৫০ টাকার দ্বন্দ্বে ট্রাক পোড়ানো মামলার আসামি যুবলীগ নেতা 

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:৩৮ পিএম

ফেনীতে আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যকার আধিপত্যের লড়াইয়ে আওয়ামী লীগই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিজেদের বিরোধের কারণে জেল-জুলুম ও অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরই। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও ফেনীতে আধিপত্যের রাজনীতির লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।

গত ৫-৭ বছরের বিভিন্ন ঘটনায় বলছে, জামায়াত-বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরাই বেশি জেল-জুলুম ও অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রয়াত যুবলীগ নেতা আজহারুল হক আরজু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও একাধিকবার কারাভোগ করেছিলেন। আরজু কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, এমন অভিযোগও আছে।

সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগই। বরং বিএনপি-জামায়াত নিরাপদ। 

জানা গেছে, আধিপত্যের রাজনীতির রোষানলে পড়ে ফেনী জেলা যুবলীগের সাবেক নেতা সাখাওয়াত হোসেন নিজ বাড়িতে যেতে পারেন না। এর আগে বাড়িতে গেলেও হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালে ফেনীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন জনপ্রিয় যুব নেতা একরাম হোসেন। ফেনী জেলা শহরের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে গাড়িতে গুলি করে ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন এই সভাপতিকে। এই ঘটনায় ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন জিহাদসহ ৩৯ জনের ফাঁসির রায় হয়েছে।

আওয়ামী লীগের মধ্যকার আধিপত্যের রাজনীতি সর্বশেষ বলি হলেন, নুরুল উদ্দীন টিপু। প্রয়াত নেতা জয়নাল হাজারীরর স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হিসেবে টিপু ১৯৯৬ সালে দায়িত্বপালন করেন। টিপু ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। 

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগ নেতা টিপু ২০১৪ সালে বিরোধী দলের নাশকতা ও জ্বালাও-পোড়াও ঠেকাতে কর্মীদের নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বিএনপি-জামায়াতকে দমাতে তার বড় ভূমিকা ছিল।

পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত টিপু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টিকতে না পারায় এক প্রভাবশালী নেতার নির্দেশে বিএনপির সঙ্গে আতাঁতের অভিযোগসহ নাশকতার মামলায় এখন আসামি হয়ে কারাগারে আছেন। তিনি ফেনী সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি। 

বিএনপির প্রথম দফা অবরোধ তৃতীয় দিন গত ২ নভেম্বর ভোররাতে নোয়াখালীর চৌমুহনীগামী চিনির ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। এই ঘটনায় করা দুর্বৃত্তদের কাউকে ধরতে সমর্থ না হলেও ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা টিপুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ফেনী জেলার পুলিশ সুপার মো. জাকির হাসান দাবি করেন, সরকার দলের সহযোগী সংগঠনে নেতা হলেও পুলিশের কাছে গোপন সংবাদ রয়েছে টিপুর সঙ্গে বিরোধীদলের আঁতাত রয়েছে।

তবে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার নির্দেশে ওই মামলায় টিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সূত্রগুলো বলছেন, এ ঘটনায় ব্যক্তি টিপুর ক্ষতি হলেও রাজনীতির এ উত্তাল সময়ে আওয়ামী লীগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিএনপি দেশ-বিদেশে এই ঘটনা প্রচার করে আওয়ামী লীগকে দোষ দেওয়ার সহজ অস্ত্র হাতে পেয়েছে। বিএনপির প্রচার সেল টিপুর ঘটনাটি সামাজিক সব যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে সুবিধা নিতে শুরু করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরাই নাশকতা করছে।  

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সনদ নিয়ে টিপুর সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে ধলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার আহম্মেদ মুন্সীর সঙ্গে। আনোয়ার মুন্সী ধলিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতিও। টিপু নিজের জন্য চেয়ারম্যান সনদ আনতে ধলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন গ্রাম পুলিশের সদস্য জিনুকে। 

গত ২৩ অক্টোবর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে জিনু সনদ নিয়ে আসার সময় তার কাছে ৫০ টাকা দাবি করা হয়। সনদটি টিপুর- এ কথা জানিয়ে জিনু চলে আসতে চাইলে তাকে আটকে টাকা দিতে বাধ্য করেন পরিষদ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি যিনি সনদ দেন, তিনি টিপুকে চিনেন না বলে জানান। এরপর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেন টিপু। এ নিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে টিপুর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এর আগেও ধলিয়া ইউনিয়নের একটি জমি নিয়ে বিরোধ ছিল দুজনের মধ্যে।

স্থানীয় লোকজন জানান, টিপুর এক আত্মীয়ের জমি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার মুন্সী। ফেনীর এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে জমি দখল করতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়ান টিপু। 

এই ঘটনার জের ধরে টিপুর বিরুদ্ধে প্রভাবশালী ওই নেতাও অবস্থান নেন জানিয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, প্রথমে টিপুকে গত অক্টোবরের মাঝামাঝি কোনো কারণ ছাড়াই সংগঠন থেকে মৌখিকভাবে বহিষ্কার করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার করানোর পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা অংশ হিসেবেই চিনির ট্রাকে আগুন দেওয়ার মামলায় টিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানায়, ওইদিনের আগুনের ঘটনায় চেয়ারম্যান আনোয়ার মুন্সী সদর থানার ওসির কক্ষে গিয়ে ঘণ্টাব্যাপী কথা বলেন। পুলিশকে বুঝিয়ে টিপুকে ওই নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, গত ১ অক্টোবর ধলিয়া ইউনিয়নের সোমবারিয়া বাজারে টিপুর হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে নাটক সাজিয়ে তিনি টিপুকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছেন।

টিপুর ভাই পিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফেনীর রাজনীতির ‘নিয়ন্ত্রক বাহিনীর’ ইশারায় টিপুকে আসামি করা হয়েছে। ধলিয়া এলাকার একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্যই চেয়ারম্যান টিপুকে ফাঁসিয়েছে। 

জানতে চাইলে ধলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনেয়ার আহম্মেদ মুন্সী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টিপু আমার নিজের লোক। তার সঙ্গে আমার কখনো দূরত্ব ছিল না। তবে শুনেছি টিপু সরকার বিরোধীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো সে বিষয়ে আমরা অবগত নই।’

ফেনী মডেল থানা পুলিশের ওসি মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘টিপুর গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তাকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তার জড়িত থাকার বিষয়ে পুলিশের তদন্ত চলছে।’

ফেনী সদর উপজেলা যুবলীগ সভাপতি নুরুল আবছার আপন দাবি করেন, টিপুর বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সঙ্গে আঁতাতের তথ্য পাওয়া গেছে। যে কারণে টিপুকে গত ২৭ অক্টোবর সদর উপজেলা যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অগ্নিসন্ত্রাসে ফেনী যুবলীগের একজন পদধারী নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কারণে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আপন বলেন, ‘কারও খারাপ কাজের দায়িত্ব দল নেবে না।’

টিপুকে ২৭ অক্টোবর দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাকে গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য কোথাও প্রকাশিত হয়নি কেন, এ প্রশ্নে যুবলীগ নেতা বলেন, ‘এটি গোপনীয়তার বিষয় নয়। কেউ জানতে চাইলে আমরা জানিয়েছি। এ বিষয়ে আগেই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। হয়তো ওইভাবে প্রচার হয়নি।’

জেলা যুবলীগ সভাপতি দিদারুল কবীর রতন বলেন, জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী নেতার নির্দেশে টিপুকে বহিষ্কার করা হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভালো বলতে পারবে। 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত