খোলাবাজারে ডলারের রেকর্ড দর ১২১ টাকা

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:১৫ এএম

নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের ডলার বাজারে আবারও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কার্ব মার্কেট বা খোলাবাজারে নগদ এক ডলার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হয়েছে ১২০ থেকে ১২১ টাকা। যেখানে গত সপ্তাহে এক ডলার মিলত ১১৮-১১৯ টাকা।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, খুচরা ডলারের দাম ১১৪ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই ডলারের দর ১২১ টাকায় ওঠেনি।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাফেদা নতুন করে ডলারের মূল্য বাড়ানোর পর খোলাবাজারে নতুন রেকর্ড হলো।

ইতিমধ্যেই ডলারের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বেঁধে দেওয়া দরের অতিরিক্ত মূল্যে ডলার কিনতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এক ধরনের সম্মতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে কোনো কোনো ব্যাংক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫-৬ টাকা বেশি দিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে। এতে করে আগামীতে ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের আরও দাম বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর কাক্সিক্ষত এই ‘গ্রিনব্যাকের’ দাম ইতিমধ্যেই ৩৬ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে, যার প্রভাবে পণ্যমূল্য বেড়ে গিয়ে জনসাধারণের জীবনধারণ অসহনীয় করে তুলেছে।  

তথ্য বলছে, ২০২২ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশের ডলারের সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে সে সময় খোলাবাজারে ডলারের ১২০ টাকা দর ওঠে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার বিক্রিসহ নানা পদক্ষেপ নিলে তা কমতে থাকে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আবারও ডলারের দর ১২০ টাকায় পৌঁছে। কিন্তু এর আগে কখনো ১২১ টাকায় ডলার বিক্রি হয়নি।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ ও ডলার কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশিরভাগ মানি চেঞ্জারের কাছে ডলার নেই। যাদের কাছে আছে তারাও সরাসরি ডলার বিক্রি করছেন না। পরিচিত কারও মাধ্যমে ডলার বিক্রি করছেন। প্রতি ডলারে নিচ্ছেন ১১৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২১ টাকা। অর্থাৎ নগদ প্রতি ডলার কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ১২১ টাকা পর্যন্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব শেখ হেলাল সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মানি চেঞ্জারগুলোর ডলারের দাম বেঁধে দিয়েছে। এক্ষেত্রে কেনার দর ১১২ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রির দর ১১৪ টাকা। এ দামে কেউ ডলার পাচ্ছে না, তাই মানি চেঞ্জারগুলো এখন শূন্য হাতে বসে আছে। কেউ কি বেশি দামে ডলার কিনে কম দামে বিক্রি করবে?

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফলে ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু দর বেঁধে দেওয়াসহ বিভিন্ন কড়াকড়ির কারণে ডলার আবারও কালোবাজারিদের হাতে চলে গেছে। এখনই ডলারকে বাজারদরে ছেড়ে না দিলে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

রাজধানী ঢাকার মতিঝিল, দিলকুশা, পল্টন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মানি চেঞ্জারগুলোতে খুব একটা বেচাকেনা নেই। হাতেগোনা দুই-একটি মানি চেঞ্জারে অল্প লেনদেন হচ্ছে। তাদের দাবি ডলার নেই, তাই বিক্রি করতে পারছি না। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকেও একই অবস্থা। রাজধানীর মতিঝিল ও দিলকুশার অন্তত ৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় গিয়েও কোনো ডলার কিনতে পারেননি শাখাওয়াত আলম। পরে তিনি পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ একটি সরকারি ব্যাংকের শাখা থেকে ডলার কেনেন।

আর গুলশানের কয়েকটি ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করে ডলার কিনতে না পেরে একজন দালালের মাধ্যমে ডলার কিনেছেন রাশেদুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২টি ব্যাংক ও ৩টি মানি চেঞ্জারে গিয়ে ডলার পাইনি। পরে এক মানি চেঞ্জার থেকে একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই মোবাইলে যোগাযোগ করেই কাক্সিক্ষত ডলার পেয়েছি।’

ডলার সংকট ও বাজার স্থিতিশীলতার জন্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এবং আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করে আসছে ব্যাংকগুলো। এখন প্রবাসী আয় ও রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে প্রতি ডলারে ১১০ টাকা ৫০ পয়সা দাম দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। আর আমদানিকারকদের কাছে ১১১ টাকায় বিক্রি করছে। এছাড়া আন্তঃব্যাংক লেনদেনে দর দেওয়া হচ্ছে ১১৪ টাকা। যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে মাসে ২ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসবে, বাধ্যতামূলক তারা অন্তত ১০ শতাংশ আন্তঃব্যাংকে বিক্রি করবে।

রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি : বাজারে ডলারের সংকট কাটাতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভ থেকে ধারাবাহিক ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের চার মাসে এ পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল। আর আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) ডলার বিক্রি করেছিল ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ বর্তমানে ২ হাজার ৬৬ কোটি (২০ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন) ডলার। প্রকৃত রিজার্ভ আরও প্রায় চার বিলিয়ন ডলার কম যা প্রকাশ করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত