প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শিগগির আতিথ্য দিতে ভারত বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিক থেকে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যেকোনো সময় এ সফরটি সম্পন্ন করতে চায় দেশটি। অন্যদিকে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে ভারতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যদের প্রত্যর্পণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাগিদ দিয়ে চলেছে। তবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ ও তার তৎপরতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে ভারত অনাগ্রহী হওয়ায় দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর সফর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকার গতকাল ঢাকায় এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে এমন ইঙ্গিত দিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এ কে এম শহীদুল করিম এ ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়ে দুদেশের কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে গত ৫ আগস্ট গণমাধ্যমে যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে সফরের প্রস্তুতির প্রক্রিয়া কলুষিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ নেই।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ কয়েকজনকে ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে।
অতিরিক্ত সচিব বলেন, বাংলাদেশ সরকার মনে করে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদীর খুনে অভিযুক্তসহ ভারতে পলাতক থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণের জন্য সরকারের অনুরোধের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন। মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গতি আনার উপায় নিয়ে গত সোমবার কথা বলেছেন। পরদিন তিনি নয়াদিল্লিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও একই বিষয়ে আলাপ করেছেন। গত শুক্রবার তিনি ঢাকায় ফিরেছেন। তবে কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণের মতো আশ্বাস ভারত থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, গতকাল রবিবার নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। এতে নাম উল্লেখ না করে দেশটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় নয়, ভারতীয় আদালতের প্রক্রিয়ায় হবে। আদালতের প্রক্রিয়া যাচাই করা হবে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে শেখ হাসিনার জন্য অসুবিধাজনক হয়, এমন অবস্থান বা সিদ্ধান্ত ভারত নেবে, এমন সম্ভাবনা দেখছেন না দেশটির কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জার্মানির গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলেতে গত ৭ আগস্ট প্রচারিত এক ভিডিও প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাস বলেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতের একজন প্রমাণিত বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত যা অর্জন করেছে, তা অবিশ্বাস্য।’
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া অভিহিত করে রীভা গাঙ্গুলি বলেন, ‘তিনি এখন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছেন। এমন অবস্থায় তার সঙ্গে যেমন আচরণ করা হবে তার প্রভাব ভারতের ওপরও পড়বে। সবাই দেখবে যে, ভারত প্রমাণিত বন্ধুর সঙ্গে কেমন আচরণ করে।’