সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ২৮ মঞ্চে গতকাল শনিবার পরমাণু শক্তি এবং নবায়নযোগ্য উৎসের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা নিয়ে দুটি সমঝোতা সই হয়েছে। ২২টি দেশ পরমাণু শক্তিভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা ২০৫০ সালের মধ্যে তিন গুণ করতে অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে ১১৭টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির সক্ষমতা তিন গুণ করতে একমত হয়েছে। তবে পরমাণু উৎসের বিস্তার নিয়ে অনেক জলবায়ু আন্দোলনকর্মী আপত্তি তুলে বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পরমাণু উৎসের সম্প্রসারণ বিপজ্জনক পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী পরমাণু শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ৩৭৫ গিগাওয়াট।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসকল্পে ২২ দেশ ‘দ্য ডিক্লারেশন টু ট্রিপল নিউক্লিয়ার এনাাির্জ’ শীর্ষক চুক্তিতে সই করেছে। এ-সম্পর্কে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ একটি বিবৃতিতে জানায়, ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনার পাশাপাশি বৈশি^ক উষ্ণায়ন দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে পরমাণু বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিল এই চুক্তি।
সমঝোতা অনুযায়ী, চুক্তিতে উপনীত হওয়া দেশগুলো বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণনীতিতে পরমাণু উৎসকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানায়। বর্তমানে যেসব রিঅ্যাক্টর রয়েছে, সেগুলোর কার্যকাল বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয় চুক্তিতে। সেই সঙ্গে ‘দায়িত্বশীল দেশগুলো’ কর্তৃক ‘বেসামরিক পরমাণু প্রজন্ম’ গড়ে তোলার আকাক্সক্ষাকেও স্বাগত জানানো হয়েছে।
চুক্তিতে সই করা দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বুলগেরিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, ঘানা, হাঙ্গেরি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালদোভা, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, সুইডেন, ইউক্রেন এবং ইউএই।
যুক্তরাষ্ট্রের জলাবয়ু দূত জন কেরি বলেন, ‘আমরা অন্যদের এমন যুক্তি দিচ্ছি না যে এটি (পরমাণু শক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন) অবশ্যই অন্যান্য জ¦ালানি উৎসের স্পষ্ট বিকল্প হতে যাচ্ছে। তবে বিজ্ঞান, বাস্তব পরিস্থিতি ও তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে, কিছু মাত্রার পরমাণু শক্তি ছাড়া ২০৫০ সালে শূন্য কার্বনের লক্ষ্যমাত্রায় আপনি যেতে পারবেন না। এসব সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। এখানে কোনো রাজনীতি নেই, কোনো আদর্শিক ব্যাপারও নেই।’
তবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে পরমাণুকে বেছে নেওয়ার প্রশ্নে আপত্তি উঠেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ স্পষ্টভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ বিষয়ে আপত্তি তোলা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে আন্দোলনে অবদান রাখা সংগঠন ‘৩৫০.অর্গ’ অন্যতম। এই সংগঠনের জাপানি আন্দোলনকর্মী মাসায়োশি আইয়োদা বলেন, ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্বনশূন্যকরণের (ডিকার্বনাইজেশন) অগ্রযাত্রায় পরমাণু শক্তির মতো বিপজ্জনক ব্যবস্থার কোনো জায়গা থাকতে পারে না। এর চেয়ে বিপজ্জনক বিচ্যুতি আর হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, চলতি শতকের শুরুর দশক থেকে পরমাণু শিল্প খাতের লবিস্টদের নেতৃত্বে ‘পরমাণু রেনেসাঁ’ সৃষ্টির চেষ্টা সফল হয়নি। এটি পরিষ্কারভাবে অত্যধিক ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, অগণতান্ত্রিক ও সময়সাপেক্ষ। জীবাশ্মের দ্রুততম বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য উৎস রয়েছে, যা সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।
এ অবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসতে গতকালই বিশ্বের ১১৭টি দেশের সরকার বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে তিন গুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। আয়োজক দেশ ইউএই, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই সমঝোতা সই হয়। কপ২৮ সভাপতি সুলতান আল-জাবের বলেন, ‘এই পদক্ষেপ কয়লার ব্যবহার থেকে বিশ্বকে দূরে নিতে পারবে এবং নিয়েও যাবে।’ এটি বিশ্বব্যাপী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন বন্ধের ওপর জোর দেবে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া উন্নয়নশীল বিশ্বে নবায়নযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়কে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সোমালিয়া সরকারের জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক নাজিব আহমেদ বলেন, ‘এই খাতের সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এখনো বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।’
