নির্বাচনের প্রভাবে খেলাপি কমল ৬৪২ কোটি

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০২:১৯ এএম

ঋণখেলাপি থাকলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তাই আগামী জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খেলাপি থেকে বাঁচতে ঋণ পরিশোধ করেছেন অনেকে। আবার প্রভাব খাটিয়ে নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ঋণ নিয়মিত করছে কোনো কোনো গোষ্ঠী। ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ সামান্য কমেছে। তবে বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সেপ্টেম্বর-২০২৩ প্রান্তিকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, সুশাসন ও খেলাপি ঋণই বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা। ব্যাংক খাতে সুশাসন না থাকার কারণে দিন দিন খেলাপি বাড়ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় ঢালাওভাবে ছাড় না দিয়ে পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। খেলাপি সমস্যা দূর করতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রহীতা ও দাতার ক্ষেত্রে একইভাবে রেগুলেশন প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি নৈতিকতার অনুশীলন প্রয়োগেরও পরামর্শ তাদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত বছরের (সেপ্টেম্বর-২০২২) একই সময়ের চেয়ে ২৩ হাজার ১ কোটি টাকা বেশি। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রান্তিকটিতে দেশের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে খেলাপি ঋণ।

আর মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা মোট ঋণের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। সেই হিসাবে ৬ মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ২৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণও ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি খাতে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে এবং সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। কিন্তু বর্তমানে বেসরকারি খাতের খেলাপি ঋণ ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। আর সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ২১ দশমিক ৭০ শতাংশই খেলাপি।

আইএমএফের শর্তমতে, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা ঋণ, সন্দেহজনক ঋণ ও আদালতের আদেশে খেলাপি স্থগিতাদেশ থাকা ঋণকেও খেলাপি দেখাতে হবে। সে ক্ষেত্রে আইএমএফের হিসাবে খেলাপি দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান না থাকায় খেলাপি বাড়ছে বলে মত অনেকের। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না খাত বিশ্লেষকরা।

এর আগে বর্তমান গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার জানিয়েছিলেন, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও খেলাপি ঋণকে দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় দুই সমস্যা। খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের আরও ভূমিকা নিতে হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন খেলাপি ঋণ কমাতে আমাদের তেমন সফলতা আসছে না। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে আর কঠোর হতে হবে। খেলাপি কমাতে না পারলে সেই সব ব্যাংকের শাখা বন্ধের নির্দেশ দিতে হবে।

বিশ^ব্যাংকের বাংলাদেশ মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘খেলাপি ঋণ বন্ধে আমাদের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপও নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। খেলাপির যে চিত্র উঠে এসেছে, এটা প্রকৃত চিত্র নয়। প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ, আরও বড় হবে। কভিড পরিস্থিতিতে ছাড় দেওয়া হলো, অন্য সময়ও ছাড় দেওয়া হচ্ছে। মোট ঋণের কিছুটা পরিশোধ করলেই আর খেলাপি হচ্ছেন না, এমন সুবিধার পরও সুফল কতটুকু?’

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘গ্রাহককে ঋণ পরিশোধে বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও কোনো সুফল আসছে না। যে রেগুলেশন আছে সেটা কঠোরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না, কঠোর করতে হবে। ঋণ বিতরণ ও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে একই চোখে দেখতে হবে। এক কথায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। একদিকে ব্যাংক খাতে ঋণ আদায় হচ্ছে না, আবার বিতরণও হচ্ছেঠান্ডা এভাবে খেলাপি কমবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত