দুশ্চিন্তায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:১০ এএম

হরতাল-অবরোধ অনেকটাই ভুলতে বসেছিল দেশবাসী। এমনকি হরতাল-অবরোধের কারণে আগে যে দফায় দফায় পরীক্ষা পেছাতে হয়েছে, স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছে, তাও মনে নেই অনেকের। কিন্তু দীর্ঘদিন পর হলেও সেই হরতাল-অবরোধ ফিরে এসেছে। আগুন, ভাঙচুরসহ সহিংসতা হচ্ছে প্রকাশ্যেই। বছরের শেষ সময়ে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে চার কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।

জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এজন্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমের জন্য ডিসেম্বর মাসে যাতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, সেজন্যও এ বছর আগেভাগে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করতে চায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর।

গত ২৯ অক্টোবর বিএনপিসহ সমমনা দলের ডাকে সারা দেশে হরতাল পালিত হয়েছে। আবার গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের অবরোধ। ফলে অভিভাবকরা আতঙ্কিত। অবরোধের মধ্যে স্কুলগুলো খোলা রাখলেও উপস্থিতি কমে গেছে। তবে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা রয়েছে তারা তা পেছাতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অভিভাবকরা তাদের আতঙ্কের কথা প্রকাশ করছেন। যারা একটু দূরে থাকেন, তারা তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপিসহ সমমনা দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি চলছে, যা নভেম্বর মাসে আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে নভেম্বরের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করা নিয়ে ইতিমধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে মাউশি অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ৯ নভেম্বর থেকে স্কুলগুলোর বার্ষিক মূল্যায়ন শুরু হবে। তাই এখনই অন্য কোনো বিষয় ভাবার সময় আসেনি। আমরা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করতে চাই। উদ্ভূত কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

জানা যায়, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করতে বেশ আগেই একটি সময়সূচি নির্ধারণ করে দিয়েছিল মাউশি অধিদপ্তর। সেখানে ৫ নভেম্বর থেকে নতুন শিক্ষাক্রমের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়ন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা পিছিয়ে ৯ নভেম্বর থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে এখনো পরীক্ষা শেষ করার সময় ৩০ নভেম্বরই রাখা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের দুই পরীক্ষার মধ্যে সময় কমে আসবে। গত সোমবার এ সংক্রান্ত সংশোধিত চিঠি স্কুলগুলোতে পাঠানো হয়েছে।

যদিও মাউশি অধিদপ্তর তাদের চিঠিতে মূল্যায়ন পেছনোর পেছনে মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ দেরিতে শেষ হওয়ার কথা বলেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে মাধ্যমিকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতে মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। তাই বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়ন ৫ নভেম্বরের পরিবর্তে ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হবে। তবে ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ গ্রহণে ব্যস্ত থাকবেন, তাই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়নের সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। জানা যায়, রাজধানীর বেশ কিছু স্কুলে ১ নভেম্বর (আজ) থেকে প্রাথমিকের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবরোধের কারণে তা পিছিয়ে ৫ নভেম্বর থেকে শুরু করার নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া হরতাল-অবরোধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধিভুক্ত কলেজের পরীক্ষাও পিছিয়েছে। তবে উচ্চমাধ্যমিক কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো সেভাবে প্রভাব পড়েনি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। আর বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই হরতাল-অবরোধে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবরোধের মধ্যে স্কুলে উপস্থিতি কিছুটা কম। বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। ইতিমধ্যে রুটিন তৈরি করে শিক্ষার্থীদের দিয়েও দেওয়া হয়েছে। এখন যদি বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি আসে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করতে হবে। তবে বেশিরভাগ স্কুল যেহেতু নিজেদের প্রশ্নে পরীক্ষা নেয়, তাই হরতাল-অবরোধের মধ্যে পরীক্ষা পড়লে শুক্র-শনিবারও তা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষার রুটিন অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়েছে। সেটাও যদি নিজেদের রুটিনে নেওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে তাতেও তেমন সমস্যার সৃষ্টি হবে না। তবে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’

রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরেই হরতাল-অবরোধের প্রভাব বেশি পড়ছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসায় বেশি ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা। গ্রামগঞ্জে রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রভাব খুব বেশি না থাকলেও সারা দেশের স্কুল-কলেজ একই শিক্ষাপঞ্জি মেনে চলে। গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোতেও কাছাকাছি সময়ে বার্ষিক পরীক্ষা হয়। কারণ শহরাঞ্চলের স্কুলগুলো তারা নিজেরাই তাদের প্রশ্ন তৈরি করে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এখনো বেশ কিছু স্কুল একসঙ্গে একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেয় বা শিক্ষকদের সমিতি থেকে প্রশ্ন কিনে নেয়। এজন্য মফস্বলেও একেক স্কুলের একেক দিন পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণির প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যেই হরতাল-অবরোধের প্রভাব পড়বে।

এ ছাড়া চলতি বছর থেকে তিনটি শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। আগামী বছর আরও চারটি শ্রেণিতে তা চালু হবে। এজন্য বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। আর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেই স্কুলগুলোতে নতুন বই পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে নভেম্বর মাসটি শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তাতেই বাধার সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে ভয়ে আছি, উদ্বেগে আছি। বিশেষ করে রাস্তা দিয়ে চলাচলেই বেশি ভয় পাচ্ছি। এ ছাড়া বাচ্চারা বিভিন্ন মাধ্যমে আগুন, ভাঙচুরের ঘটনা দেখে তাদের মধ্যেও আতঙ্ক কাজ করছে। আর কয়েক দিন পরেই বার্ষিক পরীক্ষা। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আমরা সহিংস কোনো কর্মসূচি প্রত্যাশা করি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত