ব্রাসেলসে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ নিয়ে আলোচনা

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০২:৪১ এএম

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে আলোচনা সভা হয়েছে। গত মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য টমাস জেডেচভস্কি। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ক্ষুন্ন করার জন্য অপপ্রচার ছিল আলোচনার মূল বিষয়। বক্তারা সুস্থ গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বাংলাদেশের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য, কূটনৈতিক, কমিউনিটি নেতা এবং বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।

গতকাল বুধবার এমপাওয়ারমেন্ট থ্রু ল অব দ্য কমন পিপল (ইএলসিওপি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, অনুষ্ঠানে বক্তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও এমপাওয়ারমেন্ট থ্রু ল অব দ্য কমন পিপলের (ইএলসিওপি) চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, স্টাডি সার্কেল লন্ডনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, অক্সফোর্ড ম্যাট্রিকসের রায়হান রশীদ।

স্বাগত বক্তব্যে টমাস জেডেচভস্কি বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৯.৫ শতাংশ ইইউ থেকে আসে এবং তারা একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্প অর্থনীতিতে বাংলাদেশের রূপান্তরের একটি বড় অংশ।

বাংলাদেশকে ‘দক্ষিণ এশিয়ার বাঘ’ হিসেবে উল্লেখ করে জেডেচভস্কি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে ইইউ চিন্তা করছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে সাহায্য করার পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের ইতিবাচক উন্নয়নগুলো সবাইকে জানাতে।

এরপর টমাস জেডেচভস্কি আলোচনার সহ-উপস্থাপক সৈয়দ মোজাম্মেল আলীকে তার মতামত জানাতে আমন্ত্রণ জানান। মোজাম্মেল আলী বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বিশ্বব্যাপী অগ্রগতি তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিকে ঘিরে অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছিল; যা ইউরোপীয় ইউনিয়নেও সমালোচনা তৈরি করেছিল।

তিনি আরও বলেন, মূলত বাংলাদেশের অধিকাংশ খবরই সঠিক তদন্ত ও সূত্র ছাড়াই প্রচার করা হচ্ছে। গণমাধ্যমগুলো কখনই তথ্যের বৈধতায় ক্রস-চেক করে না। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অধিক শক্তি প্রয়োগ করার কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং এটি প্রতিটি দেশের জন্য খুব সাধারণ, এটি এমন নয় যে, বাংলাদেশই এ সমস্যাগুলো মোকাবিলা করছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারবেন। তবে সরকার যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।

এরপর ড. রায়হান রশীদ বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস দিয়ে শুরু করে তিনি বলেন, মানবাধিকার আন্দোলনই প্রথম এ দেশকে সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সাংবিধানিক মূল্য দিয়ে জনগণের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব দিয়েছে। তারপর দেশটি মানবাধিকারসংক্রান্ত বহুসংখ্যক আন্তর্জাতিক কনভেনশনের পক্ষ হয়ে ওঠে। এমনকি ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য বাংলাদেশ সীমান্ত উন্মুক্ত করেছে, যা তাদের জাতীয়তা নির্বিশেষে জনগণের অধিকার সুরক্ষিত করার প্রতিশ্রুতিও চিহ্নিত করেছে। তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ হওয়ায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ছিল মাত্র ৪৯.৫ শতাংশ এবং এখন এই হার ৮৫.৮৫ শতাংশ।

ডা. রায়হান রশীদের বক্তব্যের পর অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান তার মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের অধিকারও একটি মূল্যবান মানবাধিকার। দেশটি শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে নির্মূল, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে মানবাধিকারের প্রশ্নটা অনেক আগেই উত্থাপিত হওয়া উচিত ছিল যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তারপর প্রায় ২১ বছর ধরে খুনিরা মুক্ত ছিল এবং কোনো ধরনের বিচার হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি মানবাধিকারের উন্নয়ন করেছে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য পশ্চিমা মিডিয়ার আলোচনায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয়-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভুয়া খবর প্রচার করে প্রোপাগান্ডা ঢেলে সাজানো হচ্ছে।

আলোচনার পর উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এনজিও, আইএনজিও, সমাজকল্যাণকর্মী, কমিউনিটি নেতা এবং নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিরা ছিলেন। উন্মুক্ত আলোচনা অধিবেশনের পর, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে সাহায্য করার অঙ্গীকার নিয়ে আয়োজক টমাস জেডেচভস্কি আবারও সেশনে উপস্থিত থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত