পঞ্চগড়

অবৈধ পাথর উত্তোলন, ভাঙনে বিলীন চা বাগান-ফসলি জমি

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:০২ পিএম

পঞ্চগড়ের তালমা নদীতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর পাড়ে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করছে কয়েকটি গ্রুপ। পাথর উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে চা বাগান, ফসলি জমি। এটি বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন স্থানীয়রা।

জানা গেছে, তালমা নদীটি পঞ্চগড়ের প্রধান নদী। নদী থেকে প্রতিদিনই পাথর উত্তোলন করছে দুর্বৃত্তরা। দৈনিক ১০ থেকে ১২টি দল পানি প্রবাহের গতিরোধ করে লাখ লাখ টাকার পাথর উত্তোলন করছে। নদীর প্রায় ৪০ ফুট নিচ থেকে গর্ত করে পাথর উত্তোলন করায় নদীতে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। ভাঙনে নদীগর্ভে বিলিন হচ্ছে চা বাগান ও ফসলি জমি।

এখনও হুমকির মুখে রয়েছে আরও অনেক চা বাগান, সুপারি বাগান, কবরস্থানসহ বনভূমি। নদী পাড়ের জমির মালিকদের বাধার পরেও থামেনি পাথর উত্তোলন।

সরেজমিনে সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জিয়াবাড়ি এলাকায় তালমা নদীতে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে ইজারাদারের লোকজন বালু তুলছেন। অপরদিকে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত নদী থেকে লোহার তৈরি ছেনি (জাকলা) দিয়ে পানির নিচ থেকে বালু তুলে গর্ত করছেন। এভাবে গর্তের ভেতর পাথর দেখা দিলেই বালু তোলা বন্ধ হয়। তখন আবার দুইজন পানির নিচ থেকে শক্ত জাল দিয়ে পাথর তুলে পানির ওপরে নিয়ে আসেন। এভাবেই দলে দলে বিভক্ত হয়ে দশ থেকে ১২টি দল পাথর উত্তোলন করছে।

এদিকে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত পালিয়ে যায়। কিছু পাথর উত্তোলনকারী ঘাটে চলে আসেন। তাদের কাছে জানতে চাইলে প্রথমে নদীর বালু মহালের ইজারাদারের নির্দেশে পাথর তুলছেন বলে জানান। তবে ইজারাদার বিষয়টি অস্বীকার করে।

পাথর উত্তোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তালমা বাজারের পরিবহন শ্রমিক নেতা জুয়েল ও স্থানীয় প্রভাবশালী হারেছ এসব পাথর উত্তোলনকারীদের সহযোগিতা করেন। তবে তারা দুজনেই বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

জুয়েল মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমি তালমা নদীর বিভিন্ন দলের কাছ থেকে ট্রাক্টর প্রতি সাড়ে নয় হাজার টাকা করে পাথর ক্রয় করি। আমার মতো অনেকেই তালমা নদীর পাথর প্রতিদিন দলগুলোর কাছ থেকে কিনে নেন।’

এদিকে হারেছ আলী বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কোনো পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই।’

জিয়াবাড়ি এলাকার মো. ফারুক জানান, আমাদের চার বিঘা  পারিবারিক কবরস্থান এখন নদী ভাঙনের মুখে। পাথর উত্তোলনের কারণে বর্ষা এলেই নদীতে ভাঙন শুরু হয়। তা ছাড়া পাথর পরিবহনের ট্রাক্টর থেকে পানি পড়ার কারণে আমাদের সড়কের বেহাল অবস্থা।

স্থানীয় চা বাগান মালিক হারুন জানান, ‘পাথর উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙনে আমাদের এক একর চা বাগান নদীগর্ভে চলে গেছে। আমরা বারবার পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে বলেছি, কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনেনি। অথচ পাথর উত্তোলনের জন্য কোনো অনুমোদন দেয়নি সরকার।’
 
আরেক চা বাগান মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, ‘শুধুমাত্র পাথর উত্তোলনের কারণেই বাঁশসহ এক বিঘা জমি নদীতে বিলিন হয়েছে। এভাবে জিয়াবাড়ি এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধ না হলে বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর পারিবারিক কবরস্থান, সুপারির বাগানসহ নানা ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যাবে। অতি দ্রুত পাথর উত্তোলন বন্ধ করার দাবি জানাই।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির হোসেন বলেন, ‘তালমা নদীতে পাথর উত্তোলনের খবর পেয়েছি। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন সভায় পাথর উত্তোলন এবং নদী ভাঙনের কথা উঠে এসেছে। নদী ভাঙনের বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সেই সঙ্গে অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত