লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষের মানবাধিকার

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:০৮ এএম

বাংলাদেশই যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকার শেখাবে, বোঝাবে কীভাবে মানবাধিকার রক্ষা করতে হয় এবারের বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে আলোচিত-চমকিত ঘোষণা আমাদের মহামান্যের। সেইসঙ্গে একাত্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম ঘটনা গণহত্যার আজতক কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না দেওয়ায় বিশ্বমোড়লদের সমালোচনাও করেছেন তিনি। ব্যাপক করতালি পড়েছে তার এ বক্তব্যের সময়। এবার দিবসটির আগের দিনই বিশ্ব জুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কানাডা। এক একটি দেশ ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা এনটিটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় ১৩টি দেশের ৩৭ জন ব্যক্তিকে টার্গেট করে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ তালিকায় আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানবপাচার থেকে শুরু করে আফগানিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তি, হাইতির জনগণকে শোষণকারী গ্যাং নেতারা। রয়েছেন যুদ্ধ বা সংঘাত সম্পর্কিত যৌন সহিংসতায় জড়িতরা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা ব্যক্তি এবং অন্য দেশের মানুষের ওপর নিপীড়নকারীরা। ৪৬ জন ব্যক্তি এবং এনটিটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ব্রিটেন। তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এর আওতায় ব্রিটেন যাদের টার্গেট করেছে তার মধ্যে আছেন বেলারুশের বিচার বিভাগের ১৭ জন সদস্য। বাধ্যতামূলকভাবে নারীদের হিজাব পরার আইন চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ইরানের ৫ জনের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ব্রিটিশ নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নিপীড়নকারী শাসকগোষ্ঠী এবং অপরাধীদের তারা সহ্য করবেন না। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের মানুষ পাচারের কারণে ৯ জনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। চেচনিয়াতে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে রাশিয়ার চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কানাডা। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ওপরও এমন নিষেধাজ্ঞা আসবে বলে গুঞ্জন ছিল। গুঞ্জনের আয়োজকদের প্রচারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এ স্যাংশন-রেস্ট্রিকশন তালিকায় সরকারের বা সরকারি ঘরানার কয়েকজনের নামও থাকবে। এ সংক্রান্ত গুজবের হাট জমিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। স্যোশাল মিডিয়ায় বয়ে যায় ঝড়। ইউটিউবে পড়ে কনটেন্ট তৈরির ধুম। বিরোধী মহল বিএনপিতে এ নিয়ে উচ্ছ্বাসের পারদ ওঠে তুঙ্গেরও তুঙ্গে। শেষ পর্যন্ত এ ধরনের কিছু হয়নি। এবার মানবাধিকার দিবসে  রাজধানীতে সমাবেশের উদ্যোগ নিয়ে পরে থেমে যায় ক্ষমতাসীনরা। দল থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অনুমতি না মেলায় সে সমাবেশ হচ্ছে না। দিনটি বিএনপির খুব প্রিয়। তারা সেদিন মানবন্ধনের কর্মসূচি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে এলিট ফোর্স র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল। চট্টগ্রামের কক্সবাজারে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ক্রসফায়ারের ঘটনার সূত্র ধরে তৎকালীন র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ওই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছেন সেই সময় র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং বর্তমান পুলিশের আইজিও। এবার যখন বাংলাদেশ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে এবং যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার অবস্থানে রয়েছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে কী ধরনের প্রতিবেদন দেয়, তা নিয়ে জনমনে আগ্রহ-জিজ্ঞাসা একটু বেশিই ছিল। এ সুযোগে গুজববাজরা বাজারটাও বেশ জমিয়ে তোলে। নির্বাচনের আগে ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে কন্টেন্ট তৈরির একটা মৌসুম জমিয়ে তোলে। সেইসঙ্গে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি তো একশতে একশ করে ফেলা হয়। সরকার এসব নিয়ে কেয়ার করে না বলে জানিয়ে দিয়েছে আগেভাগেই। বরং নির্বাচন বয়কট ও ঠেকানোর হুঙ্কারে বিএনপিই এর শিকার হতে পারে বলে দাবি করতে থাকে সরকার।

আদতে দেশে-বিদেশে বিশেষ করে বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার এখন যত না লক্ষ্য, তার চেয়ে বেশি উপলক্ষ। এ উপলক্ষে তারা ও তাদের মিত্ররা মিলে গোটা বিশ্বকে মানবাধিকারের সবক-তালিম দেয়। সেইসঙ্গে স্যাংশন-রেস্ট্রিকশন দেয়। যথারীতি এবারও দিয়েছে। আবার দেশে দেশে মানবাধিকারের অর্থও আপেক্ষিক হয়ে গেছে। কোনটা মানবাধিকার, আর কোনটা দানবাধিকার সেই তফাৎ থাকছে না। যে যেভাবে পারে মানবাধিকার রক্ষা ও চর্চা করে। এবার যেদিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো ঠিক তার পরদিন গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটা দেশের আনা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রই ভেটো দিয়ে ভ-ুল করে দিয়েছে। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, এখন যুদ্ধবিরতি হলে হামাস সুবিধা পাবে। হামাসকে নিশ্চিহ্ন করতে ইসরায়েল ১৭ হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনি নারী-শিশু হত্যা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারের কনসেপ্ট এমনই! এপারে এক রকম ওপারে আরেক। বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে কোনো ঘোষণা আসুক বা না আসুক এখানে মানবাধিকার-আইনের শাসন-ভোটাধিকার নেই, তা অস্বীকার করা হয় না। আবার এই ধরনের নির্দেশ নিষেধাজ্ঞায় পৃথিবীর কোথাও পরিস্থিতির কোনো উন্নয়নও হয়নি এখনো। আমেরিকার রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতার কারণে কিউবা-চীন-নর্থ কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমেরিকা যে পরিবর্তন চেয়েছে সেটা পূরণ হয়নি। নিষেধাজ্ঞা পৃথিবীতে কর্র্তৃত্ববাদী শাসক-স্বৈরাচারী শাসককে পরাস্ত করতে পারেনি, সেখানে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে কেবল উদাহরণ ইরান। নিষেধাজ্ঞা কখনো কখনো স্বৈরাচারকে দুর্বল ও কোণঠাসা করে কিন্তু সমুলে উপড়ে ফেলতে পারে না। স্বৈরাচারী সরকার মাটি কামড়ে পড়ে থেকে তার চারপাশ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। স্বৈরাচারী শাসককে পরাস্ত করার জন্য মানুষের জাগরণ দরকার দূরে বসে হাহা রিঅ্যাক্ট দিয়ে, ইউটিউবে মনোমুগ্ধকর বয়ান দিয়ে, নগরীর নির্দিষ্ট এলাকায় ঢুঁ মেরে চোরাই মিছিল মিছিল আর নেতাদের ঝাঁজালো বক্তব্য কখনো মানবাধিকার লঙ্ঘিত শাসককে পরাস্ত করতে যথেষ্ট নয়। 

এ আচানক বাস্তবতায় বাংলাদেশে মানবাধিকার কায়েম হচ্ছে। হিরো আলমের মনোনয়ন বহাল করা মানবাধিকার। আদম তমিজিকে ধরে এনে মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোও মানবাধিকার। একদিনে পেঁয়াজের দাম ডাবল করে ফেলাও মানবাধিকার। তাদের ছাড় না দেওয়ার হুমকি-ধমকিও মানবাধিকার। ধর্ম, নৈতিকতা, মানবাধিকার সব এখানে একাকার। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের ঘুষের ৯ লাখ টাকা ফেরত দেওয়াও মানবাধিকারের দৃষ্টান্ত। চাকরি দেওয়ার কথা বলে মন্ত্রীর গাড়িচালক ও ভাগ্নে এই টাকা নিয়েছিল। চাকরি না পেয়ে তিনজনে মন্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে টাকা ফেরত চাইলে তাদের পেটানো হয়, দুজন দৌড়ে পালান আর একজন দেয়াল টপকে পাশে ডিবি অফিসে আশ্রয় নেন।

বিরাট সংখ্যক মানুষের শিক্ষা আছে কিন্তু বিবেক নেই, ধর্মের আনুষ্ঠানিক চর্চা আছে কিন্তু ধর্মশিক্ষার প্রতিফলন নেই। পেঁয়াজ-আলু কাণ্ডের হোতারা মানব, দানব নয়। মানবের অধিকারের নামই মানবাধিকার। এদের বিরাট অংশ লেখাপড়া জানা, সভ্য দাবিদার। অথচ এদের কারও বিবেক বলছে না তারা অন্যায় করছে, পাপ করছে। রাষ্ট্র তো আরও বড় ব্যাপার। মানবাধিকার আর ভোটাধিকার নিয়ে আলোচনায় তারা বিরক্ত। গুম-খুন ঢাকতে তাদের কাছে ‘মায়ের কান্না’ আছে। তাদের বিরোধীদের কাছে আছে ‘মায়ের ডাক’। ডাক আর কান্নায় মানবাধিকারের মতও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে খেলো এবং রাজনীতির আইটেম করে ফেলা হয়েছে। সব জায়েজ করে দেওয়ার একটা হিম্মত সরকার অনায়াসেই রাখছে। মানবাধিকার প্রশ্নে তাদের মধ্যে তাচ্ছিল্য আছে। দহনও আছে। মানবাধিকার এখন একটা ব্যবসা-দোকানদারি ধরনের কথা প্রায়ই মন্ত্রীরা বলছেন। পঁচাত্তরে বা ২১ আগস্টে মানবাধিকার কোথায় ছিল এ প্রশ্ন ছোড়েন তারা। যার কিছুটা অর্থ দাঁড়ায়, তখন ছিল না বলে এখনো থাকতে নেই এবং এখনকার হত্যা-পিটুনি-খিঁচুনির যেসব ঘটনা ঘটে এগুলো আগেরগুলোর তুলনায় কিছুই না। অথচ মানবাধিকার সরলীকরণের বিষয় নয়। এখন আর তখন বলে কথা নয়। মানবাধিকার কতগুলো সংবিধিবদ্ধ আইন ও নিয়মের সমষ্টি। তা সব মানুষের জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য বিষয়। কিন্তু, বাস্তবে যার যার ষোলো আনা অধিকারই মানবাধিকার। যা প্রকারান্তরে অমানবিক তথা দানবাধিকার।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৪৮ সালে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর ‘বিশ্ব মানবাধিকার দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। এবার  ‘মানবাধিকার দিবস’ পালন হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ার ঠিক আগের সময়টায়। রাজনীতি বা নির্বাচন ছাড়াও বহুমাত্রিক অস্থিরতায় নাকানি-চুবানি খাচ্ছে বাংলাদেশ। নিত্যপণ্যের বাজার, অর্থনীতি, কূটনীতি সব দিকেই কূলকিনারাহীন বর্তমান। ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ। ‘সবার জন্য মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার’ এবারের মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য হলেও বাস্তবের সঙ্গে এর যোজন-যোজন দূর। রাজনৈতিক অসহিষ্ণু চরমে। কোনটা মানবিক, কোনটা দানবিক সাহস করে বলাও ভয়ের ব্যাপার। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানিকে মানবাধিকারের মানদণ্ডে বিচার করলে সঙ্গে সঙ্গে শিনা টান করে তেড়ে আসার বহু মানব চারদিকে। কারাবন্দি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ডা-াবেড়ি পরিয়ে চিকিৎসা, বিরোধী নেতাকর্মীদের বাড়িতে সশস্ত্র হামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়িছাড়া হওয়া, আসামিকে না পেয়ে বাবা, মা ও স্বজনদের ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা মাত্র তাকে সরকারবিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে দিতে সময় লাগছে না। লক্ষণটা বড় খারাপ। মানবাধিকার হননকারী আর মানবাধিকার বঞ্চিত, কারও জন্যই এটা শেষ সময় নয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত