নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাঠপর্যায়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করলেও আওয়ামী লীগের কৌশল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন নিয়ে সমঝোতা হবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দলটির নেতারা। জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ভোটের মাঠে তারা নৌকা ও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে লড়াই করতে চান না। এদিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ করছেন তার অনুসারীরা। এ ক্ষেত্রে তারা দলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে তাকিয়ে আছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দিকে।
জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়ের আগেই আওয়ামী লীগের সঙ্গী প্রকাশ্যে বা গোপনে সমঝোতায় পৌঁছানো হবে। দলটির কয়েকজন নেতা এ নিয়ে নিয়মিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা নির্বাচনের মাঠে নির্দিষ্টসংখ্যক আসন পাওয়ার সমঝোতার পাশাপাশি বাকি আসনে আওয়ামী লীগের বেপরোয়া আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা চান। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে আওয়ামী লীগের বিরোধী ভোটারদের টানার কৌশল নিয়ে আগাচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কিছু আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করতে চান।
এই সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের ১০ তারিখের পর যেকোনো দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে গণভবনে যাবেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। ওই মিটিংয়ে নির্বাচন প্রশ্নে চূড়ান্ত মীমাংসা আসবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসনভিত্তিক একটা সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কত আসনে ছাড় পাওয়া যাবে তা চূড়ান্ত হয়নি। শুধু জাপা নয়, আওয়ামী লীগের শরিক ১৪ দলের সঙ্গেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনা শুরু হলে সেখানে সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। জাপাকে বিরোধী দলে বসানোর নিশ্চয়তা দিয়ে যেমন নির্বাচনে নিয়ে আসা হয়েছে, তেমনি জাপার বাইরে বিরোধী দলের আসনে বসার মতো যোগ্য কোনো দলও সরকারের হাতে নেই।
জাতীয় পার্টির একাধিক সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেন, নির্বাচনে অস্ত্র, পেশিশক্তি, প্রশাসন ও টাকার বড় ভূমিকা থাকে। সরকারি দল হিসেবে মাঠপর্যায়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের দখলে। এমনকি যেসব আসনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা রয়েছেন, সেখানেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের চলতে হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সাংগঠনিক সক্ষমতার সামনে দেশের কোথাও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ন্যূনতম সক্ষমতা নেই জাপার। ফলে নির্বাচনে জয় পেতে হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারানোর সক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা নিয়েও ভাবছেন তারা।
দুটি ছাড়া সব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকার বিষয়ে নিজেদের দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে এই সংসদ সদস্যরা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কৌশল বুঝতে পারছি না। এখন পর্যন্ত আমরা আওয়ামী লীগ থেকে জাপাকে আসনছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। দলীয় ফোরামে চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বারবার বলেছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। কীভাবে সমঝোতা হবে, কার কার আসনে ছাড় দেওয়া হবে, সেসবের কিছুই জানি না। বলতে পারেন নির্বাচন ও সমঝোতার বিষয়ে অস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে অন্ধকারে আছি।’
তারা বলেন, সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর উপনির্বাচনে দেখা যায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সমর্থকরা কেন্দ্রে কেন্দ্রে আধিপত্য বিস্তার করে নৌকায় ভোট দেন। মুখে যতই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলি না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেশের কোথাও নেই। ফলে আসনভিত্তিক সমঝোতার বাইরে নির্বাচন করে জাপার বিরোধী দলের আসনে বসা ও বড়সংখ্যক আসন পাওয়ার বাস্তবিক সম্ভাবনা কমে যাবে। চলতি বছর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল তুলে ধরলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার সখ্য পুরনো। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে মহাজোট গঠন করে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। ধারণা করা হয়, জাতীয় পার্টির সঙ্গে সমঝোতার কারণে ভোটের মাঠে বড় পার্থক্য হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ২৯টি আসনে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ, যেখানে তাদের কোনো প্রার্থী ছিল না। একই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি প্রার্থী দেয় এমন ২০টি আসনের একটিতেও জয় পায়নি জাতীয় পার্টি। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এবারের মতো নির্বাচন বর্জন করেছিল। ওই নির্বাচনে জাপার অংশগ্রহণ নিয়েও নানা প্রশ্ন ছিল। সেই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জাপার অংশগ্রহণ আওয়ামী লীগকে বড় স্বস্তি দিয়েছিল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে ৩৩টি আসনে জয় পেয়েছিল জাপা। কিন্তু একই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাপা প্রার্থী দিয়েছিল এমন ৫৫টি আসনের মধ্যে ৪৬টিতেই হেরেছিল দলটি।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য নিয়ে জাপায় দুশ্চিন্তা রয়েছে। আসনভিত্তিক সমঝোতার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনায় বসলে সবকিছুর মীমাংসা হবে। এখনো সময় আছে দেখি কী হয়।’
জাপার আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মাসরুর মাওলা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমর্থন না দিলেও সমস্যা নেই। আমরা স্বতন্ত্র দল হিসেবে নির্বাচন করছি। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দরকার, তা না হলে তাদের প্রার্থীদের সামনে মাঠে টিকে থাকা কঠিন হবে।’
জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘দুশ্চিন্তা হচ্ছে গত কয়েক বছরে কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেওয়া আওয়ামী লীগের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের এই অভ্যাস বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। আমরা সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা আসন ভাগাভাগি চাই না। আমরা চাই সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা, যেন মানুষ ভোট দিতে পারে।’
আশায় রওশনপন্থিরা : নির্বাচন ঘিরে জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বড় পরাজয় হয়েছে রওশন এরশাদের। অনুসারীদের মনোনয়ন, নিজের ছেলের জন্য রংপুর-৩ আসন, জাপার নির্বাচন পরিচালনার সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এসবের কোনো কিছু তো পূরণ হয়নি, উল্টো জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে ব্যাকফুটে চলে গেছেন এই প্রবীণ নেতা। তবে এখনো রাজনীতিতে ফুরিয়ে গেছেন মানতে নারাজ রওশন অনুসারীরা।
রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সবাই আমাদের দিকে। রওশন এরশাদের জাপাই মূলধারা। তার বয়স হয়ে গেছে, ফলে অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের স্ত্রী। আমরা এখন পর্যবেক্ষণ করছি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। তার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
রওশন এরশাদের মুখপাত্র মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমরা রওশন অনুসারীরা আপাতত চুপ থাকব। আমাদের এখন কিছু করার সুযোগ নেই। নির্বাচনটা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর চমক অপেক্ষা করছে। এমনও হতে পারে নির্বাচন শেষে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রওশন এরশাদবিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসবেন।’
