রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসে নির্বাচন কমিশনের আদতেই কোনো অর্জন তো হলোই না; বরং কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা আরও স্পষ্ট হলো। এ ছাড়া নির্বাচনের যে অনুকূল পরিবেশ নেই, সেটাও পরিষ্কার হলো। কারণ খোদ সরকারি দলের নেতৃত্বাধীন শরিক দলের কাছ থেকেও শঙ্কার কথা শোনা গেছে।
এমন অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে সংকট সমাধানের আশা দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে সমঝোতা না হলে নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন আগের যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই থেকে যাবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত শনিবার নির্বাচনী প্রস্তুতি বিষয়ে আলোচনার জন্য নিবন্ধিত ৪৪টি দলকে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু দুই পর্বের আলোচনায় উপস্থিত হয়েছিল ২৬টি দল। এর মধ্যে একটি দল বলেছে, তারা ইসির প্রতি আস্থাহীনতার কথা জানাতেই আলোচনায় এসেছে। বাকি ১৮ দলের মধ্যে বিএনপি ও সমমনা দল ছাড়াও বামপন্থী কিছু দল আমন্ত্রণেই সাড়া দেয়নি; অর্থাৎ এই সরকারের অধীনে ইসি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করতে পারবে এমনটা তারা মনে করছে না। এ ছাড়া এই দলগুলো বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করছে।
যেসব দল ইসির সংলাপ বর্জন করেছে সেগুলো হলো বিএনপি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। আরও কয়েকটি দল নির্বাচন কমিশনের সংলাপে অংশ নেয়নি। এ ছাড়া বামজোটভুক্ত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ইসির সংলাপ বয়কট করেছে। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতো ইসলামী দলগুলো সংলাপ বর্জন করেছে। ইসির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া ২৬টি দলের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলগুলো বলেছে, নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ নেই। এ নিয়ে নিজেদের দ্বিধার কথা জানিয়েছে। কোনো কোনো দলের নেতারা বলেছেন, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছেন, অনুকূল হলে নির্বাচনে যাবেন।
আবার কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন, এর আগেও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ বা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি সাংবিধানিক এই সংস্থা।
ইসির আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মোমিনুল আমিন বলেন, ‘আমরা অনাস্থা জানাতে ইসিতে এসেছি। কারণ গত বছর তাদের ডাকে সংলাপে এসেছিলাম। আমাদের কিছু দাবিদাওয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সেই সংলাপের ফল কী তা আমরা এখনো জানতে পারলাম না। আমাদের কোনো প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়নি।’
বিশ্লেষকদের মতে, যারা নির্বাচন বয়কট করেছে তাদের নির্দিষ্ট কিছু দাবিদাওয়া ছিল আবার আলোচনায় আসা দলগুলোরও কিছু দাবি ছিল। কিন্তু গত দেড় বছরের বেশি সময় চলে গেলেও ইসির কাছে তা গুরুত্ব পায়নি। তা ছাড়া কয়েক দিনের মধ্যে তফসিলসহ নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়েছে কমিশন। এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ ইসির কাছে কতটা গুরুত্ব পাবে, সেটাও দেখার বিষয়।
ভোট নিয়ে বিবদমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ইতিমধ্যে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। মতভেদ নিরসনে সংলাপের তাগিদ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত এখনো মিলছে না।
এমন পরিস্থিতিতে এই সংলাপের মাধ্যমে কোনো ধরনের সফলতা আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তদের মতে, এই সংকট কাটাতে সমঝোতা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সংকট সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলো ছাড় দেওয়ার মনোভাব তৈরি করতে হবে।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন একটা সময় নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে বসেছে, যখন সারা দেশে একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এখন আর কেউ পরামর্শ দিতেও পারবে না। কমিশনও খুব একটা নিতে পারবে না।’ তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনও তাদের কাজ গুছিয়ে এনেছে। আলোচনায় সবাই সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা প্রত্যাশা করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট সমাধান না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কী করে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলকেই এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি মনে করেন, ৪৪টি নিবন্ধিত দলই যদি আলোচনায় আসত, তবে একটা সমাধান বের হতো। সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আগে এর সমাধান হওয়া উচিত।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিপপের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, মতভেদ নিরসনে কূটনৈতিক মহল থেকে সংলাপের তাগিদ এসেছে। ফলে গত শনিবার নির্বাচন কমিশন বৈঠকের আয়োজন করে। কিন্তু আলোচনায় যাদের প্রত্যাশা ছিল, তাদের হাজির করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। আবার যারা এসেছেন, তারা আগেও এসেছেন। সেখানেও একধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। ইতিবাচক কোনো সমাধানের ইঙ্গিত নেই। সংকট সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।
শনিবার আলোচনার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালও বলেছেন, ‘রাজনৈতিক যে সংকট রয়েছে তা নিরসন করার সামর্থ্য আমাদের নেই।’
গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্বভার গ্রহণ করে বর্তমান কমিশন। দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পরই নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকে কমিশন। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো তা বর্জন করে। ফের সংলাপের উদ্যোগ নিয়েও বিএনপি ও সমমনাদের সাড়া পায়নি আউয়াল কমিশন। পরে সংলাপে না আসা দলগুলোকে চিঠি দিয়েও জবাব পায়নি সাংবিধানিক সংস্থাটি।
