ভারী বৃষ্টি হলেই হাঁটু বা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায় হাটহাজারী বড় দীঘিরপাড় এলাকায় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের বড় একটি অংশ। সড়ক থেকে পানি সরে না যাওয়া পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা শহর ও উত্তর চট্টগ্রামগামী শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এ সময় ভোগান্তিতে পড়ে লাখো মানুষ। মহাসড়কের এই অংশটি পানিতে ডুবে যাওয়ার একমাত্র কারণ কালভার্ট ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘হক শপিং সেন্টার’। খাস জায়গা দখল করে মার্কেটটি গড়ে তুলছেন স্থানীয় চিকনদন্ড-ী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত আলীর ছোট ভাই আবুল কাশেম।
অন্যদিকে লিয়াকত আলীর আরেক ভাই আবুল হাশেমও একই উপজেলার উত্তর ফতেয়াবাদ ধোপার দীঘিরপাড় সংলগ্ন একটি শতবর্ষী পুকুর ভরাট করে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন করায় বর্ষার পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রতি বছর বৃষ্টির মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ কাশেম ও হাশেমের পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা-ের কারণে অসহায় হয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো পরিত্রাণ পাচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের থাবা থেকে বাদ যাচ্ছে না কবরস্থান, শ্মশানের জায়গাও। শতবর্ষী দীঘি ভরাট করে বাগানবাড়ি, খাসজমি দখল করে বাড়ির ফটক নির্মাণের অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগদাতা মো. ফোরকান ও মো. এমরান জানান, কাটাখালী খালের মুখে কিছু খাস জায়গা দখলে নিয়ে মার্কেট নির্মাণ করেন আবুল কাশেম। তার মালিকানাধীন মার্কেটটি উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে ২০২২ সালের ১০ আগস্ট সিটি মেয়র বরাবর আবেদন করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। তবে মার্কেটটি উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহিনুল ইসলাম।
মো. ফোরকানের অভিযোগ, আবুল হাশেমের দখলদারিত্ব থেকে বাদ যায়নি কবরস্থান ও শ্মশানের জায়গাও। বড় দীঘির পূর্বে ঘোষপাড়ায় শ্মশানের জায়গা দখল এবং শতবর্ষী দীঘি কিনে ভরাট করে বাগানবাড়ি করায় আবুল হাশেম এবং তার শ্বশুর মো. রফিকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরে গত বছর সেপ্টেম্বরে অভিযোগ দেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে দীঘি ভরাটের দায়ে আবুল হাশেমকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে দায় সারে পরিবেশ অধিদপ্তর। ওই দীঘির বিএস নামজারি খতিয়ান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯৭৩৮ দাগের দীঘিটির জায়গার পরিমাণ ১ একর ২৪ শতক। জমির শ্রেণি পুকুর। পুকুর হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে কেন মামলা করেনি এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, ‘দীঘি ভরাটের দায়ে আবুল হাশেমকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার পাশাপাশি আরও কিছু দন্ড- দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এগুলো এখন আমার মনে নেই।’
এদিকে ১৮-২০ বছর আগে আবুল হাশেম চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের উত্তর ফতেয়াবাদ ধোপার দীঘিপাড়ের কালভার্ট সংলগ্ন শতবর্ষী নয়াপুকুর ভরাট করে গড়ে তোলেন জমজম রিফুয়েলিং স্টেশন নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের আপত্তি সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে পানি নিষ্কাশনের পথে স্ল্যাব নির্মাণ করেন। পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে উত্তর ফতেয়াবাদের হাজীপাড়া, ব্রাহ্মণপাড়া ও পশ্চিম খাগড়িয়া ছড়ারকুল এলাকা দুই-তিন দিন পানিতে ডুবে থাকে। ফলে স্থানীয়রা চরম ভোগান্তির শিকার হন। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল হয়নি বলে অভিযোগ করেন ছড়াকুলের বাসিন্দা গাজী মো. ইউনুচ।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবুল কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কালভার্টের মুখে মার্কেটও নির্মাণ করিনি। পুকুর ভরাট, কবরস্থান ও শ্মশানের জায়গাও দখল করিনি। এগুলো যিনি করেছেন তাকে জিজ্ঞেস করুন।’ হক শপিং মার্কেটে আপনার অংশীদারত্ব আছে অস্বীকার করছেন কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিরুত্তর থাকেন।
এদিকে বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল করলেও আবুল হাশেমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়, এ দুই সহোদরের বিরুদ্ধে গাছ কেটে কবরস্থানের জায়গা বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং তাদের বড়ভাই প্রয়াত লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে চিকনদ-ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের পেছনে সর্বসাধারণের কবরস্থানের জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ করেন স্থানীয় মো. আলী। এ নিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন তিনি। মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ফরিদুল আলম বলেন, ‘সর্বসাধারণের কবরস্থানের জায়গায় ভবন গড়ে তোলার সময় লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিলেন কবরস্থানের শরিকদাররা। অবশ্য মামলাটি পরে খারিজ করে দেয় আদালত।’
অভিযোগ, দুই সহোদরের দাপট এতটাই বিস্তৃত যে, স্থানীয় ভূমি প্রশাসনও যেন তাদের কাছে অসহায়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার নিরুপম চাকমা তদন্তে গিয়ে সরকারি চলাচলের রাস্তা দখল করে বাড়ির ফটক নির্মাণের প্রমাণ পান। পরে ফটকটি উচ্ছেদের নোটিসও দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু রায়হান। কিন্তু ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অবৈধ স্থাপনা আজও উচ্ছেদ করেনি স্থানীয় ভূমি প্রশাসন। তবে সরকারি চলাচলের রাস্তা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাটহাজারীর এসিল্যান্ড আবু রায়হান।
