নাতিশীতোষ্ণ দেশে আরব বসন্তের রুশ ঢেকুর

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০১:৫২ এএম

বাংলাদেশে আরব বসন্ত ঘটার কোনো উপাদান নেই, গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণও নেই সাফকথা ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের। একই কথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনেরও। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভারের বিবৃতির জবাবে তাদের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।

বিবৃতিতে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বাংলাদেশে আরব বসন্তের মতো পরিস্থিতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর আগে আগামী কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাসহ আরও কয়েকটি চাপ প্রয়োগ করতে পারে ওয়াশিংটন। বাইডেন প্রশাসনের টার্গেট হতে পারে বাংলাদেশের প্রধান শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। সেইসঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার দায়ে অনেক কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগ আনবে বলে মন্তব্য করেছেন জাখারোভা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, সড়কে যান চলাচল বন্ধ, বাস পোড়ানো এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, আমরা এসব ঘটনার সঙ্গে ঢাকায় পশ্চিমা একটি কূটনৈতিক মিশনের সন্দেহজনক কার্যকলাপের সংযোগ দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বিরোধীদের সঙ্গে বৈঠক, যা নিয়ে গত ২২ নভেম্বরের ব্রিফিংয়ে আমরা কথা বলেছি।

বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে রাশিয়ান বিবৃতিটি একটু বেশি হয়ে গেল কিনা এ প্রশ্ন ঘুরছে ঝানু কূটনীতিকদের মধ্যেও। তাদের কারও কারও মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে রাশিয়া একটু বেশি বকছে। তাও যখন যুক্তরাষ্ট্র ক’দিন ধরে অনেকটা দম নেওয়ার মতো অবস্থায়। আবার কেউ কেউ বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখতে চান। তাদের সারকথা হচ্ছে, রাশিয়ান আগাম অভিযোগ মার্কিন পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে, যা মার্কিনিরাও রাশিয়ার বেলায় করে থাকে। যেমন ইরান, চীন বা উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র দেয়, পরে আবার বলে তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই। প্রকারান্তরে এগুলো তাদের এক ধরনের গ্লোবাল পলিটিক্সের রেটরিক।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ করে আসছে রাশিয়া। এরই মধ্যে গত ২২ নভেম্বর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ করেন। সেদিন তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস অক্টোবর মাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যদিও ওয়াশিংটন সরাসরি মস্কোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সময়টাও একটা ফ্যাক্টর। এখন এমন সময়ে বিবৃতিটি ছাড়া হলো যখন বাংলাদেশে নির্বাচনের কাউন্ট ডাউন চলছে। আবার নির্বাচনের রাশিয়া স্টাইল বিশেষভাবে আলোচিত।  রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন কোনো দল থেকে আগামী নির্বাচন না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন। পুতিনের এ স্বতন্ত্রের ডামি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম লুফে নিয়েছে চুম্বক খবরের মতো। বাংলাদেশে স্বতন্ত্র আর ডামির আচানক ড্রামার মধ্যে পুতিনেরও আগামীতে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার খবরটি অডিয়েন্সের কাছে একটি সরস খবর। তার ওপর দেশে দেশে রাজনীতি-কূটনীতিতেও চণ্ডালতা। বাইডেন, পুতিন, শি জিং সিন্ড্রম। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান। গাজা-ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্য উতলা। বাংলাদেশে নির্বাচনী উত্তাপ। দেশি-বিদেশি নানা সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়ার কাছে বড় সাবজেক্ট বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনটি। বিরোধী শিবিরের বড় দল বিএনপি এ নির্বাচনে অনুপস্থিত। এর ফাঁকে স্বতন্ত্র-ডামির কিলবিল।

এর মধ্যেই সুদূর রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন কোনো দল থেকে আগামী নির্বাচন করবেন না বলে ঘোষণাটি দিলেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় থাকা পুতিন আগামী মার্চের নির্বাচনে ছয় বছরের জন্য আরেক মেয়াদে জয়ী হওয়ার আশা করেন। পুতিনের সমর্থকরা বলছেন, তিনি শৃঙ্খলা, জাতীয় গৌরব ও সোভিয়েত পতনের বিশৃঙ্খলার সময় রাশিয়ার কিছু প্রভাব পুনরুদ্ধার করেছেন। তাদের অনেকের ধারণা জন্মেছে বা পুতিন তাদের বোঝাতে পেরেছেন, তিনি না থাকলে রাশিয়াও থাকবে না। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনিই রাশিয়ার সর্বময় ক্ষমতাধর নেতা। তা কখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে, কখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ২০০০-২০০৮ পর্বে তিনি ছিলেন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এরপর ২০০৮-২০১২ সালে চলে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর পদে। তারপর ২০১২ সালে আবার ফেরেন প্রেসিডেন্ট পদে। বহুজন তাকে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে দেখেন। তারা নিয়মিতই শোনান, পুতিনের কোনো বিকল্প নেই।

সেই পুতিনের দেশ এখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে বাংলাদেশকে আরব বসন্তের ভয় দেখায় না পিঠ মোছা দিয়ে আরও কাছে নিতে চায়? রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা    কেমিস্ট্রিও। এরইমধ্যে রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষ শিপিং প্রতিষ্ঠান ফার ইস্টার্ন শিপিং কোম্পানি-ফেসকোর কন্টেইনার পরিষেবায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বাংলাদেশে এই কন্টেইনার সার্ভিসটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফেসকোর এ দেশীয় এজেন্ট হিসেবে স্থানীয় শিপিং প্রতিষ্ঠান রেজেনসি লাইন্স নিযুক্ত হয়েছে। এই পরিষেবায় এখন শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে কন্টেইনার পরিবহনের সেবাও যুক্ত হলো। গত শুক্রবার একদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, মস্কোভিত্তিক লজিস্টিক অপারেটর ফেসকো ট্রান্সপোর্ট গ্রুপ তাদের ইন্ডিয়ান লাইন ওয়েস্ট মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের পরিধি বাড়াচ্ছে। একই দিন আরেকদিকে, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ছাড়লেন নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশে আরব বসন্তের ঢেঁকুর।

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ওই ঢেঁকুরের গন্ধ পায়নি। তবে, পুরনো বিমারি দেখছে। বিনাশ হয়ে যাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী সর্বহারারা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। মাদারীপুরে হঠাৎ সক্রিয় হয়েছে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। অন্তত দশ বছর আগে বিদায় নেওয়া সংগঠনটি কাকতালীয়ভাবে রাশিয়ার বিবৃতি দেওয়ার দিনেই নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। মাদারীপুর সদর উপজেলার হাউসদী বাজারের একটি দোকানে সংগঠনটির হাতুড়ি ও কাস্তে প্রতীক আঁকা লাল পাতাকা ওড়ায়। এলাকার বিভিন্ন দেয়ালে প্রচারপত্রও সাঁটায়। এতে লেখা হয় দেশে চলমান ‘নির্বাচনী প্রহসন বর্জন করুন, বানচাল করুন’। প্রচারপত্রে কৃষক-শ্রমিক-দরিদ্র-মধ্যবিত্তের বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য মাওবাদী গণযুদ্ধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। পুলিশ বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নিষিদ্ধ এ সংগঠনটি নির্বাচন এলে নানা অপতৎপরতা চালায়। এর আগেও ২০১৮ সালে নির্বাচনের সময়ও করেছে। পরে চুপসে গেছে। বিষয়টি আসলে এত সরল?

সর্বহারা বা এ ধরনের সংগঠনগুলোর বর্তমান না থাকলেও অতীত আছে। বুয়েটে পড়ার সময় সিরাজ সিকদার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠক হন। ১৯৬৫ সালে বিগত স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ও চীনা লাইনে ছাত্র ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেলে তিনি চীনপন্থি অংশে থাকেন। ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি থাকার সময় সিরাজ সিকদার ১৯৬৮ সালের মে মাসে গঠন করেন ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’। এটি ছিল গোপন সংগঠন। তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। সিরাজ সিকদার হয়ে যান রুহুল আলম। আলাদা অফিস নিয়ে ‘মাও সে তুং চিন্তাধারা গবেষণা কেন্দ্র’ চালু করেন তিনি। একাত্তরে  পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনও সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে সেই যুদ্ধে যোগ দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তার নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন হয় ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’।

১৯৭২ সালের শেষের দিকে সর্বহারা পার্টির কর্মীরা তাদের আক্রমণ আবার শুরু করে। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয়। ওই বছর তারা অসংখ্য পুলিশ ফাঁড়ি, থানা ও ব্যাংকে হামলা চালায়। জাতীয় শত্রু খতমের সেøাগান দিয়ে তারা তখন কত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার কোনো তালিকা নেই। ১৯৭৪ সালে বিজয় দিবস সামনে রেখে সর্বহারা পার্টি আন্ডার গ্রাউন্ডে থেকে ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর দুদিন হরতালও ডেকেছিল। এই হরতালে মওলানা ভাসানী সমর্থন দিয়েছিলেন। পঁচাত্তরের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সিরাজ সিকদারকে দ্রুত ঢাকায় আনা হয়। গ্রেপ্তার অবস্থায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় পুলিশ গুলি চালালে তিনি নিহত হন বলে প্রচার করা হয়।           

নানা ঘটনায় দেখা যায়, দেশে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা সীমিত বা বিলীন হলে ডান-বাম চরম পন্থার উদ্ভব হয়। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরেও সেই নমুনায় চরমপন্থিদের উদ্ভব ঘটে। ১৯৭৪ সালে জাসদ নিষিদ্ধের জেরে সৃষ্টি হয় গণবাহিনী। তখনকার ক্ষমতাসীনরা তখন অনেকটা উপায়হীন হয়ে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠন করতে বাধ্য হয়। বর্তমান পরিস্থিতি মোটেই সেই জায়গায় যায়নি। তবে, আলামত সুখকর নয়। বাংলাদেশের পাশেই কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীন নিয়ন্ত্রিত মিয়ানমার। রোহিঙ্গা সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। কমিউনিস্ট চীন এবং মিয়ানমারকে ঠেকাতে বদ্ধপরিকর পশ্চিমা বিশ্ব। মিয়ানমারে এরইমধ্যে ঘটনার বাঁক ঘুরতে শুরু করেছে। তাদের মুরব্বি রাশিয়া একটু সরে এসে বাংলাদেশের ওপর ভর করতে যাচ্ছে বলে কিছুটা আঁচ করা যাচ্ছে।

রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ আসছে অকস্মাৎ। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় রাষ্ট্রদূত চড়া সুরে জানান দিচ্ছেন, মার্কিন যে কোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে। আগ বাড়িয়ে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিলে রাশিয়া বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে। এ অবস্থায় চীন, ভারত ও রাশিয়ার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সমীকরণ। আগামী দিনের পূর্বাভাস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত বার্মা অ্যাক্ট। যার অনেকটাই বার্মায় বাস্তবায়নের পথে। কূটনীতি-রাজনীতির চেয়েও এখানে ফ্যাক্টর হচ্ছে স্ট্র্যাটেজি। বাংলাদেশ এ স্ট্র্যাটেজির বাইরে নয়। বরং ক্রমশ সাবজেক্টিভ হয়ে পড়ছে বিশেষভাবে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত