

হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ড. তরিকুল ইসলাম বলেন, তাদের শরীরে পুড়ে যাওয়ার কোনো আঘাত নেই। সবার ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। চারজনের মধ্যে মেহেদী ও তাহসিনকে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি দুজন অবজারভেশনে রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্র জানায়, ১৪ তলা ভবনটিতে ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। ভবনে বিভিন্ন তলায় লোকজন আটকা পড়েছেন। কেউ কেউ ছাদে আশ্রয় নিতে গিয়ে সেখানে আটকা পড়েছেন। তারা চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানান। বেশ কয়েকজন ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন। কেউ দড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ও মাথায় কাচ পড়ে আহত হয়েছেন। কাচ দিয়ে ঘেরা ভবনের ভেতর থেকে সহজে ধোঁয়া বের হতে পারছিল না। প্রচন্ড ধোঁয়ায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

সূত্রগুলো জানায়, ভবনের নবম ও দশমতলা মিলিয়ে আর্থ টেলিকম ও রেইস অনলাইনের কার্যালয় এবং সার্ভার রুম। ওই ভবনের একটি ফ্লোরে আন্তঃসংযোগ এক্সচেঞ্জ অপারেটরদের সংযোগ অফিস। অগ্নিকান্ডের পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়। একাধিক অপারেটর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহাখালীর অগ্নিকান্ডের কারণে ইন্টারনেট সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছেন না।

আগুন লাগার পর আমতলী থেকে গুলশান-১ নম্বরমুখী সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের এলাকায় তৈরি হয় যানজট। ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সাত প্লাটুন আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ জানান, মহাখালীর আমতলী এলাকায় একটি বহুতল ভবনে আগুনের ঘটনায় ভবনে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিস তাদের নামিয়ে আনে। সহযোগিতা করে পুলিশ।

আগুনের ঘটনার পর এক ভিডিওতে দেখা যায়, জীবন বাঁচাতে দৌড়ে ছাদে চলে আসেন অনেকে। পরে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দড়ি ধরে নামতে থাকেন তারা। ভবনের ছাদে অন্তত ১০-১২ জনকে দেখা যায়। তারা আগুন থেকে বাঁচার জন্য আকুতি জানাতে থাকেন। ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোবাইলের লাইট দিয়ে বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন তারা। তাদের মধ্যে অনেকের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান সিকদার জানিয়েছেন, ভবনের ছাদ ও বিভিন্নতলায় আটকে পড়া সাতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া আগুন যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিভিন্ন তলায় তল্লাশি চালান। তিনি বলেন, উদ্ধারকৃতদের আশপাশের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ভবনটি থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজন জানান, সারা দিন অফিস শেষে বিকেলে তারা বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক এ সময় আগুন লাগে। তখন যে যার মতো ছোটাছুটি করতে থাকেন। প্রথম প্রথম যারা নিচে নেমে এসেছেন, তারা নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে আগুনের বিষয়টি জানতে অনেকের সময় লেগে যায়। ততক্ষণে বিদ্যুতের তার বেয়ে আগুন ওপরের ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাদের কেউ বলেছেন, আগুনের সূত্রপাত অষ্টমতলা থেকে। আবার কেউ বলছেন, ১১ তলায় থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে কত তলা থেকে এবং কীভাবে আগুনের সূত্রপাত, সেটি ভবন কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস তৎক্ষণাৎ নিশ্চিত করতে পারেনি।

ঘটনাস্থলে গিয়ে আরও দেখা গেছে, ভবনের ১১, ১২ ও ১৩ তলা থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ¦লছে। পরক্ষণে ১৪ তলা ও ছাদের এক অংশে আগুন ধরে যায়। ছাদের অন্য অংশে বেশ কয়েকজন লোক আশ্রয় নিয়েছেন। তারা সেখান থেকে হাত নেড়ে, গেঞ্জি, টি-শার্ট উড়িয়ে তাদের রক্ষা করার সহায়তা চাইছিলেন। ভবনটির সামনের দিকে সাততলার বাইরের দিকে একজন ঝুলছিলেন। জানালা দিয়ে এক নারী ওড়না নেড়ে তাকে রক্ষা করার আকুতি জানান। স্থানীয়রা বেশ কিছু কম্বল এনে নিচে পেতে রাখেন। সেখানে কাছাকাছি ফ্লোর থেকে কয়েকজন লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করেন। ধোঁয়ায় পুরো ভবনসহ আশপাশের এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। ফায়ার সার্ভিস দুটি লেডার সংবলিত অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজের গাড়ির (টিটিএল) সাহায্যে খাজা টাওয়ারের বিভিন্ন ফ্লোরের জানালার গ্লাস ভাঙা হচ্ছে। গ্লাস ভেঙে দেখা হচ্ছে আগুনে ভবনের ভেতরে কোনো মানুষ আটকা আছেন কি না, ভবনে আটকা পড়া অনেকে পাশের ভবনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যান্ডউইথ আসত খাজা টাওয়ারের দুই ডেটা সেন্টার থেকে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার ৭০ শতাংশ দিয়ে থাকে। যেহেতু ডেটা সেন্টারগুলো বন্ধ হয়েছে, তাই ইন্টারনেট সেবায় বিঘœ হচ্ছে। তবে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সেবা সচল রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত