নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে উত্তপ্ত দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান দুদিকে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করছে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনের ব্যাপারে অনড় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দেশের যখন এমন পরিস্থিতি, ঠিক তখনই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ফের সংলাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের সচিব জাহাংগীর আলম বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতির ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকে জানাতে এই সংলাপ করবে নির্বাচন কমিশন। নিবন্ধিত ৪৪টি দলের সঙ্গে আগামী শনিবার সংলাপে বসবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সকাল ও বিকেলে ২২টি করে ৪৪টি দলের সঙ্গে সংলাপে বসার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইসি সচিব বলেন, সংলাপের জন্য দলগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বা তাদের নির্ধারণ করা দুই প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানাবে নির্বাচন কমিশন। নিবন্ধিত সবগুলো দলকে দুই ভাগে সংলাপের জন্য ডাকা হবে।
এর আগে গত বছর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকে কমিশন। কিন্তু বিএনপি ও সমমনা দলগুলো তা বর্জন করে। আবার সংলাপের উদ্যোগ নিয়েও বিএনপি ও সমমনাদের সাড়া পায়নি আউয়াল কমিশন। পরে সংলাপে না আসা দলগুলোকে চিঠি দিয়েও জবাব পায়নি সাংবিধানিক সংস্থাটি। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আর কোনো সংলাপ করবে না বলে জানায় ইসি। নির্বাচন কমিশনাররা বিভিন্ন সময় বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানান। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে সড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সংবিধান অনুযায়ী সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন হতে হবে। বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৯ জানুয়ারি। হিসাব অনুযায়ী, ৯০ দিনের গণনা শুরু হবে আজ ১ নভেম্বর থেকে। আর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে। এ ছাড়া জানুয়ারির প্রথমার্ধে যেকোনো দিন ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হবে।
ইসির তথ্যানুযায়ী প্রায় সব ধরনের কাজ সম্পন্ন। নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখতে ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও বৈঠক শেষ হয়েছে। ডিসি-এসপিদের সঙ্গেও চলতি সপ্তাহে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। সাক্ষাতের কিছুদিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে সংসদ নির্বাচনের তফসিল।
তবে ইসির সংলাপের বিষয়ে আগ্রহ নেই বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর। এখনই কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে নারাজ বিএনপি। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহল কবির রিজভী বলেন, দলের হাইকমান্ড থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তারপর সংলাপের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
বাম জোটের সমন্বয়ক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে। তারা যদি এই সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে চায় তাহলে আমরা যাব না। আগে তাদের আমন্ত্রণপত্র আসুক তারপর আমরা জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত নেব। তবে না যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘তারা লোক দেখানোর জন্য এই সংলাপ ডেকেছে। ৪৪টি দলের সঙ্গে এক দিনে কী সংলাপ করবে। তবে বর্তমান ইসির সঙ্গে সংলাপে যাওয়ার মতো পরিবেশ নেই।’
তবে ইসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সহিংসতা ও সংঘাত এড়ানোর একমাত্র পথই হলো সংলাপ। চলমান রাজনৈতিক সংকটও সমাধান হবে সংলাপের মাধ্যমে। তবে ইসির এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বলেন, অনেক দিন পর হলেও নির্বাচন কমিশনের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে দুই দল দুদিকে অবস্থান করছে। দেশের সংঘাত-সহিংসতা বাড়ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য বা দেশের মানুষের জন্য মঙ্গলজনক নয়। ফলে কমিশনের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকেও একটু ছাড় দিতে হবে। তারা আগে আলোচন করুক। সেখান থেকে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সমাধান আসবে। নির্বাচনের সময় নানা ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতি সমাধানের একমাত্র পথ সংলাপ। এই সংলাপেও যদি কোনো দল না আসে তবে কমিশনের উচিত হবে আবার ডাকা। প্রয়োজনে এক দিনের জায়গায় আরও বেশি সময় নিতে পারে। দলগুলোর প্রধানদের সঙ্গে আলাদা আলাদা কথা বলতে পারে। এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত।
