এক বিরলপ্রজের পদরেখা

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:২৫ এএম

বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি চর্চাকে যারা জনপ্রিয় করে তুলেছেন তাদের পুরোধা গোলাম কাসেম। গোলাম কাসেম ড্যাডিকে শুধু আলোকচিত্রশিল্পী বা আলোকচিত্র আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে একরৈখিক পরিচয় মূল্যায়ন করলে চলে না। তিনি শুধু আলোকচিত্রী নন। তিনি আলোকচিত্র সংগঠক, গল্পকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক, প্রাবন্ধিক। এ দেশের আলোকচিত্র বিষয়ক প্রথম সংগঠন ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা যেমন তিনি তেমনি প্রথম আধুনিক বাঙালি মুসলমান গল্পকারও তিনিই। ড্যাডি ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক, পরে হয়েছিলেন সরকারি চাকুরে। একদিকে যেমন জীবনের নানা চড়াই-উৎড়াই দেখার ফলে অভিজ্ঞতার ভা-ার পূর্ণ হয়েছিল তেমনি কৈশোরেই ফটোগ্রাফির মতো শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় শৈল্পিকভাবে তা প্রকাশে হয়ে উঠেছিলেন সিদ্ধহস্ত, তা সে আলোকচিত্রেই হোক বা লেখনীতে। তার লেখালেখি কিন্তু শুধু গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিচিত্র বিষয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধের সঙ্গে চিঠি লেখাতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তার সুনিপুণ লেখনীতে চিঠিগুলো হয়ে উঠেছে রসময়। একাধিক ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হওয়ার কারণে অনুসারীদের কাছে তিনি পিতৃবৎ ‘ড্যাডি’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিঃসন্তান গোলাম কাসেমের মনের শূন্যতা পূরণের আকুতিও ছিল নিশ্চয়ই প্রীতিভাজনদের। কারণ যা-ই হোক, উপাধি বা সম্বোধনটি অত্যুক্তি ছিল না। যারা জীবদ্দশায় ‘ড্যাডি’কে পেয়েছেন, তার পরশপাথর স্পর্শ পেয়েছেন তারা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। দেশের আলোকচিত্র জগতের নক্ষত্র হিসেবে প্রমাণিত প্রায় সবাই ছিলেন তার গুণগ্রাহী, অনুরাগী, ছাত্র। তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান গল্পকার। অথচ তার নেই কোনো প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। ফটোগ্রাফি ছিল ড্যাডির ধ্যানজ্ঞান, জীবনযাপনের অঙ্গ। ক্যামেরা পাশে নিয়ে ঘুমাতেন তিনি। ফটোগ্রাফির প্রতি এহেন পক্ষপাতের জন্যই হয়তো ফটোগ্রাফি বিষয়ক লেখালেখিগুলো একসঙ্গে করে বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন। এ সংক্রান্ত তার বইয়ের সংখ্যা তিনটি। জীবদ্দশায় প্রকাশ পায় ‘ক্যামেরা’ ও ‘এক নজরে ফটোগ্রাফি’। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় ‘সহজ আলোকচিত্রণ’। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তার লেখা গল্পগুলো এক মলাটে নিয়ে আসার কোনো চেষ্টা তিনি করেননি। তবে কি প্রথম বাঙালি মুসলমান গল্পকারের গল্পগুলো হারিয়ে যাবে? ড্যাডির আলোকচিত্র বিষয়ক বইগুলোও এখন বাজারে নেই। সেই বইগুলোরই বা ভাগ্যে কী আছে? এসব প্রশ্ন মনে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু যারা একটু খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন ড্যাডির গল্প, প্রবন্ধ, বইগুলোর অনুলিপি এবং ড্যাডিকে নিয়ে তার গুণমুগ্ধদের স্মৃতিচারণ নিয়ে চার খন্ডের ‘ড্যাডিসমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে ঢাকার স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘পাঠক সমাবেশ’ থেকে। যে লেখা লেখক স্বয়ং একত্র করে যাননি, মহাকালের পোড়া ছাইয়ের ভেতর থেকে এই অমূল্য রতন খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিয়েছেন গবেষক, সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ। নিজের জেলা বিক্রমপুরের ইতিহাস উদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। সেই একই দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রথম বাঙালি মুসলমান আলোকচিত্রশিল্পী ও গল্পকারের রচনাসমগ্র সম্পাদনায় সমর্পিত হয়েছেন।

গল্পকার হিসেবে গোলাম কাসেম আধুনিক ঘরানার। দৃশ্যের বর্ণনা যেমন আবহকে মূর্ত করে তোলে তেমনি মূর্ত হয়ে ওঠে চরিত্রের মানসিক অবস্থাও। তার গল্পের বিষয়বস্তু নারী, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, রোমাঞ্চ, অভিযান ইত্যাদি। লক্ষণীয় যে তার গল্পের চরিত্ররা একই বৃত্তে আবদ্ধ থাকে না। তারা সমাজের সব শ্রেণির। সমাজের সব স্তরে বিচরণ না থাকলে এই বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের চরিত্রকে মূর্ত করে তোলা সম্ভব না-বলাই বাহুল্য। ড্যাডি এমন এক সমাজের গল্প বলছেন যে সমাজের গল্প সেই সমাজের কেউ এর আগে বলেনি। ফলে তার সামনে অনুকরণীয়, অনুসরণীয় বা অতিক্রম করে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না। দুর্গম অচেনা পথে নিজের মতো করে পথ তৈরি করে চলতে হয়েছে। ড্যাডি যখন গল্প লিখছেন তখন যে সব মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা ছিল সেখানে প্রকাশিত গল্পে নারী চরিত্রের দেখা পাওয়া যেত না। ড্যাডি প্রথম থেকেই নারী চরিত্রকে চিত্রায়িত করলেন, প্রথম থেকেই নরনারীর জৈবিক সম্পর্ককে শৈল্পিকভাবে চিত্রায়ণ করলেন। তিনি রক্ষণশীল সমাজের চোখ রাঙানিতে টলে যাননি। এ কথা বিবেচনায় নিলে প্রথম বাঙালি মুসলমান গল্পকারের হাতে সাবালক অবস্থায়ই জন্মগ্রহণ করেছিল বাঙালি মুসলমানের কথাসাহিত্য। কেমন ছিল সে সময়ের সমাজ ও সাহিত্য প্রতিবেশ তা জানার এক দুর্লভ উৎস হয়ে আছে ড্যাডিসমগ্রের গল্পখ-টি। নবীন আলোকচিত্রীর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত যে প্রশ্ন শুনতেন সেগুলোর উত্তর দিতে চেষ্টা করেছেন তার লেখাগুলোর মাধ্যমে। নিজের অর্জিত জ্ঞান অন্যদের জানিয়েছেন আলোকচিত্র বিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে। আলোকচিত্র কি শিল্প নাকি নেহাত কেজো জিনিস তা নিয়ে বিতর্ক ছিল এই কিছুদিন আগেও। গোলাম কাসেম ড্যাডি এ বিষয়েও রেখেছেন নিজের মত, তার মননশীল লেখার মাধ্যমে। যৌক্তিকভাবে তিনি তুলে ধরেছেন নিজের অবস্থান। জ্ঞান অর্জনে যেমন ক্লান্তি ছিল না ড্যাডির তেমনি ছিল না তা বিতরণেও। তার আরেকটি প্রমাণ হলো বিবিধ অংশে যুক্ত হওয়া ড্যাডির লেখা ‘শিকার’ নিবন্ধটি। এই বইগুলোতে ধরা পড়ে ড্যাডির সৃজনশীলতা, মননশীলতা এবং বিচিত্র বিষয়ে তার জানাশোনার পরিধি।

‘ড্যাডিসমগ্র’-এর তৃতীয় খন্ডে সংকলিত হয়েছে তাদের স্মৃতিচারণ, মূল্যায়ন; কে নেই এদের মধ্যে? আছেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, গোলাম মুস্তাফা, শহিদুল আলম, নাসির আলী মামুন প্রমুখ। তাদের লেখনীতে পরের প্রজন্মের কাছে মূর্ত হয়েছেন ড্যাডি।

দুর্জনেরা বাঙালিকে বলে বিস্মৃতপ্রবণ জাতি। সে নাকি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথার্থ সম্মান জানাতে জানে না। কথাটি শতভাগ মিথ্যে নয়। এজন্যই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সতর্ক করেছেন, ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না’। কিন্তু গোলাম কাসেম ড্যাডির জীবন ও কর্মকে তুলে ধরার জন্য ‘ড্যাডিসমগ্র’র বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখলে মনে হয়, বাঙালি জাতিও গুণী ও গুণের সমাদর করতে শিখছে। আর তাই আমরা ভবিষ্যতে ড্যাডির মতো এমন বিরল প্রতিভাসম্পন্ন গুণীর আবির্ভাব প্রত্যাশা করতেই পারি। ‘ড্যাডিসমগ্র’ পাঠ ও অধ্যয়ন এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

ড্যাডিসমগ্র (৪ খ-) ॥ সম্পাদক : সাহাদাত পারভেজ॥  প্রকাশক : পাঠক সমাবেশ॥ মূল্য : ৪০৮০ টাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত