গণমাধ্যম এখন ক্রান্তিলগ্নে

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:১৩ পিএম

মাহফুজ আনাম বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। সম্প্রতি দেশের অন্যতম সফল ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক হিসেবে ৩০ বছর পূর্ণ করলেন। সাংবাদিকদের তিনি প্রায় তিন দশক ধরে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবন ও সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : ১ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক হিসেবে আপনার ত্রিশ বছর পূর্ণ হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানিয়ে শুরু করতে চাই। পেছন ফিরে তাকালে আপনার এই সম্পাদক জীবনের মূল্যায়ন করবেন কীভাবে?

মাহফুজ আনাম : ধন্যবাদ। সম্পাদক হলেন ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ। একটা টিমের, একটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান। কিন্তু সেটি কীসের প্রতিষ্ঠান? ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, নাকি সরকারি কোনো সংস্থার প্রধান... তিনি ঠিক কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রধান? সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠান মানে কি? মানে হচ্ছে- সততা, নিরপেক্ষতা এবং সাংবাদিকের যে মূল্যবোধ এসব দিয়ে সে সমাজকে সেবা করবে। এখন সবাই তো সমাজের সেবা করে। সাংবাদিকতার এই সমাজসেবাটা কীভাবে ভিন্ন? প্রথমত, আপনি সমাজসেবা করছেন সত্য কথা বলার জন্য। যারা অন্যায় করছে, তাদের উন্মোচন করা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব না। সংবাদপত্রের দায়িত্ব হচ্ছে বাকস্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং যেসব কাজ সমাজকে কলুষিত করছে তার উন্মোচন করা। তো এই ধরনের একটা প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক হচ্ছে চিফ। আমি মনে করি একজন সম্পাদককে সাংঘাতিক রকম সৎ হতে হয়। আমি যখন সরকারকে একটা রূঢ় কথা বলব, একজন শিল্পপতিকে এক্সপোজ করব, একজন ব্যুরোক্রেটকে তার ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বলব এখন আমিও যদি সেসব করে থাকি, আমার জীবনেও যদি ওই দুর্বলতাগুলো থাকে, তাহলে কোনো না কোনো সময়ে আমি ধরা পড়ে যাব। কাজেই বলিষ্ঠতার একটা পূর্ব শর্ত হচ্ছে নিজেকে সৎ হতে হবে। এই সততার একটা বিরাট দিক রয়েছে। সেটা হলো আমার সঙ্গে যারা কাজ করেন, ডেইলি স্টারের যারা রিপোর্টার, সাব-এডিটর, ফিচার রাইটার আছেন, তারা যদি মনে মনে ভাবেন যে সম্পাদক সাহেব তো তার সম্পাদনা ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা গোছাচ্ছে বা নিজের আত্মীয় স্বজনকে প্রমোট করছে...। কাজেই, একটা হলো বাইরে একটা দৃঢ়তা সুপ্রতিষ্ঠিত করা আর সংগঠনের ভেতরে আপনার অবস্থান এই দুটোকে রক্ষা করতে হলে একজন সম্পাদককে সাংঘাতিকভাবে সৎ হতে হবে। নিষ্ঠাবান হতে হবে। এবং সব কাজের মধ্যে সমাজকে, মানুষের অধিকারকে সামনে রাখতে হবে। এখন শুনলে মনে হতে পারে যে আমি কাল্পনিক বা ইউটোপীয় কথা বলছি। কিন্তু প্রথমেই ইউটোপিয়া বলে যদি আপনি এটা ত্যাগ করে বলেন যে এটা সম্ভব না, তাহলে কি সম্ভব? এটা তো এমন একটা সমাজ, যেখানে অনেক কিছু আপনি মেনে নিচ্ছেন। ওই মেনে নেওয়ার মাপকাঠিটা কী? একটা মিথ্যা মানবেন না ৯টা, নাকি পাঁচটা মিথ্যা মানবেন আর পাঁচটা মানবেন না...! ধরেন, মূল্যবোধের যখন আপস শুরু হয়, তখন কিন্তু তা আর শেষ হয় না। যদিও ইউটোপিয়া বলে মনে হয় কিন্তু আমার জীবন এই স্বপ্নকে ধরেই অতিবাহিত করছি।

দেশ রূপান্তর : স্বপ্ন বলেন বা ইউটোপিয়া যার কথা আপনি বললেন, আমরা কোল্ড ওয়ারের সময়টা দেখিনি। কিন্তু ইরাক, আফগানিস্তানের পর এখন যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল পরিস্থিতি চলছে সেখানে পশ্চিমা মিডিয়ার যে ভূমিকা, সেখানে আপনার সেই সত্য কোথায়?

মাহফুজ আনাম : ছোটবেলা থেকে পশ্চিমা মিডিয়ার প্রতি আমার একধরনের দুর্বলতা ছিল। কিন্তু আমি যখন বড় হচ্ছি তখন তো কোল্ড ওয়ার চলছে। একটা ওয়েস্টার্ন মিডিয়া আরেকটা কমিউনিস্ট মিডিয়া। তো কমিউনিস্ট মিডিয়ার প্রতি কোনোভাবেই শ্রদ্ধাশীল হতে পারিনি। ওয়েস্টার্ন মিডিয়া তার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েও মনে হয়েছে যে তারা একটা চেষ্টা করে। কিন্তু বিশেষ করে ইরাকের যুদ্ধের পর এবং বর্তমানে ফিলিস্তিনে যেটা চলছে... মানে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই মর্মাহত। ওয়েস্টার্ন মিডিয়া এখানে তার যে স্বার্থপরতা দেখাল এটার যে একটা অবিশ্বাস্য আকারের ক্ষতি হলো, সেটা ওরা কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না। পশ্চিমা মিডিয়া এবং দেশগুলোরও যে একটা মরাল অথরিটি ছিল সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ডেইলি স্টারের শুরুর দিনগুলো এবং সম্পাদক হিসেবে আপনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটটা যদি বলতেন। 

মাহফুজ আনাম : ডেইলি স্টারের জন্মটা কিন্তু কাকতালীয় নয়। জাতিসংঘের সংস্থায় আমি প্যারিসে ৫ বছর কাজ করেছি। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৪ বছর কাজ করেছি। এবং সর্বশেষ ব্যাংককে একটা রিজিওনাল রেসপন্স নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু এই পুরোটা সময় কিন্তু আমি সাংবাদিকতার সঙ্গেই যুক্ত ছিলাম। আমি একটা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের ছেলে যে অত ব্রিলিয়ান্ট না। আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট না, স্কলারশিপ পাইনি। কিন্তু আমি যে এক্সপোজারটা পেলাম, যখন আমি প্যারিসে ছিলাম ইউরোপিয়ান মিডিয়ায় আমি বেশ এক্সপোজার পেয়েছি। আমেরিকা-কানাডাতেও। তারপর যখন ব্যাংককে থাকলাম ৫ বছর, আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক জড়িত। তারপর আমি অনেক ট্রাভেল করতাম। আমার এতগুলো দেশের, এতগুলো কাগজ, এতগুলো সাংবাদিকের সঙ্গে পরিচয় হলো যে আমি মনে মনে ভাবতাম এই অভিজ্ঞতা তো একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। কাজেই, আমি চিন্তা করতাম দেশে গিয়ে আমি এটার প্রতিফলন দেখাব। তখন আমার বয়স ৪১ বছর। তখন আমি ছিলাম জাতিসংঘের ইউনেস্কোতে। যার সদর দপ্তর হলো প্যারিসে। তো আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে ইউনেস্কোর কাজে ইস্তফা দিয়ে ঢাকায় এসে একটা আদর্শিক কাগজ স্থাপন করব। সৌভাগ্যক্রমে ওই সময় ইউনেস্কোতে এস এম আলী বলে একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন। বাংলাদেশের সাংবাদিক হিসেবে বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া বিষয়ে বিশ্বজোড়া তার খ্যাতি ছিল। তো উনি তখন ইউনেস্কোর কাজ থেকে অবসরে যাচ্ছিলেন। আর আমি রিজাইন করি। দুজনেই ফিরে এসে ডেইলি স্টার স্থাপন করলাম। ওনার নেতৃত্বে। উনি সম্পাদক, আমি নির্বাহী সম্পাদক। এটা ১৯৯১ সালে, এরশাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হলো আর ডেইলি স্টার বের হলো ১৪ জানুয়ারি ১৯৯১। সেখানে প্রথম যে আর্টিকেল আমি লিখলাম নিজের নামে, প্রথম সংখ্যায়, তার শিরোনাম ছিল ‘ড্রিমস রিবর্ন’। এরশাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাঠামোর যে প্রক্রিয়া, আমি মনে করলাম সেখানে এই ১৬ বছর মিলিটারি এবং কোয়াসি মিলিটারি রিজিমের পরে যে গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেটাই ড্রিমস রিবর্ন। আমার দৃষ্টিতে ৭১-এর যে স্বপ্ন, যেটা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে ভূলুণ্ঠিত হলো সেটার আবার রিবার্থ হলো ১৯৯০-তে এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে। এবং ওই সময় দ্য ডেইলি স্টারের জন্ম। কাজেই, বলতে পারেন সমস্ত দিক থেকেই গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা, মানুষের একটা সুষম সমাজ, একটা সরকার যা জনগণের ইচ্ছায় নির্বাচিত হবে... এখন দাঁড়িয়ে বলা যেতে পারে যে কল্পলোকের রূপকথার মধ্যে ডেইলি স্টারের জন্ম।

দেশ রূপান্তর : আপনার ভাষায় যে স্বপ্নের পুনর্জন্ম, তার কী অবস্থা এখন? সেই শিশুর লালন পালন হয়েছে ঠিক মতো, বড় হয়েছে ঠিকঠাক?

মাহফুজ আনাম : অবশ্যই না, এটা তো আপনি সাংবাদিক হিসেবে নিজেই জানেন। প্রথমত হলো ড্রিমস শ্যুড অলওয়েজ রিমেইন এ ড্রিম। কিন্তু যদি বাস্তবতার কথা বলেন, তাহলে এখন বলব যে ‘ড্রিমস শ্যাটারড’। কিন্তু এটা কথার কথা বলছি, স্বপ্ন তো থাকতেই হয়। আমি মনে করি ৯১-এ গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরে এখন তো ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে বাংলাদেশের যে কাক্সিক্ষত গণতান্ত্রিক রূপ, পুরোপুরি শোষণহীন না হলেও অন্তত সহনীয় মাত্রার বৈষম্যহীন সমাজ হবে, স্ট্রাকচারাল গণতন্ত্র আসবে, মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতি হবে, অপজিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শত্রুজ্ঞান করার অবস্থা হবে না...; তো ড্রিমস রিবর্নের সেই স্বপ্ন তো সফল হয়নি। আর সেই স্বপ্ন সবচেয়ে বেশি যেখানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, সেটা হলো আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সরকার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বত্র রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির প্রবেশ ঘটেছে।

দেশ রূপান্তর : দুর্নীতির যে পরিধি তা থেকে সাংবাদিকতা কি মুক্ত থাকতে পারে?

মাহফুজ আনাম : একেবারেই না। সমাজ যখন পচনশীল তখন সাংবাদিকতাও তার ভিকটিম হচ্ছে। আনফরচুনেটলি আমি মনে করি এটার জন্য পরিবেশ যেমন দায়ী, সাংবাদিকরাও দায়ী। আমরা সম্পাদকরা দায়ী। আমরা সহজে আমাদের মূল্যবোধ থেকে সরে যাই। হ্যাঁ, মালিক পক্ষ তো থাকবেই, কিন্তু মালিকের সঙ্গে সম্পাদকের যে সম্পর্ক, এটারও তো ইতিহাস আছে। প্রাইভেট সেক্টরে সংবাদপত্র কি বাংলাদেশেই প্রথম হলো? বিদেশে আছে, পাশের ভারতে আছে। একটা টার্ম আছে ইনস্টিটিউশন অব এডিটরস, এডিটরশিপটা একটা ইনস্টিটিউশন। মালিকের একটা সম্পর্ক তো আছেই, সে তার প্রফিট দেখবে। কিন্তু সে কখনো সম্পাদকের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। এখন একজন হাসপাতালের মালিক, সে হসপিটালটা প্রতিষ্ঠা করেছে, কিন্তু সে তো হাসপাতাল চালাতে পারবে না। সেজন্য তো ডাক্তার দরকার। এখন মালিক যদি বলে এখানে এই ওষুধ দাও, সেখানে অপারেশান করো সেটা তো আর ডাক্তারি হলো না। একইভাবে একজন শিল্পপতি যখন একটা সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করে, সে মালিক হিসেবে ব্যালান্স শিট দেখবে, সে দেখবে তার বিনিয়োগ কতটা সার্থকভাবে হচ্ছে। কিন্তু সে যদি সংবাদপত্র চালানোর মধ্যে ঢুকে যায়, তাহলে তো হবে না এবং আনফরচুনেটলি এখন তারা সেখানে ঢুকে গেছে। বলতে পারেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই তার নিজের মহত্ত্ব নিয়ে আর অবস্থান করছে না। এটা সব পেশাজীবীর মধ্যেই শিক্ষকদের, ডাক্তারদের, শিল্পপতিদের এবং সেটা সাংবাদিকদেরও। সার্বিকভাবে আমাদের মূল্যবোধের এমন একটা অবক্ষয় হয়েছে, যেটা অস্তিত্বকেই থ্রেট করছে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতি এবং দুর্বল সংবাদমাধ্যমের পরিসরে ডেইলি স্টারের সফলতার ব্যাখ্যাটা কী?

মাহফুজ আনাম : এখানে আমি বেশি কৃতিত্ব দাবি করব না, আপনি বলতে পারেন আমরা একটা মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে আছি। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যারা ডেইলি স্টারের শেয়ার হোল্ডার তারাও সেই মূল্যবোধটাকে আঁকড়ে আছেন। সাধারণত একজন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী বা ধনবান কোনো ব্যক্তি, তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একটি টিভি করবেন বা একটা খবরের কাগজ দেবেন। তো যে পুঁজি বিনিয়োগ করবে, সে সিদ্ধান্ত নিল। তখন সে খুঁজে বেড়ায় যে কোন সম্পাদককে তিনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেবেন। মানে, সম্পাদকের নিয়োগ সে দেয়। আমাদের ক্ষেত্রে সৌভাগ্যক্রমে জিনিসটা উল্টো হয়েছে। এস এম আলী সাহেব এবং আমি, আমরা দুজন একটা কাগজ বের করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারপর আমরা খুঁজে বেড়ালাম কোন শিল্পপতির কাছে আমরা যেতে পারি, যার ইতিমধ্যেই সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে একটা রেপুটেশন আছে। আমরা তেমন শিল্পপতি খুঁজে খুঁজে বের করলাম। সাধারণত ইনভেস্টর সিলেক্ট দ্য এডিটর, আমরা সৌভাগ্যবশত এডিটররা সিলেক্ট করলাম ইনভেস্টরদের। বোর্ড মিটিং শেষ হওয়ার পর থেকে পরবর্তী বোর্ড মিটিং না হওয়া পর্যন্ত আমার যারা শেয়ার হোল্ডার তারা আমাকে বলত মাহফুজ, তোমার কাগজ কেমন চলছে? আমাদের কাগজও বলত না তারা। তো চিন্তা করেন যে কী ধরনের সম্মানের জায়গা থেকে তারা সম্পাদককে দেখতেন। এবং সেটা তারা সারাক্ষণ বজায় রাখতেন। আমি অন্য একটা ঘটনা বলি পাকিস্তানের ডনের এমডি, মানে মালিক তার নাম ছিল হামিদ হারুন। সে আমার খুব ভালো বন্ধু। এখন যে ডনের সম্পাদক সেও আমার বন্ধু কিন্তু আগের জন যে সম্পাদক ছিল, তাকে আমি চিনতাম না। তো কমপ্লেক্সের মধ্যে এক কোনায় ডনের বিল্ডিং আর আরেক কোনায় মালিকপক্ষের অফিস। মাঝখানে সুন্দর একটা মাঠ। তো আমি একবার ডনের এমডি হামিদ হারুনের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে বললাম যে ডনের তখনকার সম্পাদককে আমি চিনি না, তাকে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। খুব সম্ভবত তার নাম ছিল আহম্মদ আলী। তো এমডি তাকে ফোন করে বললেন যে আপনার কি একটু সময় হবে, বাংলাদেশের এক পত্রিকার সম্পাদক, আমার বন্ধু, তিনি আসছেন এবং সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। তিনি হ্যাঁ বলার পরে হামিদ হারুন আমাকে নিয়ে তার অফিস থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে মাঠ পার হয়ে ডনের সম্পাদকের অফিসে গেল। এবং সে বলল, মাহফুজ ডনের জীবনে কোনোদিন প্রকাশক সম্পাদককে অফিসে ডাকে না। প্রকাশক সবসময় হেঁটে হেঁটে সম্পাদকের অফিসে গিয়েছে, এখন যেমন তোমাকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। তো এই যে মূল্যবোধ, এডিটরিয়াল ইনস্টিটিউশনের প্রতি সম্মান এটাই কিন্তু একটা সংবাদপত্রের সাফল্যের অন্তর্নিহিত কারণ।

দেশ রূপান্তর : আপনি কেবল সম্পাদকই নন, একই সঙ্গে প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপকও। ধরনগত জায়গা থেকে এসব কাজ তো আলাদা, সমন্বয় করেন কীভাবে?

মাহফুজ আনাম : এটা একটা ভালো প্রশ্ন করেছেন। এই প্রশ্নের খুব স্পষ্ট একটা উত্তর যে আমি একাধারে এডিটর, পাবলিশার, ম্যানেজিং ডিরেক্টর অব দ্য কোম্পানি এবং চেয়ারম্যান অব দ্য বোর্ড এই চারটি ভূমিকার প্রধানতম ভূমিকা হচ্ছে আমার এডিটরশিপ। আপনি বলতে পারেন যে এটা এমন একটা কেস, যেখানে এডিটর ডমিনিটিং ম্যানেজিং এডিটর এবং হি ইজ ডমিনিটিং দ্য বোর্ড। তবে অবশ্যই আমার যেহেতু এত দায়িত্ব, সেখানে খুবই সচেতন থাকতে হয়। ব্যবসায়িক দিক দেখতে হয়, বোর্ডের যে নেচার সেটা বুঝতে হয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে মূল পরিচয় হচ্ছে সম্পাদক।

দেশ রূপান্তর : ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নানা চাপ, ভয়ভীতি ও বহু মামলা তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময় এসব প্রতিবন্ধকতার চাপের ধরন কি একই আছে? বর্তমান সময়ের প্রতিবন্ধকতার মাত্রাকে কোথায় রাখবেন?

মাহফুজ আনাম : দুইটা দিক থেকে চিন্তা করতে হবে। একটা হলো সরকারের অ্যাটিচিউড, সরকারের সাংবাদিকতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। পৃথিবীতে যতই গণতান্ত্রিকভাবে সরকার নির্বাচিত হোক আমার অভিজ্ঞতা হলো যে, তারা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে পছন্দ করে না। আমেরিকাও করে না, ব্রিটেনও করে না। কিন্তু যতই অপছন্দ করুক তাদের সংবাদপত্রকে আঘাত করার ক্ষমতা নেই। ট্রাম্প সিএনএন-এর প্রেজেন্টারকে হোয়াইট হাউজ থেকে বের করে দিল। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টের অর্ডারে তাকে হোয়াইট হাউজে ফিরিয়ে নিতে হলো। আমাদের দেশে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু আমরা কি কোর্টে যেতে পেরেছি? আমরা সেই সাহসও করিনি, আর গেলেও সুবিচার পেতাম বলে মনে হয় না। আরেকটা হলো আইনি কাঠামো। এই সরকারের সময় সবচেয়ে দুঃখজনক কাজ যেটা হয়েছে, তারা আইনকে ব্যবহার করছে। আমরা সম্পাদক পরিষদ থেকে একাধিকবার এটার প্রতিবাদ করেছি, সেটা হলো ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, যা পরে হয়েছে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট। আমি বলব এই সরকার যে আইনি কাঠামো পরিবর্তন করেছে, সেটা সাংবাদিকতাকে সব থেকে বেশি আঘাত করেছে।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু ডিজিটাল পরিস্থিতি যে গণমাধ্যমের প্রতি চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, সেখানে গুজব, ফেইক নিউজ-এর বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছেন?

মাহফুজ আনাম : আমরা আসলে একটা ক্রান্তিলগ্নে আছি। আমরা এখন যেসব আলাপ করলাম সেগুলো সরকারের প্রভাব, মালিকদের স্বার্থ ইত্যাদি কীভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করে তা নিয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে ঘটে গেছে একটা টেকনোলজিক্যাল রেভ্যুলুশন। ধরা যাক সোশ্যাল মিডিয়া, আমরা যখন শুরু করি এটা তো ছিলই না। এটা একটা আনরেগুলেটেড মিডিয়া, এখানে লোকজন তার স্বাধীনতার অপব্যবহার করতে পারে, মানুষকে হেয় করতে পারে, গুজব ছড়াতে পারে নানান কিছু করতে পারে। এসবের জন্য ফ্যাক্ট চেকের মতো বিষয় এসেছে। দিস ইজ ওয়ান সাইড। কিন্তু আরেকটা যে সাইড, সেটা তো অকল্পনীয় এবং অভূতপূর্ব। সেটা হচ্ছে ফ্রিডম। আগে কেউ তার মন্তব্য প্রকাশ করতে হলে তার সংবাদপত্রের এডিটরের কাছে একটা চিঠি দিতে হতো, এমন ১০/১৫টা চিঠি কেউ পাঠালে তার মধ্যে দুই-তিনটা ছাপা হতো বা হতো না। পাবলিকের ফিডব্যাক মেকানিজম কিছুই ছিল না। এবং পার্টিসিপেশন, কমিউনিকেশনটা ছিল ওয়ান সাইডেড। কিন্তু এখন খবরের কাগজে কোনো বাজে নিউজ এলে সোশ্যাল মিডিয়াতে ইমিডিয়েট রিঅ্যাকশন হয়। ফলে এটা একটা খুবই শিক্ষণীয় জায়গা। আমি জানতে পারি পাঠকরা কী চায়। ইন্সট্যান্ট কমিউনিকেশন, কিছু একটা লিখলাম সঙ্গে সঙ্গেই কেউ ফেসবুকে দিয়ে দিল। আমি মনে করি সোশ্যাল মিডিয়ার ফলে কমিউনিকেশন ডেমোক্রাইজ হয়েছে। ইন্ডিভিজ্যুয়ালদের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা গেছে। মতপ্রকাশ আর প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ হয়েছে। এগুলো খুব পজিটিভ জিনিস। আর নিউজ পেপারের কথা যদি বলেন, কেউ যদি কেবল নিউজ পেপার হিসেবে নিজেদের চিন্তা করে, তাহলে তার মৃত্যু অবধারিত। ডেইলি স্টার নিজেকে পরিবর্তন করে বিকেম এ নিউজ প্ল্যাটফর্ম, নট নিউজ পেপার। এটা পাঠকের কাছে পৌঁছাবে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন মাধ্যমে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত