দুর্বল প্রশাসনে কাটেনি স্থবিরতা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪২ এএম

চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিপর্যস্ত আমলাতন্ত্রকে আওয়ামী লীগ আমলের দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার দফায় দফায় প্রশাসনের নানা স্তরের কর্মকর্তাদের ওএসডি করে। এতে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আমলাতন্ত্রে; মনোবল হারিয়ে কার্যত একটি দুর্বল প্রশাসনে রূপ নেয়। এরপর চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের ৬ মাসেও প্রশাসনে স্থবিরতা খুব বেশি কাটেনি।

জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর মনোবল হারানো দুর্বল প্রশাসন নিয়েই যাত্রা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া আশ্বাস মিলেছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনিক রদবদলে (পদায়ন ও পদোন্নতি) প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির তেমন প্রতিফলন ঘটেনি। প্রশাসনে আসেনি দৃশ্যমান গতি। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিতরা ঊর্ধ্বতন পদ, পদায়ন ও অন্য সুযোগ-সুবিধা পেতেই বেশি আগ্রহী। বর্তমান সরকারের নিজস্ব উন্নয়ন দর্শন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে তাদের তেমন মনোযোগ নেই। ফলে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির তালিকায় থাকা অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

জানা গেছে, প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে এখন ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের কর্মকর্তা আছেন। এতে সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বিএনপির ৬ মাসে ওএসডি হয়ে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭শর মতো। অন্যদিকে এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালেই ১০ সচিবসহ ২২৪ কর্মকর্তাকে ওএসডি করেছিল। ২০১৮ সাল নাগাদ ওএসডি হওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছায়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ওএসডি অবস্থায় চাকরিজীবন অবসান হওয়া ছাড়াও অনেকে শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়েছেন। এমনকি এক কর্মকর্তার আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদেরকে একটা বড় কাজ করতে হয়েছে। জনপ্রত্যাখ্যাত সরকারের দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের সব স্তরে তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার কর্মকর্তারা ছিলেন। তাদেরকে সরাতে হয়েছে। এসব জায়গায় রিপ্লেস করে জুলাই চেতনাকে এগিয়ে নেওয়াটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। তারপরও কমপিট্যান্সি ইজ এ মাস্ট, তা না হলে সরকার যে পদে বা যে দায়িত্বে একজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করল সে উদ্দেশ্য অর্জন হবে না।’

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনায় পদায়ন হয়েছে। আরও দেখছি, দিনে দিনে ওএসডির সংখ্যা বাড়ছে। এদের মধ্যে যোগ্যতর কেউ যদি থাকেন তাকে কাজে লাগানো উচিত। মনে রাখতে হবে, একজন যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। তাকে তৈরি করতে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়। সুতরাং রাষ্ট্রকে তার প্রতিদান দেওয়ার আছে। দেশ ও জাতি তার মেধা ও কাজের মাধ্যমে উপকৃত হবে। তবে কনসার্টেড এফোর্ট বা সিংক্রোনাইজেশন বলে একটা কথা আছে। দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের এ বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার পরিচালনায় সহায়তা করতে হবে।’

আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদ থেকেই আমরা দেখেছি অনেক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ে ওই সরকার হাজার হাজার কর্মকর্তাকে ওএসডি করেছে। তাদের মধ্যে অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন। এ নিয়ে ক্ষোভ জমাট বাঁধতে বাঁধতে এক পর্যায়ে ওই সরকারকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মতো করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। সুতরাং এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমলাতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নেতিবাচক প্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়। দুর্ভোগ পোহাতে হয় সরকারকে, ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের।’

তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা দায়িত্ব নিয়ে টের পেয়েছি, প্রশাসন কলাপ্স করেছে। জরুরি খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও সার আমদানির মতো অর্থ নেই, রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থ দেবে নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা সরে গেছে। প্রশাসনের কেউ কোনো কাজ করতে চাচ্ছেন না। সে অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা শুরু হয় অবসরে যাওয়া তিনজনকে সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে। তাদের মধ্যে ছিলেন নাসিমুল গনি ও মো. এহসানুল হক। তখনকার অনেক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও পদায়ন করে উৎসাহ দিয়ে সরকার পরিচালনার কাজ এগিয়ে নিয়েছি। এরপর দেড় বছরে আমরা একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ করেছি। এখন এই প্রশাসনের পূর্ণ গতি ফিরিয়ে আনা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাজ।’

তবে অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতি আর সুবিধাজনক পোস্টিং নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো ভাবনা নেই। সরকারপ্রধান তারেক রহমান দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানালেও অনেক কর্মকর্তা এ ব্যাপারে উদাসীন। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের নির্দেশনা বাস্তবায়নেও শৈথিল্য রয়েছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী অবশ্য দাবি করছেন, সরকার প্রতিটি বিষয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পাচ্ছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় আসার পর সব সরকারি নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সততা, মেধা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। এর ফলে সব ধরনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে অগ্রগতি হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি অবসরে যাওয়া ৭০ হাজার শিক্ষকের পাওনা দ্রুত পরিশোধ, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড বিতরণের মতো বিষয়গুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের অপশাসনের পরিণতিতে আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রশাসন পেয়েছি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিচক্ষণ ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সচিবালয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে অন্য সব কর্মদিবসে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সকাল থেকে অফিস করেন। সারাদিন ব্যস্ত সময় পার করেন। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের ভিত্তিতে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিপালনে প্রশাসন সহযোগিতা করছে। অপচয় রোধ ও দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রশাসন গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।’

তবে প্রশাসন পুনর্গঠন এবং ওএসডি সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নির্বাচনী এলাকায় থাকার কারণ দেখিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। ঢাকায় ফিরে সচিবালয়ে কথা বলবেন বলে জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত