৩ কোটির প্লট ৬০ লাখে কিনেছেন দুদক কর্মকর্তা

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:২১ এএম

ঘুষ-দুর্নীতির টাকায় দেশে-বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কেনাসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ হরহামেশাই পাওয়া যায়। সেসবের তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। এবার সেই সংস্থারই এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পের একটি প্লট ক্রয়ে তিনি অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন। তিন কাঠার প্লটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা হলেও নিবন্ধনে এর মূল্য মাত্র ৬০ লাখ টাকা দেখিয়েছেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত রিজিয়া খাতুন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংস্থাটির অনেক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি (রিজিয়া খাতুন) চাকরিজীবনে যে পরিমাণ বেতন-ভাতা পেয়েছেন, প্লটটির মূল্য তার থেকে কয়েকগুণ বেশি। এত টাকা দিয়ে কীভাবে প্লট কিনেছেন, তা তদন্ত করে দেখা দরকার।

অবশ্য  নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্যমতে, রিজিয়া খাতুন রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে ২০ নম্বর সেক্টরের ২১৭ ডি নম্বর সড়কের ৩ কাঠা আয়তনের ৪ নম্বর প্লটটি কিনেছেন। প্লটের আগের মালিক হেলাল আহমেদ চৌধুরী একজন প্রবাসী। তিনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী কোটায় প্লটটি বরাদ্দ পেয়েছেন। তার নগদ টাকার প্রয়োজন হলে তিনি প্লটটি ৬০ লাখ টাকায় দুদকের উপপরিচালক রিজিয়া খাতুনের সঙ্গে বিক্রির বিষয়ে চুক্তি করেন। এরপর প্লটটি রিজিয়া খাতুনের নামে হস্তান্তরের জন্য রাজউকে আবেদন করেন। রাজউক কর্র্তৃপক্ষ প্লটটি তিন মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার অনুমোদন দেয়। এরপরই চলতি বছরের ৩১ মে প্লটটি রিজিয়া খাতুনের নামে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়। রিজিয়া খাতুন গত ১২ সেপ্টেম্বর প্লটের নথিপত্র তার কাছে হস্তান্তর করতে রাজউকে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিজিয়া খাতুনের কাছে প্লটের যাবতীয় নথিপত্র হস্তান্তর করা হয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের প্রতি কাঠা আবাসিক প্লট ১ থেকে সোয়া ১ কোটি টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই মূল্য ধরে হিসাব করলে ৩ কাঠা আয়তনের একটি প্লটের দাম প্রায় ৩ কোটি টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু রিজিয়া খাতুন তার প্লটের রেজিস্ট্রিতে মূল্য দেখিয়েছেন ৬০ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, প্লট কেনার সময় তিনি প্রায় আড়াই কোটি টাকার তথ্য গোপন করেছেন। একই সঙ্গে এই পরিমাণ টাকার যে রাজস্ব আসত, সেটিও লোপাট করা হয়েছে।

রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখার কর্মকর্তা বলেছেন, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের প্রতি কাঠা বাণিজ্যিক প্লটের দাম ১ কোটি এবং আবাসিক প্লটের দাম ২ লাখ টাকা করে নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু সেখানে প্রতি কাঠা আবাসিক প্লট ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পূর্বাচল প্রকল্পে ৩ কাঠার একটি প্লটের দাম ২ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকার কম নয়। স্থানভেদে প্লটের দাম আরও বেশি হয়ে থাকে। তবে পূর্বাচল প্রকল্পের যে দামে প্লট বিক্রি হচ্ছে, সেই দাম ধরে রেজিস্ট্রি হচ্ছে না। সেখানকার জমির মৌজা মূল্যের কম হওয়ায় রেজিস্ট্রিতে প্রকৃত দাম দেখানো হয় না। জমির বিক্রয়মূল্য অনেক কম দেখিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারও মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

দুদকের একজন উপপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদকের একজন উপপরিচালক এখন ৭০-৭৫ হাজার টাকা বেতন পান। তিনি যখন চাকরিতে প্রবেশ করেন, তখন বেতন ১০-১২ হাজার টাকা ছিল। তার বেতন গড়ে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা ধরে হিসাব করলে তিনি বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা পেয়েছেন। সেই হিসাবে চাকরিজীবনে তার ১ কোটি ৩৫ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। চাকরিজীবনের আয় ও ব্যাংক লোন নিয়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কিনতে সক্ষম হবেন। তার পক্ষে ৩ কোটি টাকা খরচ করে প্লট কেনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিষয়টির তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পূর্বাচল প্রকল্পে প্রতি কাঠা প্লট প্রায় ১ কোটি টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ৩ কাঠার প্লট আপনি ৬০ লাখ টাকায় কীভাবে কিনেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে গত রবিবার সন্ধ্যায় দুদক কর্মকর্তা রিজিয়া খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যার প্লট তিনি কম দামে বিক্রি করলে আমার কী করার আছে। আর প্লটটি ৩ কোটি টাকায় কিনে কমমূল্য দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে তার কিছু বলার নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত