চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের ছেলের ফলাফলের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন নিয়ে বোর্ডে জোর আলোচনা চলছে। সচিব বা তার পরিবারের কেউ এমন আবেদন করেননি বলে দাবি করছেন। এমনকি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সচিবের স্ত্রী। একই সঙ্গে এ পুনঃনিরীক্ষণ আমলে না নেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছেন বলেও জানা গেছে। যদিও বোর্ড কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করেনি।
গত ২৬ নভেম্বর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বোর্ডের সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে বাংলা বিষয় ছাড়া সব বিষয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। বাংলায় ‘এ’ পেলেও অতিরিক্ত বিষয়ের পয়েন্ট যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফল জিপিএ ৫ হয়েছে। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন বোর্ডের সচিবের ছেলে।
সোমবার রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় জিডি করেছেন বোর্ড সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের স্ত্রী বনশ্রী নাথ (নম্বর : ৩৩৫)। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বোর্ডের নিয়ম অনুসারে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে গেলে দেখা যায় যে, আমার ছেলের রোল নম্বরের বিপরীতে কে বা কারা আগেই ছয় বিষয়ের মোট ১২ পত্রের জন্য পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে রেখেছে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ১৩ পত্রের মধ্যে কয়েকটিতে সে আবেদনে আগ্রহী ছিল। বিষয়টি অতীব সন্দেহজনক এবং দুরভিসন্ধিমূলক। এতে কোনো কুচক্রী মহলের খারাপ পরিকল্পনার ইঙ্গিত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে তার ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা আশঙ্কা করছি।’
এ বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নক্ষত্র দেব নাথ নামের একজন শিক্ষার্থীর মা বনশ্রী নাথ থানায় জিডি করেছেন। কে বা কারা এ আবেদন করেছে তা আমরা খুঁজে বের করার কাজ শুরু করছি।’
শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেব নাথ শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন করেছেন। তার নামে যে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়েছে, তা যাতে বিবেচনায় না আনা হয়। অর্থাৎ নিরীক্ষণ করার প্রয়োজন নেই। গত সোমবার এ আবেদন চেয়ারম্যানের দপ্তরে জমা হওয়ার পর তা গতকাল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
কিন্তু এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো আবেদন আমার কাছে আসেনি। আর সবাই আবেদন করবে টেলিটক মোবাইলের মাধ্যমে। যারা আবেদন করবে তাদের কোড নম্বর চলে আসবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সে অনুযায়ী তা নিরীক্ষণ করবেন।’
সচিবের ছেলের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন অন্য কেউ করেছে কি না, জানতে চাইলে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ‘পরিবারের সদস্য ছাড়া একজনের আবেদন আরেকজন কেন করবে? তবে এ বিষয়টি আমার নলেজে আসেনি।’
একই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এএএম মজিবুর রহমান বলেন, ‘একজনের আবেদন যদি আরেকজন করে থাকে তাহলে তা ক্রাইম (অপরাধ)। তবে সচিবের ছেলের কোনো আবেদন আমার হাতে আসেনি।’
কিন্তু একজনের নামে যদি আরেকজন আবেদন করে তাহলে তা বন্ধের জন্য কি আবেদন করা যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে মজিবুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার বোর্ড চেয়ারম্যানের।’
শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, তাদের অনেকের ধারণা সচিবের ছেলে হয়তো ফলাফলের চেয়ে উত্তরপত্রে আরও কম নম্বর পেয়েছে। একটি পক্ষ তা জানে। আর জানে বলেই তারা নিরীক্ষণের আবেদন করেছে। নিরীক্ষণ করলে প্রকৃত বিষয়টি উদঘাটিত হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বোর্ডের সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের মোবাইলে কয়েক দফা ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এদিকে গত সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত ছিল টেলিটকের মাধ্যমে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনের শেষ সময়। এবারের নিরীক্ষণে ৮৭ হাজার ২৭২টি উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করতে হবে বলে জানান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।
পুনঃনিরীক্ষণে যারা আবেদন করবে তাদের উত্তরপত্রগুলো আবার যাচাই করা হয়। মূল্যায়িত উত্তরপত্রে সব প্রশ্ন মূল্যায়িত হয়েছে কি না, প্রাপ্ত নম্বরগুলোর গণনা ঠিক আছে কি না, তা দেখা হয়। এতে প্রতিবছর অনেকের ফল পরিবর্তন হয়ে থাকে।
