দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে শিল্পায়নের সুযোগ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৩, ০২:৩৩ এএম

আনোয়ারার মানুষ এতদিন কর্ণফুলীর ওপার থেকে ঝলমলে চট্টগ্রাম নগরীকে দেখত। শিগগিরই আনোয়ারাও আলোকিত হয়ে উঠবে নগরীর মতো। আজ শনিবার কর্ণফুলীর ওপর প্রান্ত নগরীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নদীর তলদেশে করা টানেলের মাধ্যমে।

উপমহাদেশে টানেল যুগের সূচনায় চট্টগ্রাম নগরী তার আলোর মালায় আনোয়ারার সঙ্গে গাঁথবে কক্সবাজারকেও। এই টানেলে ভর করেই জাপানের প্রস্তাবিত ‘বিগ-বি’ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল। শিল্পায়ন ও যাতায়াত ব্যবস্থায় ঘটবে এক আমূল পরিবর্তন।

জাপান সরকারের প্রস্তাবিত বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ বিগ-বি নামে পরিচিত।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চীনের সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউনের আদলে গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম। কর্ণফুলীর তলদেশের টানেলের এই দুই টিউবকে কেন্দ্র করে নদীর অপর পাড়ের চট্টগ্রাম আলোকিত হবে। একই সঙ্গে উপকূল ধরে তা আনোয়ারা, বাঁশখালী, মহেশখালী, চকরিয়া হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত শিল্পায়নের প্রসার ঘটাবে।’

শহর প্রান্তে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের কাছে থাকবে টানেলের প্রবেশ পথ এবং ওপারে কাফকো ও সিইউএফএলের মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে বের হবে। এরপর মূল সড়কে আনোয়ারার চাতুরি চৌমুহনী হয়ে চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ উপকূল সহজ যোগাযোগের আওতায় আসবে।

শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতেই আনোয়ারায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে চীন। সে অনুযায়ী জায়গা ও রাস্তা চূড়ান্ত হয়ে আছে। এখন শুধু শিল্প স্থাপন বাকি। শুধু কি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল? আনোয়ারায় আগেই গড়ে উঠেছিল কোরিয়ান ইপিজেড, কাফকো, সিইউএফএল, কিন্তু নদীর পাশে হলেও শহর থেকে যাতায়াতে তাদের শাহ আমানত সেতু ঘুরে আসতে হতো। বর্তমানে বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপ কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করেছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং একই এলাকায় ইতিমধ্যে চালু হয়েছে ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প।

এ ছাড়া আনোয়ারা থেকে মহেশখালী পর্যন্ত পুরো সমুদ্র উপকূলে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ জায়গা নিয়ে রেখেছে, কেউবা এখন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি চিটাগাং চেম্বারে টানেল নিয়ে এক সভায় চেম্বারের পরিচালকরা দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প স্থাপনে সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা চেয়েছেন।

তবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান ছাড়া যে টানেল থেকে শতভাগ সুবিধা পাওয়া যাবে না তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এ বিষয়ে দেশের পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীর ওপারে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের সুযোগ রয়েছে। সরকারের কাছ থেকে শিল্প স্থাপনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া গেলে অবশ্যই পোশাকশিল্প গড়ে উঠবে কোনো সন্দেহ নেই।’

কিন্তু মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে তো পোশাকশিল্পের জন্য বিশেষ শিল্প জোন গড়ে উঠছে। তারপরও কি নদীর ওপারে সম্ভাবনা আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সম্ভাবনা আছে। যেখানে শ্রমিকদের সহজলভ্যতা রয়েছে সেখানেই পোশাকশিল্পের প্রসার ঘটবে। আর আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেড রয়েছে, চীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। তাই এখানে আরও বিনিয়োগ হবে এবং শিল্পায়নও হবে।’

তবে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) চট্টগ্রাম জোনের প্রেসিডেন্ট আবদুল কৈয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামে আধুনিক উপ-শহর গড়ে তুলতে জমি বরাদ্দ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পারকি সমুদ্রসৈকত নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হলে টানেলের কার্যকারিতা বহুগুণে বেড়ে যাবে।’

তিনি মনে করেন, টানেলের বহুমাত্রিকতা বাড়াতে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কানেকটিভিটি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারে পর্যটন বিকাশে মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

কর্ণফুলীর ওপারে শিল্পায়ন হলে সুপেয় পানির চাহিদা প্রকট হতে পারে। বর্তমানে যেমন বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে পানির সংকট দেখা দিয়েছে তেমনিভাবে আনোয়ারা অংশেও পানির সংকট রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টানেল চালু হলে আনোয়ারা, পটিয়া ও কর্ণফুলী প্রান্তে শিল্পায়ন বাড়বে। তাই ওই এলাকায় সুপেয় পানির সংস্থান করতে আমরা ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প নির্মাণ করছি। শিগগিরই তা চালু হবে। এতে করে আর পানির অভাবে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে না।’

টানেলে শুধু নদীর ওপারের শিল্পায়ন ঘটবে না, আরও উদ্যোগ তৈরি হবে। ইতিমধ্যে টানেলকে কেন্দ্র করে পতেঙ্গা সমুুদ্রসৈকত এলাকা অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আগামীতে এই সৈকতকে আরও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

টানেলের চট্টগ্রাম শহর প্রান্তের উন্নয়ন প্রসঙ্গে নগরের ডবলমুরিং-পাহাড়তলী এলাকার সংসদ সদস্য মহিউদিন বাচ্চু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টানেলে নদীর উভয় পাড়েই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বিস্তার ঘটবে। শহর প্রান্তে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা, বে টার্মিনাল, ডিসি পার্কসহ হালিশহর এলাকার বিস্তীর্ণ খালি জায়গায় বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠবে।’

অর্থনীতিবদ ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘টানেলের এ প্রান্তে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর, নির্মাণ হচ্ছে বে টার্মিনাল। অপর প্রান্তে এখন গড়ে উঠছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সীতাকুন্ডের শিল্পাঞ্চল অন্যদিকে। এগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষা করবে টানেল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত