বুকে পাথর বেঁধে ম্যাক্সওয়েলকেই আগে রাখব

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:১২ এএম

হেড টু হেড ম্যাচের মতো সরাসরি। চল্লিশ বছর আগের কপিল দেবের ১৭৫ বনাম গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের টাটকা ২০১।

কপিল দেব তার নিজের কী মনে হয়? উত্তর দেওয়ার মতো জায়গায় তিনি নেই। মঙ্গলবার রাতে ম্যাক্সওয়েলের মহাজাগতিক বিস্ফোরণ যখন ওয়াংখেড়ে মাঠে হচ্ছিল তার তিরাশির বিশ্বকাপজয়ী দলবলসমেত কপিল দিল্লির হায়াত হোটেলে সংবর্ধনা নিতে ব্যস্ত ছিলেন। মোবাইলে বন্ধু সাংবাদিক তাকে ম্যাচের স্কোর জানিয়ে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত। অল্প সময় নিজের ফোন বের করে হট স্টারে দেখছিলেন কপিল। কিন্তু সেটাকে ঠিক দেখা বলে না। সেই সংবর্ধনায় ছিলেন না অথচ ইনিংসটা স্বচক্ষে দেখেছেন এমন এক টিম সদস্য সন্দীপ পাটিল ছিলেন মুম্বইয়ে। ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকায় দিল্লি আসতে পারেননি। কিন্তু তিনিও ম্যাচের এক বল দেখেননি।

অদ্ভুত পরিস্থিতি। বিবিসি টিভির স্ট্রাইক আমাদের এবং পরের প্রজন্মকেও সেই ইনিংস দেখতে দেয়নি। যারা মাঠ বা ড্রেসিংরুম থেকে দেখেছেন, সেই শ্রেণি আবার কালকের ম্যাচ দেখেনি।

ভারতীয় ক্রিকেটে বছরের পর বছর এই ইনিংস নিয়ে এত বিরামহীন আলোচনা। অথচ ২০১৯-এর আগে হৃদয়ঙ্গমই করতে পারিনি সেই ইনিংসটার এক্স ফ্যাক্টর কোথায় লুকিয়ে? সেবার বিশ্বকাপের মাঝে টানব্রিজ ওয়েলস মাঠে পা দিয়ে প্রথম বুঝতে পারি যে এত বছর ধরে কপিল দেবকে নিয়ে লেখালেখি সব বেকার। তাকে বুঝতে হলে এই হিংস্র ইংরেজ মাঠটায় অনেক আগে সরেজমিন পৌঁছানো উচিত ছিল। ভাবাই যায় না বিশ্বকাপের মাঠ এমন খোলা হতে পারে। গ্যালারির বালাই নেই। খোলা মাঠে দুই ধার থেকে এমন হাওয়া বইছে আর আঙিনার মধ্যেও এমন হিংস্র বাতাবরণ যে অনুভূতিকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। টানব্রিজ ওয়েলস চকলেটের জন্য বিখ্যাত। রানী এলিজাবেথ নাকি এখানে আসতে এবং চকলেট খেতে খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু ব্যাটসম্যানের জন্য কোনো চকলেটের ব্যবস্থা নেই; বরং রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের বাদশাহী আংটি বর্ণিত ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার। এমন সিমিং ট্র্যাক আর ওই হাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বিষাক্ত মাকড়সার মতো এক কামড়ে মৃত্যু।

মাঠের ধরে দাঁড়িয়ে ভাবার চেষ্টা করেছিলাম একটা টিম বিশ্বকাপের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি। তার ক্যাপ্টেন মাঠে নেমে শুধু পাঁচ উইকেটে ১৭ দেখছে না। দেখছে বল কী অসম্ভব বাঁক নিচ্ছে। এক হাতের মতো সিম করছে। লর্ডসে এমন উইকেটই ভারতকে চুয়াত্তরে সামার অব ফর্টি টু দেখিয়েছিল। সুচিত্রা সেনের গলায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গান এ শুধু গানের দিন। কপিল দেবের তেমনি মনে হওয়া উচিত ছিল ব্যাটার হিসেবে এ শুধু আত্মসমর্পণের দিন।

সেখান থেকে যে লোক ১৩৮ বলে অপরাজিত ১৭৫ করে। সেই বিপদ কণ্টকিত হাইওয়েতে ছটা ছক্কা এবং ষোলোটা চার মারে, সে এবং তার ইনিংস তো ক্রিকেটের মহা সৌন্দর্যময় বাগানে লিলি হয়ে চিরকালীন ফুটবেই। ইনিংসের ১০০ রান চার-ছয়ে। আর সেটা কিনা এমন উইকেটে, যেখানে গাভাসকার-মোহিন্দরেরা প্রায় বল ছোঁয়াতে পারেননি। সাধে কি গাভাসকার বলে যান তার জীবনে দেখা সেরা ওয়ানডে ইনিংস। কী থিম সেই ইনিংসের? না পাতালগামী বিপন্নতা থেকে শৌর্য শিখরে আরোহণ। রোজ রোজ হবে না। একই লোক তার বাকি পড়ে থাকা এগারো বছরে নিজেও কখনো পারেনি।

চল্লিশ বছর পর কিন্তু মনে হচ্ছে বিশ্বকাপের বিলিভ ইট অর নটের চিত্রগুপ্তের খাতায় টানব্রিজকে ছাড়িয়ে সামান্য আগে বসল ম্যাক্সওয়েলের ২০১। সাত উইকেটে ৯১ এবং ম্যাচ প্রেডিক্টরে ৫ পার্সেন্ট জয় সম্ভাবনা থেকে রান ২৯২তে নিয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে আরও কষ্টসাধ্য। কপিলের চেয়ে ১০ বল কম খেলে বাড়তি ২৬ রান করেছেন বলে নয়, রান তাড়া করে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাওয়া বাড়তি চাপ বলে নয়, জীবজগতে ক্রিকেট সম্পর্কে ন্যূনতম আগ্রহ যাদের আছে তারাও জেনে গেছে কী অসীম শারীরিক বিশৃঙ্খলাকে অগ্রাহ্য করে ম্যাক্সওয়েল তার আদিদৈবিক ইনিংসটা খেলেছেন। বারবার ক্র্যাম্প ধরছিল। আদ্ধেকটা সময় এক পায়ে। দৌড়াতে পারছেন না। তা-ও রানার নেওয়ার উপায় নেই। এক হাত এবং এক পায়ে তার ইনিংসকে দুর্দান্ত কী করে বলি? দুর্দান্ত তো নিরন্তর ব্যবহার হতে হতে ধুলো আর কোভিদে মাখামাখি একটা শব্দ।

ম্যাক্সওয়েলেরটা গ্রহান্তরের।

লোকে প্রশংসা করবে তো পরে। প্রথমে বিস্ফারিত হয়ে বলেছে ওয়াও। সম্ভব? চব্বিশ ঘণ্টা বাদেও দেখছি হ্যাংওভারটা যায়নি। একজন মানুষ যার দিনদশেক আগে গলফ কোর্ট থেকে পড়ে কঙ্কাশন হয়ে গিয়েছিল। যে খেলতে পারবে কি না, স্থির ছিল না। সে রানার ছাড়া টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা বোলিং লাইনআপকে এভাবে চূর্ণ করল। বলিউড হিরোর মতো দৃশ্যায়ন যে পুলিশের তাড়া খাওয়া নায়ক মোটরসাইকেল শূন্যে তুলে সামনে থাকা পুলিশের জিপকে এড়িয়ে গেল। ভক্তরা সিনেমা হলে হাততালি দিলেও বাইরে এসে হাসে, বাস্তবে কি বাইক শূন্যে ওড়ে নাকি?

ম্যাক্সওয়েল ইনিংস বাস্তব আর কল্পনা একাকার করে দেওয়া। স্টার স্পোর্টসের রিসার্চ টিম ঠিক হিসাব দিতে পারবে যে আফগান বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে শুরুর দিকে কত দর্শক দেখছিল আর শেষে গিয়ে সংখ্যাটা কী দাঁড়িয়েছিল? মাত্র কদিন আগে ইডেনে বিরাট কোহলির সেঞ্চুরি নিয়েও এত কথা শুনিনি বা ম্যাথিউজের বিরুদ্ধে সাকিবের আবেদন নিয়ে। ম্যাক্সওয়েলকে নিয়ে ভারতজোড়া আলোচনা এমন পর্যায়ে যেন বিশ্বকাপের ক্যানভাসে আর নতুন করে কোনো রং দেওয়ার নেই। শিল্পী তার চূড়ান্ত কাজ সেরে রাখলেন। এটাই দ্য আল্টিমেট।

ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা ইনিংস কখনো গ্রুপ ম্যাচে ঘটতে পারে না। সব সেরা ইনিংস বাছতে হলে তা অবশ্যই হতে হবে নকআউট ম্যাচে। সেরা মানে তাকে নিতে হবে সবচেয়ে বেশি চাপ এবং সেটা ঘটতে হবে প্রতিকূলতম পরিবেশে কঠিনতম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ১৯৭৯ ফাইনালে ভিভের ১৩৮ নটআউট। চল্লিশ বছর পরের ফাইনালে বেন স্টোকসের অপরাজিত ৮৪। এগুলো নিছক ক্রিকেটীয় মানে আরও উচ্চাঙ্গের কারণ, সেখানে বোলিং ছিল উন্নততর। মোটেও মুজিবের মতো ফিল্ডার সম্পন্ন ইউনিট ছিল না যে গজা ক্যাচ গলাবে, বা বিশ্বকাপের বাইরে অন্য মানচিত্রে শচিনের মরুঝড়ের ইনিংস। নিছক ক্রিকেটীয় দক্ষতায় অনেক ওপরে। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো বা ভ্যান গগের পেন্টিং।

তবু ম্যাক্সওয়েল পাহাড়ি অঞ্চলের শীতের ডালিয়া হয়ে চিরকালীন ক্রিকেট স্বর্গের উদ্যানে থাকবেন। কেন? শচিন বা ভিভদের কীর্তি ব্যাটিং লাবণ্যের। অভ্রান্ততার। জিনিয়াসের প্রকাশিত জিনিয়াস।

তুলনায় মিডিওকার ম্যাক্সওয়েলেরটা সেই শ্রেণিতে পড়ে না। এটা অন্য দৌড়। স্পোর্টিং এক্সেলেন্সে বিহ্বলকর ক্যাটেগরি। লোকে ব্যাখ্যাই খুঁজে পাচ্ছে না। একটু আগে অফিসে আসা এক ভিজিটর বলে গেল, ‘দাদা, ফিক্সিং নাকি?’ আর একটা ফোন পেলাম সত্যি এত ইনজুরি ছিল? নাকি কিছুটা নাটক?

সম্ভবত যুগ যুগ ধরে এ-জাতীয় ব্যর্থ ময়নাতদন্ত চলবে। এখানেই ভারত সমর্থক হয়েও বুকে পাথর বেঁধে ম্যাক্সওয়েলেরটা আগে রাখব। কপিলের ১৭৫ ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আর্ট গ্যালারিতে সরাসরি গিয়েছে।

ম্যাক্সওয়েলের ২০১ ক্রিকেটবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণই করতে পারছে না প্রকারে তা এমন অলৌকিক! আগেই তো লিখলাম গ্রহান্তরের!

আর হ্যাঁ, তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত