ভারতের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক ও মহাদেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে স্থান করে নিয়েছে। ভারতে ইউরোপ-আমেরিকার দেশেগুলোর তুলনায় জীবনযাপন ব্যয় কম, বাংলাদেশ থেকে যাতায়াত সহজ, রয়েছে বৃত্তি লাভের সুযোগ। এসব সুবিধার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায় ও মানবিক বিষয়ে পড়ার জন্য অনেক শিক্ষার্থীই ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ভারতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার
বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার ছেলে আরাফাত আহমেদ আকাশ। ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপে পড়ছেন ভারতের চন্ডিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই উইথ স্পেশালাইজেশন ইন ব্লকচেইন টেকনোলজি বিষয়ে। এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন আকাশ। তারপর ফেসবুক মারফত এলাকার একজনের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে এসেছেন। তার সঙ্গে কথা বলেই ICCR স্কলারশিপ সম্পর্কে জানতে পারেন আকাশ। তখন আবেদনের সময় খুব কম ছিল। খুব দ্রুত পাসপোর্ট করতে হলো। স্কলারশিপের আবেদন করার জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন হয়। পাসপোর্ট পাওয়ার পর আবেদন করলেন। আইসিসিআর স্কলারশিপে জওহরলাল নেহরু টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। পরে ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপে ভারতের পাঞ্জাবের চন্ডিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন আকাশ।
ভারতে উচ্চশিক্ষায় যোগ্যতা
পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই ভারতে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমান। বিশেষ করে আফ্রিকা, মেক্সিকো, মিসর, ব্রাজিল, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে আসছে। উচ্চশিক্ষায় ভারতে যেতে শিক্ষাগত যোগ্যতায় ন্যূনতম এইচএসসি পাস ও বয়সে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। এইচএসসি অথবা এ লেভেল উত্তীর্ণ হওয়া যে কোনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভারতের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে পারবেন। স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী মাস্টার্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটরাও আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া যারা পিএইচডি করতে চান, তারাও আবেদন করতে পারবেন। হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া ভারতে উচ্চশিক্ষায় আইএলটিএসের কোনো প্রয়োজন নেই।
কাজের সুযোগ
চাকরি বা খন্ডকালীন কাজের ক্ষেত্রে ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স করতে আসা শিক্ষার্থীদের কাজের একদম অনুমতি নেই ভারতে। কেউ এসে কাজ করে থাকলে আইনের জটিলতায় পড়তে পারেন। এগুলো মাথায় রেখে ভারতে আসতে হবে।
ভারতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র ভারত। দক্ষিণে কন্যাকুমারী থেকে উত্তরে হিমালয় পর্যন্ত, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য রয়েছে। আবহাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের এক প্রদেশে যখন গরম তখন প্রদেশ বরফে ঢাকা। আবহাওয়া নিয়ে ঠিক ব্যাখ্যা দেওয়াটা কঠিন। একজন শিক্ষার্থী যদি ভারতে পড়াশোনা করতে আসেন তাহলে পড়াশোনার পাশাপাশি হতে পারেন একজন ভালো ট্রেভেলার। কাশ্মীর, শিমলা, মানালি, লাদাখ, গুয়া বিচ, আগরা তাজমহল, কেদেরনাথ, দার্জিলিং ইত্যাদি দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন ভারতে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া একজন শিক্ষার্থী। ভারতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কোন বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করছেন সে অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়া আপনার শারীরিক অবস্থার অনুকূল কিনা তা বিবেচনায় রাখতে হবে।
ভাষা
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিকমানের। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে আসেন। আর ক্লাসগুলো সম্পূর্ণ ইংলিশ মাধ্যমে পঠন-পাঠন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে আমাদের ভাষাগত বেশ মিল রয়েছে যা ভারতের জাতীয় ভাষা ‘হিন্দি’ বোঝা ও বলার ক্ষেত্রে সাহায্য করে।
আবেদন প্রক্রিয়া
ভারতে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ICCR স্কলারশিপ, SII স্কলারশিপ, ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপ এই তিনটি মাধ্যমে আসতে পারেন। ICCR স্কলারশিপটি Indian Council for Cultural Relations প্রদান করে থাকে। প্রতিবেশী ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে প্রবাসী শিক্ষার্থীদের প্রতি বছর এই Cultural Scholarshipদিয়ে থাকে ভারত সরকার। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ২০০ জন শিক্ষার্থী এই স্কলারশিপ পায়। এই স্কলারশিপে আবেদনকারীকে কয়েকটি ধাপ শেষ করে এটি পেতে হয়। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ১০০টি সিট এবং বাকি ১০০টি বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীদের জন্য। এ স্কলারশিপের আওতায় বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে ১৮ হাজার রুপি দেওয়া হয়। স্কলারশিপটি বছরের মার্চ-মে মাসে শুরু হয়ে থাকে। দ্বিতীয় স্কলারশিপটি হলো SII স্কলারশিপ Study in India। এই স্কলারশিপটি Ministry of Education and The Ministry of Commerce and Industry-এর সহায়তায় পরিচালিত একটি স্কলারশিপ প্রোগ্রাম। এটি পেতে Ind-SAT পরীক্ষা দিতে হয়। একজন আবেদনকারী সরকারি-বেসরকারি যে কোনো ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করতে পারবেন। প্রতি বছর এই SII Scholarship--এর পরিমাণ ৩৫০০ ডলার। যেটা সরাসরি কলেজ বা ভার্সিটিতে চলে যায়। শিক্ষার্থীকে সরাসরি দেওয়া হয় না। উচ্চশিক্ষা ব্যয় এই ৩৫০০ ডলারে যতটুকু পূরণ হবে ভার্সিটি খরচের ততটুকু শিক্ষার্থীকে বহন করতে হবে না। সর্বশেষ যেটি তা হলো ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপ। এটি মূলত বেসরকারি ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক ফলাফলের ওপর দিয়ে থাকে। কোর্স ফি ইউনিভার্সিটির মান, র্যাঙ্কিং সব কিছুর ওপর নির্ভর করে।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
ভারতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহীদের জন্য আরাফাত আহমেদ আকাশের পরামর্শ হলো, আগ্রহী শিক্ষার্থীকে আবেদন করার আগেই বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করে রাখতে হবে। একজন শিক্ষার্থী পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারেন। যারা প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে চান তারা NIT, IIT, Engineering University পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন। আবেদনের সময় নিবন্ধ লেখার জন্য পাঁচটি বিষয় থাকে। একটি বিষয় নিয়ে লিখতে হয়। যে যত ইউনিকভাবে আর গুছিয়ে লিখতে পারবে সে তত এগিয়ে থাকবে। এ ধাপগুলো শেষে আসবে ভারতের হাইকমিশন থেকে ই-মেইল। EPT পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়।
