নির্বাসন-নির্বাচনের কঠিন সন্ধিক্ষণ

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৪৯ এএম

দলীয় আর নির্দলীয়-অদলীয় সব পেশাজীবীই এখন কম-বেশি রাজনৈতিক। দলের বাইরে সমাজ নয়, উপাসনালয়, দোকান বা শোরুমও নয়। কূটনীতিক-অর্থনীতিকরাও পুরোদস্তুর ব্যস্ত রাজনীতিক ক্রিয়া-কর্মে। তা দেশিরাও, বিদেশিরাও। বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগাদা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা স্পষ্ট। জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো নিরিবিলি স্বভাবের দেশগুলোও সম্প্রতি নীরবতা ভেঙে সরব। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের পাইকারি গ্রেপ্তারে উদ্বেগ ধরে রাখছে না তারা।

পরিস্থিতির অনিবার্যতায় সরকার তার প্রতিপক্ষকে ধরে-মেরে, নির্যাতনে-নির্বাসনে নিতে চায়, সেই বার্তাটি পরিষ্কার সবার কাছে। আপাতত সরকার এর বিকল্প দেখছে না। বিরোধী দলের সঙ্গে হিডেন আলাপ বা বোঝাপড়ার রাস্তাটাও বন্ধ করে দিয়েছে সজ্জন-আলাপি মানুষ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আলতাফ হোসেন চৌধুরীদের মতো নেতাদের জেলে পুরে। প্রধান বিচারপতির বাড়িতে হামলা, পুলিশ হত্যা, গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ নাশকতার মামলার আসামি করা হয়েছে তাদের। এমনিতেই কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। সেখানে এখন বিএনপি নেতাকর্মীতে গিজগিজ দশা। বাইরে যারা আছে তাদের দিয়ে কয়েকটি আলাদা বিএনপি বানানোর আয়োজনও চলছে। আসল বিএনপি, তৃণমূল বিএনপি, বিএনএ, বিএনএস ধরনের দল পয়দায় বরকত আসেনি। গোয়েন্দা অফিসে নিয়ে খানাপিনা করানোও তেমন ফল দেয়নি। জেলের বাইরে থাকা বাদ বাকি কয়েকজনকে এখন পাঁচতারকা হোটেলে নিয়ে দল ভাঙার ডার্টি গেমের খবর বেশ চাউর। সরকার বিএনপিকে নির্বাসনে রেখে একটি নির্বাচন তুলে আনতে চায়, তা পরিষ্কার। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বার্তা আরও পরিষ্কার। এক শতাংশ ভোট কাস্ট হলেও নির্বাচন আইনত বৈধ বলে জানিয়েছেন তিনি। এও বলেছেন, লেজিটিমেসির দিকে তারা যাবেন না। তারা থাকবেন বৈধতা ও সংবিধানের দিকে।

এসবের মধ্য দিয়ে সামনের নির্বাচনের ধরন মোটামুটি পরিষ্কার। লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এর একটা রিহার্সেল বা ড্রাই রান হয়েছে। লক্ষ্মীপুর-৩ সদর আসনে দিনের মধ্যভাগে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল মার্কা প্রার্থী মোহাম্মদ রাকিব এবং জাকের পার্টির গোলাপ ফুল মার্কা প্রার্থী সামসুল করিম ভোট বর্জন করেন। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রগুলো থেকে তাদের এজেন্টদের বের করে দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর লোকজন জাল ভোট দিয়েছে। প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো পাত্তা মেলেনি। তারা যে অভিযোগই করুক, আইনত এ নির্বাচন বৈধ। তার ওপর নিয়মরক্ষার বিষয়। এ বৈধতা হাসিল ও নিয়মরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের টাকা খরচের ঘটনাকে তামাশা বলা আইনত শোভন নাও হতে পারে। এ দুজন ব্যক্তি মহান সংসদের মাননীয় হবেন। শপথ নেবেন, নামের সঙ্গে এমপি যোগ করবেন। কিছু প্রিভিলেজ ভোগ করবেন। সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে পারবেন না। কারণ চলতি সংসদের আর কোনো অধিবেশন বসবে না। শৈশবের কলাপাতা বা কচুপাতার ঘর বানিয়ে সংসার সাজানোর খেলার সঙ্গে বেশ মিল। কিন্তু বৈধ। লাজশরম, লেজিটিমেসিতে যায়-আসে না। লজ্জায় ফ্রিজারমেটিভ মাখা।

এই সার্কাস ও ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পটভূমিতে ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন। ২৮ অক্টোবর বিরোধী দলের সমাবেশের দিন সংঘর্ষে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর দুর্ভাগ্যের ট্রেন্ড বেশ পরিচিত বাংলাদেশে। মানুষ এতে বিরক্ত। অসাধারণদের কথা আলাদা। তারা মাননীয়, মান্যবর, বিশিষ্ট্য ইত্যাদি। কিন্তু এই দৃশ্যমান অচলাবস্থার বাইরে এমন এক আন্দোলন হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর ও প্রসারিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিএনপি দমন-পীড়ন সহ্য করে নিজেদের অসহায়ত্ব জানিয়ে দিয়েছে দেশে-বিদেশে। সরকার জানিয়েছে তার সক্ষমতার কথা। কাউকে কেয়ার না করার বার্তা দিয়েছে পুরোটাই। বিরোধী দল সহিংসতা কিংবা সংহতিনাশ করছে বলে তাদের টার্গেট করা বাস্তব হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, বিরোধী শিবিরে বলপ্রয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান হতাহতের ঘটনা বিএনপির ওপর দলের শীর্ষনেতা তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেবে। এ ধরনের পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য তারেককে ঢাকায় ফিরে যেতে এবং কারাভোগের সম্মুখীন হতে প্রভাবিত করতে পারে অথবা চিরকালের জন্য নির্বাসনের অবজ্ঞার জন্য নিন্দিত হতে। এ সরল হিসাবের উল্টোদিকও আছে। সরকারই ফেঁসে যাচ্ছে কিনা সেই আলোচনাও আছে। এত সিসিটিভি, এত আড়িপাতার যন্ত্র, এত নজরদারি, এত গোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যে প্রধান বিচারপতির বাসায় কারা হামলা করে, এত বাস কে পোড়ায়? সেগুলো কি অশরীরী আত্মা? এসব প্রশ্নের ফয়সালা আগামীতে কোন চোখ-চশমা দিয়ে হবে, সেই কানাঘুষাও আছে। যদিও সরকার বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে নিয়ে কিছু ভিডিও ক্লিপ দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এগুলো বিএনপির কাজ। চেষ্টা করেছে দলটিকে অগ্নিসন্ত্রাসীর বিশেষণটি জাস্টিফাই করতে।

বিদেশিরা এসব ফুটেজ দেখে তাজ্জব হয়ে গেছে বলে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে সরকার থেকে। বলা হয়েছে, তাজ্জব হয়ে যাওয়ায় বিদেশিরা কোনো প্রশ্ন পর্যন্ত করেনি। এর বিপরীতে বিদেশি কূটনীতিকদের সেদিনের বডি লেঙ্গুয়েজ ও মিটমিটে হাসিতে অন্যটা বোঝার ব্যাপারও আছে। সরকারের ডাকে ভিডিও ক্লিপ দেখতে আসার আগে সাত দেশের কূটনীতিকরা সরকারকে সহিষ্ণু হওয়ার বিবৃতি দিয়েছে। বলেছে, আলাপ-আলোচনায় সুষ্ঠু-অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে। সরকার এসব ডাক-দোহাইকে পাত্তা বা আমল দেওয়ার জায়গায় আর নেই। সরকারের যাবতীয় অ্যাটেনশন বিএনপি বধের কাজে। এ কাজে অবিরাম সাফল্যও দেখছে। গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণে ওয়াশিংটন ডিসি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অনবরত চাপের মধ্যে অর্থনৈতিক পতনকে আটকাতে কতটা সক্ষম হবে সরকার? বিএনপিকে দমন বা নিয়ন্ত্রণে সরকার যে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে, আলু বা পেঁয়াজ সিন্ডিকেটকে তার একরত্তিও পারেনি। এতেও কোনো সমস্যা বা সংকট হবে বলে ভাবছে না সরকার। সরকারের যাবতীয় ভাবনায় নির্বাচন তুলে নেওয়া, সেই নির্বাচনে বিশাল বিজয় দেখানো। গত অর্ধশত বছরে ভোটের বহু মডেল প্রদর্শন হয়েছে বাংলাদেশে। এখানে গণতন্ত্রের বহু মারপ্যাঁচ। একদলীয়, দ্বিদলীয়, কয়েকদলীয়, বহুদলীয় ইত্যাদি। ভোট আর নির্বাচনেরও এন্তার রকমফের! নামও অনেক। সুষ্ঠু নির্বাচন, নিরপেক্ষ নির্বাচন, অবাধ নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ভোটেরও নানা নাম চিহ্ন। ভোট ক্যু, মিডিয়া ক্যু, বাক্স লুটের ভোট, হাঁ-না ভোট। সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূলসহ কারচুপিরও নানান কলসাইন। মাগুরা, মিরপুর, ১৫ ফেব্রুয়ারি, বিনা ভোট, রাতের ভোট ইত্যাদি। সালশা নির্বাচন নামও আছে। সামনে অপেক্ষা করছে কোন মডেল?

সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-অবাধ-গ্রহণযোগ্য-আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ইত্যাদি বিশেষণযুক্ত নির্বাচনের কড়া তাগিদ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বিশে^র। কিন্তু সেই ভোটের ধরন সম্পর্কে ধারণা এখন পর্যন্ত একেবারেই অন্ধকারে। কেমন হবে সেই মডেলটা, যা দেখার বাকি আছে? যা আর হয়নি বাংলাদেশে? ১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে একটি মডেল দেখেছে মানুষ। ব্যালট বাক্স লুট থেকে শুরু করে দলের প্রায় সব প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণার নির্বাচনের ওই মডেল ভোটের জন্য আজীবন সংগ্রামী বঙ্গবন্ধুর ইমেজে চরম আঘাত হানে।  খাসপছন্দের খন্দকার মোশতাককে (পরবর্তী নাম খুনি মোশতাক) জয়ী দেখাতে ব্যালট বাক্স কুমিল্লা থেকে ঢাকা এনে অধিকতর সঠিক ফলাফল দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে হাঁ-না ভোট, আওয়ামী লীগকে নৌকা-মই ইত্যাদি ৪ ভাগে সিট বণ্টনসহ নানা মডেল শো। এ শোতে আরও নতুনত্ব আসে জেনারেল এরশাদ জমানায়। নির্বাচনের এই সিরিজ মডেল শোতে প্রথম ব্যতিক্রম আসে এরশাদ পতনের পর ৯১-তে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকার আমলে। স্বাধীন দেশে প্রথম স্বাধীন নির্বাচনের স্বাদ পায় মানুষ। তবে ওই নির্বাচনে হেরে যাওয়া আজকের ক্ষমতাসীনদের কাছে সেটি ছিল সূক্ষ্ম কারচুপির মডেল। এর মাঝেই গণ্ডগোল পাকে তখনকার বিএনপি সরকারের মাগুরা ও মিরপুর উপনির্বাচনী মডেলে। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি মডেল। তারপর বিচারপতি হাবিবুর রহমান, লতিফুর রহমান, ফখরুদ্দিনদের তত্ত্বাবধায়ক জমানায় নির্বাচনের মোটামুটি একটি মডেল চলতে থাকে। এরপর শুরু হয় বাংলাদেশে নির্বাচনী নাশকতা। হতে হতে ২০১৮ সালে এসে দিনের ভোট রাতে সেরে ফেলার নতুন মডেল গড়ার অভিযোগ।

এর আগে, ২০১৪ সালে বিনা ভোটেই ১৫৪ জনকে জয়ী ঘোষণার রেকর্ড। যারা এখন মডেল নির্বাচনের ওয়াদা শোনাচ্ছেন তারা একবারও বলছেন না ১৪ বা ১৮ সালের মডেলটি ঠিক ছিল না। বরং ১৫৪ জনকে বিনা ভোটে পাসের পক্ষে জোরালো যুক্তি তাদের। ২০১৮ সালে রাতে ভোট হয়নি, রাতের ভোটের কোনো প্রমাণ নেই বলে দাবিও করছেন। এ অবস্থায় তারা এবার কোন মডেল দেখাবেন, তা কেবল বিরোধী দল নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও প্রশ্নবোধক। প্রধান নির্বাচন কমিশনার গ্যারান্টি দিয়ে বলছেন, এবার আর দিনের ভোট রাতে হতে দেওয়া হবে না। তার আগের জনের অঙ্গীকার ছিল ১৮ সালে ১৪ সালের মতো বিনা ভোটে ১৫৪ জনকে পাস করতে দেবেন না তিনি। কথা রেখেছেন, বিনা ভোটে এমপি হওয়া কমিয়েছেন। কিন্তু ভোট রাতে এগিয়ে এনেছেন। আশা বা ধারণা করা যায়, ২৪-এর নির্বাচনে বর্তমান সিইসি তার ওয়াদা মতো রাতের ভোটের রেকর্ড ভাঙবেন, ভোটের কাজটি দিনেই করাবেন-করবেন। কিন্তু সেটা নতুন কোন মডেলে?  

বাস্তবতা এখন অন্যরকম। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো ভোটকাণ্ড এবার সম্ভব হবে না বলে ধারণা অনেকের। ধারণাটা কারও কারও কাছে বিশ্বাসের পর্যায়ে। এমন ধারণা ও বিশ্বাস অনেক কারণে। চলমান স্নায়ুযুদ্ধের এ সময়ে একতরফা কিছু করার সুযোগ এখন রুশ-উত্তর কোরিয়ার মতো কিছু দেশ ছাড়া আর কোনো দেশের নেই। গোটা দুনিয়ায় উদাহরণসহ শত্রু-মিত্রের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। কোথাও কোথাও শত্রুই বন্ধু, বন্ধুই শত্রু। অথবা গতকালের বন্ধু আজ শত্রু। সেই হিসেবে বাংলাদেশের সামনের নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। নানা কারণে অনেকের চোখ বাংলাদেশের সামনের নির্বাচনের দিকে। গাজীপুরের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনও এখন কেবল জাতীয় নির্বাচন নয়, আন্তর্জাতিক কোনো নির্বাচনের কাছাকাছি। ভৌগোলিক, ভূ-রাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, রাশিয়া, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশেরই চোখ বাংলাদেশের ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিকে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত